জেলা প্রতিনিধি
১৪ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ১১:১৩ এএম
দক্ষিণাঞ্চলের কোটি মানুষের চিকিৎসার শেষ ভরসা বরিশাল শের-ই-বাংলা চিকিৎসা মহাবিদ্যালয় (শেবাচিম) হাসপাতাল। ১৯৬৮ সালে ২৫০ শয্যা নিয়ে যাত্রা শুরু করা হাসপাতালটির বয়স এখন ৫৮ বছর। সময়ের সঙ্গে শয্যা বেড়ে হয়েছে ১ হাজার। বেড়েছে রোগীর চাপও। কিন্তু সে তুলনায় বাড়েনি চিকিৎসক, নার্স, টেকনোলজিস্ট ও কর্মচারী। প্রয়োজনীয় অবকাঠামো ও বিশেষায়িত চিকিৎসাসেবারও রয়েছে ঘাটতি।
ফলে ১ হাজার শয্যার এই হাসপাতাল চলছে ৩৮৬ শয্যার পুরোনো জনবল কাঠামো দিয়ে। প্রতিদিন বহির্বিভাগ ও আন্তঃবিভাগ মিলিয়ে ৫ হাজারের বেশি রোগী চিকিৎসা নিতে আসেন। জায়গার সংকটে রোগীদের মেঝে, বারান্দা এমনকি চলাচলের পথেও থাকতে হচ্ছে। জরুরি বিভাগে রোগী পরিবহণের জন্য কর্মী না পেয়ে অনেক সময় স্বজনকেই ঠেলতে হয় ট্রলি। বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকের ১৪৬টি পদ শূন্য। নেই ক্রিটিক্যাল কেয়ার মেডিসিন (সিসিএম) ইউনিট ও ক্যাথল্যাব। আইসিইউতেও রয়েছে বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকের সংকট। সব মিলিয়ে দক্ষিণাঞ্চলের মানুষের প্রধান এই চিকিৎসাপ্রতিষ্ঠানটি নানা সংকটে জর্জরিত।

৩৮৬ শয্যার জনবল, রোগী ৫ হাজারের বেশি
১৯৬৮ সালে ২৫০ শয্যা নিয়ে হাসপাতালটি চালু হয়। পরে ৩৮৬ শয্যার জনবল কাঠামো দিয়ে এটিকে ৫০০ শয্যায় উন্নীত করা হয়। এরপর শয্যা সংখ্যা ১ হাজারে উন্নীত হলেও জনবল কাঠামো আর বাড়ানো হয়নি।
বর্তমানে আন্তঃবিভাগে প্রতিদিন গড়ে প্রায় আড়াই হাজার এবং বহির্বিভাগে আরও আড়াই হাজারের বেশি রোগী চিকিৎসা নিতে আসেন। সব মিলিয়ে প্রতিদিন রোগীর চাপ ৫ হাজারের বেশি। এত বিপুলসংখ্যক রোগীর বিপরীতে সীমিত জনবল দিয়ে সেবা দিতে গিয়ে হিমশিম খেতে হচ্ছে হাসপাতাল কর্তৃপক্ষকে।

বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকের ১৪৬ পদ শূন্য
চিকিৎসকের ৩২৩টি অনুমোদিত পদের বিপরীতে কর্মরত আছেন ২২৯ জন। ফলে শূন্য রয়েছে ৯৪টি পদ।
বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকের ২৪৮টি পদের মধ্যে শূন্য ১৪৬টি। এর মধ্যে অধ্যাপকের ৫১টি পদের ৩৮টি, সহযোগী অধ্যাপকের ৭৪টির মধ্যে ৩৬টি এবং সহকারী অধ্যাপকের ১২৩টির মধ্যে ৭২টি পদ শূন্য। অর্থাৎ ২৪৮টি বিশেষজ্ঞ পদের বিপরীতে কর্মরত আছেন মাত্র ১০২ জন।

৫৯৭ পদের ২৮২টিই শূন্য
হাসপাতালের তৃতীয় শ্রেণির ১৮৩টি অনুমোদিত পদের মধ্যে শূন্য ৬৬টি। চতুর্থ শ্রেণির ৪১৪টি পদের মধ্যে শূন্য ২১৬টি। দুই শ্রেণি মিলিয়ে ৫৯৭টি পদের মধ্যে ২৮২টিই শূন্য। অর্থাৎ প্রায় ৪৭ শতাংশ পদে জনবল নেই।
জনবল সংকট সামাল দিতে আউটসোর্সিংয়ের মাধ্যমে ২২২ জন কর্মী নিয়োগ দেওয়া হয়েছে। এরপরও রোগীর চাপের তুলনায় কর্মীর সংখ্যা প্রয়োজনের তুলনায় অনেক কম।

৪৭ রোগীর দায়িত্ব একজন চিকিৎসকের
বহির্বিভাগের চিত্র আরও নাজুক। প্রতিদিন গড়ে ২ হাজার ৫০০ রোগীর বিপরীতে চিকিৎসক রয়েছেন মাত্র ৫৩ জন। অর্থাৎ একজন চিকিৎসককে গড়ে ৪৭ জন রোগী দেখতে হচ্ছে।
সাড়ে পাঁচ ঘণ্টার বহির্বিভাগে এত রোগীর চাপ সামলাতে গিয়ে কোনো কোনো চিকিৎসককে রোগীপ্রতি মাত্র ৩ থেকে ৫ মিনিট সময় দিতে হচ্ছে। কোনো কোনো বিভাগে রোগীর সংখ্যা ১০০ ছাড়িয়ে যায়। এর ওপর চিকিৎসকদের বসার কক্ষেরও সংকট রয়েছে। চিকিৎসক সংকটের কারণে রোগী দেখার সময় কমে যাওয়ায় কাঙ্ক্ষিত চিকিৎসাসেবা পাওয়া নিয়েও প্রশ্ন উঠছে।

প্যাথলজি ল্যাবেও টেকনোলজিস্টের ঘাটতি
চিকিৎসক-কর্মচারীর পাশাপাশি টেকনোলজিস্ট সংকটও রয়েছে। পুরোনো অর্গানোগ্রামে টেকনোলজিস্টের ২৭টি পদের মধ্যে শূন্য ৭টি।
২৪ ঘণ্টা প্যাথলজি ল্যাব চালু রাখতে যেখানে ১৮ জন টেকনোলজিস্ট প্রয়োজন, সেখানে কর্মরত আছেন মাত্র ৮ জন। ফলে প্রয়োজনীয় যন্ত্রপাতি থাকার পরও পর্যাপ্ত জনবল না থাকায় রোগীদের পরীক্ষা-নিরীক্ষায় ভোগান্তি হচ্ছে। দিনের বড় একটি সময় বন্ধ থাকছে প্যাথলজি ল্যাব।

স্বজনকেই ঠেলতে হয় ট্রলি
জনবল সংকটে সবচেয়ে বেশি ভোগান্তিতে পড়ছেন রোগীদের স্বজনেরা। জরুরি বিভাগে রোগী পরিবহণের জন্য তিন শিফটে ট্রলিম্যানের ২১টি পদ রয়েছে। কর্মরত আছেন ১৯ জন। তাদের মধ্যে দুজনকে আন্তঃবিভাগে দায়িত্ব পালন করতে হয়।
ফলে জরুরি বিভাগে রোগী, এমনকি লাশ পরিবহণের সময়ও অনেক ক্ষেত্রে স্বজনদের ট্রলি ঠেলতে হচ্ছে। একই অবস্থা হুইলচেয়ার ব্যবহারের ক্ষেত্রেও।
রোগীর স্বজন মনোয়ার বেগম বলেন, হাসপাতালে একা থাকা এক রোগীকে হুইলচেয়ারে করে অপারেশন থিয়েটারে নেওয়ার মতো কোনো কর্মী পাওয়া যাচ্ছিল না। শেষ পর্যন্ত তাকেই হুইলচেয়ার ঠেলে রোগীকে নিয়ে যেতে হয়েছে।

মেঝে-বারান্দায় চিকিৎসা
হাসপাতালের ধারণক্ষমতার তুলনায় রোগীর চাপ কয়েক গুণ বেশি হওয়ায় ওয়ার্ডগুলোতে জায়গার সংকট তীব্র। ফলে অনেক রোগীকে মেঝে, বারান্দা এমনকি চলাচলের পথেও চিকিৎসা নিতে হচ্ছে।
এতে রোগীদের স্বাভাবিক চিকিৎসা ব্যাহত হওয়ার পাশাপাশি সংক্রমণের ঝুঁকিও বাড়ছে। অতিরিক্ত রোগীর কারণে পরিচ্ছন্নতা বজায় রাখাও কঠিন হয়ে পড়ছে। একই সঙ্গে চিকিৎসক ও নার্সদের ওপরও বাড়ছে কাজের চাপ।

নেই সিসিএম, নেই ক্যাথল্যাব
শেবাচিম হাসপাতালে সংকটাপন্ন রোগীদের চিকিৎসার জন্য গুরুত্বপূর্ণ ক্রিটিক্যাল কেয়ার মেডিসিন (সিসিএম) ইউনিট নেই। আইসিইউ ও সিসিইউ সুবিধা থাকলেও গুরুতর রোগীদের জন্য প্রয়োজনীয় পূর্ণাঙ্গ সিসিএম সেবা না থাকায় চিকিৎসাব্যবস্থাপনায় সীমাবদ্ধতা রয়েছে।
হৃদরোগীদের জন্য গুরুত্বপূর্ণ ক্যাথল্যাবও নেই। ফলে এনজিওগ্রামের মতো বিশেষায়িত চিকিৎসার প্রয়োজন হলে রোগীদের ঢাকামুখী হতে হয়। হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে, ক্যাথল্যাব স্থাপনের প্রক্রিয়া চলছে।

আইসিইউতেও বিশেষজ্ঞ সংকট
হাসপাতালের আইসিইউ সেবাতেও রয়েছে জনবল সংকট। সংকটাপন্ন রোগীদের নিবিড় পরিচর্যার ব্যবস্থা থাকলেও প্রয়োজনীয় বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকের ঘাটতি রয়েছে। ফলে গুরুতর রোগীদের ২৪ ঘণ্টা নিবিড় পর্যবেক্ষণ ও চিকিৎসা নিশ্চিত করা কঠিন হয়ে পড়ছে।

লোডশেডিংয়ে দুর্ভোগ
শেবাচিম হাসপাতালের নতুন ভবনে দিনে-রাতে ৭ থেকে ৮ ঘণ্টা পর্যন্ত বিদ্যুৎ থাকে না। এতে লিফট, ফ্যান ও লাইট বন্ধ হয়ে যায়। ভবনটিতে প্রতিদিন গড়ে ৬০০ থেকে ৭০০ রোগী ভর্তি থাকেন।
বিদ্যুৎ সংকটে অস্ত্রোপচারের সংখ্যা ২০–২৫টি থেকে কমে ১০–১২টিতে নেমে আসে। জেনারেটর থাকলেও জ্বালানি সংকটে তা নিয়মিত চালানো যায় না। প্রতি ঘণ্টায় জেনারেটরে প্রায় ১১০ লিটার ডিজেল প্রয়োজন।
হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে, নতুন ভবনে আরও একটি বিদ্যুৎ সংযোগ এবং জেনারেটরের জন্য জ্বালানি বরাদ্দ চেয়ে ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষকে চিঠি দেওয়া হয়েছে।

দুই বছরে ৮ অগ্নিকাণ্ড
চিকিৎসাসেবার সংকটের পাশাপাশি হাসপাতালের নিরাপত্তা নিয়েও উদ্বেগ রয়েছে। গত দুই বছরে শেবাচিম হাসপাতালে আটটি অগ্নিকাণ্ডের ঘটনা ঘটেছে। এর মধ্যে তিনটি ছিল বড় ধরনের।
অগ্নিকাণ্ডের ঘটনায় ধোঁয়ায় দম বন্ধ হয়ে দুজনের মৃত্যুর অভিযোগও রয়েছে। প্রথমদিকে পুরোনো বৈদ্যুতিক সরবরাহব্যবস্থাকে অগ্নিকাণ্ডের অন্যতম কারণ মনে করা হলেও পরবর্তী কয়েকটি ঘটনায় নাশকতার সন্দেহ তৈরি হয়।
গণপূর্ত বিভাগের কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, বিদ্যুৎ সংযোগ চালু থাকা অবস্থায় লিফটের তার চুরির ঘটনাও ঘটেছে। এতে শর্টসার্কিট ও অগ্নিকাণ্ডের ঝুঁকি তৈরি হয়। আবার কয়েকটি অগ্নিকাণ্ডের ঘটনায় আগুনের সুনির্দিষ্ট উৎসও পাওয়া যায়নি।

দালাল ঠেকাতেও হিমশিম
শেবাচিম হাসপাতালের দীর্ঘদিনের আরেক সমস্যা রোগী ধরার দালালচক্র। চলতি বছরের মে মাসে ভ্রাম্যমাণ আদালত অভিযান চালিয়ে নারীসহ আটজনকে আটক করেন। তাঁদের মধ্যে ছয়জন নারী ছিলেন।
হাসপাতালে সরকারি ব্যবস্থাপনায় চিকিৎসা ও পরীক্ষা-নিরীক্ষার সুযোগ থাকা সত্ত্বেও বিভিন্ন বেসরকারি ক্লিনিক ও ডায়াগনস্টিক সেন্টারে রোগী ভাগিয়ে নেওয়ার অভিযোগ রয়েছে।
রোগীদের অভিযোগ, হাসপাতালের ভেতরে ও আশপাশে থাকা দালালেরা বিভিন্ন কৌশলে রোগী ও স্বজনদের ভুল বুঝিয়ে বেসরকারি প্রতিষ্ঠানে নিয়ে যান। এতে সরকারি হাসপাতালে স্বল্প খরচে চিকিৎসা নিতে আসা রোগীদের অতিরিক্ত অর্থ গুনতে হয়।

১০ চিকিৎসক দেওয়ার উদ্যোগ
সম্প্রতি স্বাস্থ্য ও পরিবারকল্যাণমন্ত্রী বরিশালে এসে শেবাচিম হাসপাতালের পরিচালক ও স্বাস্থ্য বিভাগের কর্মকর্তাদের সঙ্গে বৈঠক করেন। বৈঠকে হাসপাতালের চিকিৎসক সংকটের বিষয়টি উঠে আসে। পরে মন্ত্রী স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের মহাপরিচালকের সঙ্গে ফোনে কথা বলে ১০ জন চিকিৎসক দেওয়ার উদ্যোগ নেন।
বরিশাল নাগরিক সমাজের সদস্যসচিব ডা. মিজানুর রহমান বলেন, ‘দক্ষিণাঞ্চলের মানুষের চিকিৎসার প্রধান আশ্রয়স্থল শেবাচিম হাসপাতাল। অথচ প্রয়োজনের তুলনায় এখানে চিকিৎসক, নার্স ও অন্যান্য জনবলের যে ঘাটতি রয়েছে, তা কোনোভাবেই গ্রহণযোগ্য নয়। রোগীর চাপ অনুযায়ী জনবল ও অবকাঠামো বাড়ানো না হলে এ অঞ্চলের মানুষ কাঙ্ক্ষিত চিকিৎসাসেবা থেকে বঞ্চিত হবেন।’
শেবাচিম হাসপাতালের পরিচালক ব্রিগেডিয়ার জেনারেল ডা. একেএম মশিউল মুনীর বলেন, পুরোনো অবকাঠামো ও জনবল সংকটের মধ্যেও তারা সর্বোচ্চ সেবা দেওয়ার চেষ্টা করছেন। জনবলসহ অন্যান্য সংকট নিরসনে মন্ত্রণালয়ের সঙ্গে নিয়মিত যোগাযোগ রাখা হচ্ছে। ক্যাথল্যাব স্থাপনের প্রক্রিয়াও চলছে।
প্রতিনিধি/এসএস