জেলা প্রতিনিধি
১২ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ১০:০০ পিএম
কুষ্টিয়ার দৌলতপুরে পদ্মা নদীর পানি বৃদ্ধি অব্যাহত রয়েছে। গত ২৪ ঘণ্টায় হার্ডিঞ্জ ব্রিজ পয়েন্টে পানি ৩ সেন্টিমিটার বেড়ে বিপৎসীমার মাত্র ৭৫ সেন্টিমিটার নিচ দিয়ে প্রবাহিত হচ্ছে। টানা বৃষ্টি ও উজান থেকে নেমে আসা ঢলে উপজেলার রামকৃষ্ণপুর ও চিলমারী ইউনিয়নের চরাঞ্চলের ৩৫টি গ্রামের প্রায় ৬০ হাজার মানুষ পানিবন্দী হয়ে পড়েছেন। প্লাবিত হয়েছে কয়েকশ হেক্টর ফসলি জমি। পানির তোড়ে ভেঙে গেছে বিভিন্ন সড়ক, বন্ধ হয়ে গেছে কয়েকটি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের শ্রেণি কার্যক্রম।
পাবনা পানি উন্নয়ন বোর্ডের (পাউবো) হাইড্রোলজি বিভাগ জানায়, শনিবার সকাল ৯টায় হার্ডিঞ্জ ব্রিজ পয়েন্টে পদ্মার পানির উচ্চতা রেকর্ড করা হয়েছে ১৩ দশমিক ০৫ মিটার। ওই পয়েন্টে বিপৎসীমা ১৩ দশমিক ৮০ মিটার। শুক্রবার সকাল ৯টায় পানির উচ্চতা ছিল ১৩ দশমিক ০২ মিটার। অর্থাৎ ২৪ ঘণ্টায় পানি বেড়েছে ৩ সেন্টিমিটার।
এর আগে গত এক সপ্তাহ ধরে প্রতিদিন গড়ে ১০ থেকে ১২ সেন্টিমিটার করে পানি বাড়ছিল। তবে গত ২৪ ঘণ্টায় পানি বৃদ্ধির হার কিছুটা কমেছে।
পাউবোর হাইড্রোলজি বিভাগের নির্বাহী প্রকৌশলী ইলিয়াস হোসেন বলেন, উজান থেকে নেমে আসা ঢল ও ভারী বৃষ্টির কারণে পদ্মায় দ্রুত পানি বেড়েছে। তবে গত ২৪ ঘণ্টায় বৃদ্ধির হার কমে ৩ সেন্টিমিটারে নেমেছে। পানি বাড়ার এ প্রবণতা অব্যাহত থাকবে কি না, তা এখনই নিশ্চিত করে বলা যাচ্ছে না।
পানি বৃদ্ধির ফলে দৌলতপুরের রামকৃষ্ণপুর ও চিলমারী ইউনিয়নের বিস্তীর্ণ নিম্নাঞ্চল এবং ফিলিপনগর ইউনিয়নের পদ্মার চরের নিচু এলাকা প্লাবিত হয়েছে। পানিতে তলিয়ে গেছে রাস্তাঘাট, ভেঙে পড়েছে যোগাযোগব্যবস্থা। অনেক এলাকায় নৌকা ও ভেলাই এখন চলাচলের একমাত্র মাধ্যম।

চিলমারী ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান আবদুল মান্নান জানান, ইউনিয়নের ১৯টি গ্রামের মধ্যে ১৭টির নিম্নাঞ্চল প্লাবিত হয়েছে। এতে প্রায় ৩০ হাজার মানুষ পানিবন্দী হয়ে পড়েছেন। তবে গত দুই-তিন দিনের তুলনায় শনিবার পানি বৃদ্ধির তীব্রতা কিছুটা কমেছে।
রামকৃষ্ণপুর ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান সিরাজ মণ্ডল বলেন, ইউনিয়নের ১৬টি গ্রামের চারপাশে পানি থইথই করছে। রাস্তাঘাট তলিয়ে যাওয়ায় যোগাযোগব্যবস্থা প্রায় পুরোপুরি ভেঙে পড়েছে। নৌকা ও ভেলাই এখন চলাচলের একমাত্র ভরসা। ইউনিয়নে ৩০ হাজারের বেশি মানুষ পানিবন্দী অবস্থায় দিন কাটাচ্ছেন।
দৌলতপুর উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা রেহেনা পারভীন জানান, চিলমারী, রামকৃষ্ণপুর, ফিলিপনগর ও মরিচা ইউনিয়নে ইতোমধ্যে ৩৫১ হেক্টর আবাদি জমি পানিতে তলিয়ে গেছে। এতে সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছেন মরিচ ও কলাচাষিরা। পানি আরও বাড়লে ক্ষয়ক্ষতির পরিমাণও বাড়তে পারে।
এদিকে পানি ওঠায় চরাঞ্চলের ২৫টি সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় ও তিনটি মাধ্যমিক বিদ্যালয়ে শ্রেণি কার্যক্রম বন্ধ রয়েছে। তবে এসব প্রতিষ্ঠানে দাপ্তরিক ও প্রশাসনিক কার্যক্রম চালু আছে বলে জানিয়েছে উপজেলা শিক্ষা কার্যালয়।
বন্যার পানিতে রান্নার স্থান ও নলকূপ তলিয়ে যাওয়ায় দুর্গত এলাকায় খাবার ও বিশুদ্ধ পানির সংকট দেখা দিয়েছে। গবাদিপশু নিয়েও বিপাকে পড়েছেন কৃষক ও খামারিরা। পাশাপাশি চরাঞ্চলে দেখা দিয়েছে বিষধর সাপের উপদ্রব।
রামকৃষ্ণপুরের বাসিন্দা আবু বিশ্বাস (৬৫) বলেন, ‘ঘরের ভেতরে কোমর পর্যন্ত পানি। পরিবারের অন্যরা উঁচু জায়গায় গেলেও আমি মাচা বেঁধে কোনোমতে টিকে আছি।’

চর সোনাতলা এলাকার জুলেখা খাতুন বলেন, রাস্তা ভেঙে বন্যার পানি বাড়ির ভেতর দিয়ে প্রবাহিত হচ্ছে। রান্নাবান্না বন্ধ থাকায় পরিবারের সদস্যদের নিয়ে খাবার জোগাড় করতে বিপাকে পড়েছেন তারা।
শ্যমল মণ্ডল নামে এক বাসিন্দা বলেন, ‘বন্যার পানিতে আমার পাঁচ বিঘা মরিচ ডুবে গেছে। চলাচলে খুব সমস্যা হচ্ছে। বাড়ির বৃদ্ধরা ঘরবন্দী হয়ে আছেন। একবার রান্না করে তিনবার খেতে হচ্ছে। এখন সাপের ভয়ও বড় হয়ে দেখা দিয়েছে।’
দুর্গত এলাকার বাসিন্দারা দ্রুত শুকনো খাবার ও বিশুদ্ধ পানি সরবরাহের পাশাপাশি জরুরি চিকিৎসাসেবায় ভ্রাম্যমাণ মেডিকেল টিম পাঠানোর দাবি জানিয়েছেন।
দৌলতপুর উপজেলা স্বাস্থ্য ও পরিবার পরিকল্পনা কর্মকর্তা ডা. তৌহিদুল হাসান তুহিন ঢাকা মেইলকে বলেন, উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে পর্যাপ্ত অ্যান্টিভেনম মজুত রয়েছে। কাউকে সাপে কাটলে ওঝার কাছে গিয়ে সময় নষ্ট না করে দ্রুত হাসপাতালে নেওয়ার পরামর্শ দেন তিনি।
প্রতিনিধি/জেবি