Dhaka Mail Logo

সারাদেশ

গোপন সনদে বাল্যবিয়ে, জালিয়াতির ফাঁদে কিশোরীদের আইনি সুরক্ষা

জেলা প্রতিনিধি

১১ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ০৯:০৮ এএম

সরকারি নিবন্ধন খাতাকে পাশ কাটিয়ে নওগাঁর বিভিন্ন উপজেলায় অবাধে ‘গোপন রেজিস্টারে’ চলছে নাবালক-নাবালিকাদের বাল্যবিয়ে। সরকারি নির্ধারিত ফি-এর চেয়ে অতিরিক্ত অর্থের বিনিময়ে বিয়ের তথ্য আলাদা খাতায় সংরক্ষণ করছেন একশ্রেণীর অসাধু ম্যারেজ রেজিস্ট্রার (কাজী)। পরবর্তীতে ছেলে বা মেয়ে প্রাপ্তবয়স্ক হলে মোটা অঙ্কের বিনিময়ে সরবরাহ করা হয় বিয়ের মূল নকল (কাবিননামা)। রেজিস্ট্রেশনের এই অবৈধ বাণিজ্যের কারণে আইনি সুরক্ষা ও মৌলিক অধিকার থেকে বঞ্চিত হচ্ছেন ভুক্তভোগী পরিবার।

অন্যদিকে, সরকারি নথিতে তথ্য না ওঠায় জেলায় বাল্যবিয়ের সঠিক চিত্র প্রশাসনের অগোচরেই থেকে যাচ্ছে। 

তথ্য অনুসন্ধানে জেলার মহাদেবপুর, মান্দা, আত্রাই ও রানীনগর উপজেলার একাধিক ম্যারেজ রেজিস্ট্রারের বিরুদ্ধে এ ধরনের আইনবহির্ভূত কর্মকাণ্ডের তথ্য মিলেছে। কাজী ও ঘটকদের এই অসাধু সিন্ডিকেটের খপ্পরে পড়ে চরম আইনি ও সামাজিক সংকটে দিন কাটাচ্ছে বহু ভুক্তভোগী পরিবার। 

অনুসন্ধানে উঠে আসা তথ্য অনুযায়ী, মান্দা উপজেলায় ২০২৩ সালে সপ্তম শ্রেণিতে পড়ুয়া মেয়েকে পার্শ্ববর্তী ইউনিয়নের এক কাজীর মাধ্যমে গোপনে বিয়ে দেন। পরবর্তীতে যৌতুকের দাবিতে নির্যাতন চালিয়ে মেয়েকে বাবার বাড়িতে পাঠিয়ে দেওয়া হয়। মেয়ের পরিবার আদালতের শরণাপন্ন হলে বিয়ের প্রমাণপত্র না থাকায় পাত্রপক্ষের বিরুদ্ধে কোনো আইনি ব্যবস্থা নিতে না পেরে নাবালিকা অবস্থাতেই মেয়েটিকে পুনরায় অন্যত্র বিয়ে দিতে বাধ্য হন পরিবারটি। 

একই উপজেলার চতুর্থ শ্রেণির এক শিশু শিক্ষার্থীর ২০২৪ সালে বিয়ে হয়, যার বর্তমানে তিন মাসের একটি সন্তান রয়েছে। যেহেতু মেয়েটির বাল্য বিয়ে হয়েছে, তাই আইনি নিবন্ধন না থাকায় সেই শিশুর ভবিষ্যৎও এখন চরম অনিশ্চয়তায়। 

গোপন খাতায় ‘কাবিন’, সাবালক হলে মিলবে কাগজ! 

অনুসন্ধানে ছদ্মবেশে নাবালিকার অভিভাবক পরিচয় দিয়ে যোগাযোগ করা হলে, একাধিক ম্যারেজ রেজিস্ট্রার (কাজী) নির্দ্বিধায় গোপন খাতা ও অ্যাফিডেভিটের মাধ্যমে বিয়ে দেওয়ার কথা জানান। অতিরিক্ত টাকার বিনিময়ে তারা বাল্যবিয়ের তথ্য মূল সরকারি রেজিস্টারে না তুলে গোপন খাতায় টুকে রাখবেন। চুক্তি থাকবে—কনে সাবালক হলে তখন আসল খাতায় হিসাব মিলিয়ে বিয়ের সনদ দেওয়া হবে। তত দিন পর্যন্ত পুরো বিষয়টি থাকে কাজীর কব্জায়। 

মহাদেবপুর উপজেলার সফাপুর ইউনিয়নের ম্যারেজ রেজিস্ট্রার (কাজী) আমিনুল ইসলাম বলেন, ‘যে বিয়ের নকল দিলে মামলার সম্ভাবনা থাকে, সেসব বিয়ের নকল দেওয়া হয় না। উকিলের মাধ্যমে নোটারি বা অ্যাফিডেভিট করে সেই কপি দেওয়া হয়। অনেক সময় ছেলে বা মেয়ের পরিবার অনুরোধ করলে আলাদা রেজিস্টারে লিখে রাখি। মেয়ে সাবালিকা হলে তখন পরিবেশ বুঝে নকল দেওয়া হয়।’ 

মান্দা উপজেলার মৈনম ইউনিয়নের ম্যারেজ রেজিস্ট্রার (কাজী) মোসাদ্দেক হোসেন সুলতান বলেন, জেলাজুড়ে বহু কাজীই একইভাবে এ প্রক্রিয়া চালিয়ে যাচ্ছেন। শুধু আমাদের দেখছেন কেন? 

নোটারি পাবলিকের ভুয়া ঢাল ও আইনি অন্ধকার

বিয়ে টিকলে ভালো, কিন্তু ঝামেলা বাঁধলেই চরম বিপদে পড়ছে মেয়েপক্ষ। যৌতুক নিরোধ আইন বা নারী নির্যাতনের মামলা করতে গেলে আদালতে বিয়ের প্রমাণই উপস্থাপন করা যাচ্ছে না। ফলে নির্যাতিত তরুণী বা কিশোরী বিচার পাওয়া তো দূরের কথা, কাবিননামার অভাবে আইনিভাবেই নিজেকে বিবাহিত প্রমাণ করতে পারছে না। 

নওগাঁ জজ আদালতের আইনজীবী মহসিন রেজা বলেন, ‘নোটারি পাবলিক বা অ্যাফিডেভিটের মাধ্যমে সম্পাদিত বিয়ে কোনোভাবেই আইনগত বৈধতা পায় না। এটি সরকারি নিবন্ধনের বিকল্প হতে পারে না। নাবালকদের বিয়েতে সহায়তা করা বা ভুয়া দলিল তৈরি করা সরাসরি শাস্তিযোগ্য অপরাধ।’ 

সমাজকর্মী নাইস আক্তার পারভীন বলেন, ‘আইনের চোখ ফাঁকি দিয়ে এ ধরনের ভুয়া নিবন্ধনের সহজ সুযোগ কিশোরীদের ভবিষ্যৎ অন্ধকার করে দিচ্ছে। এটি কেবল আইন অমান্য করা নয়, বরং একটি মেয়ের পড়াশোনা, শারীরিক সুস্থতা ও মানবিক অধিকার পুরোপুরি হরণ করা।’ 

প্রশাসনের তোড়জোড়

জেলা রেজিস্ট্রার কার্যালয়ের তথ্যানুযায়ী, নওগাঁর ৯৯টি ইউনিয়ন ও ৩টি পৌরসভায় ১৩৬ জন নিবন্ধিত কাজী রয়েছেন। চলতি বছরের প্রথম ছয় মাসেই জেলায় ৪ হাজার ৩৯৬টি বিয়ে এবং ২ হাজার ৫৮৪টি তালাক নিবন্ধিত হয়েছে। কাগজপত্রে বিয়ের ডিজিটালাইজেশনের কথা বলা হলেও বাস্তবে তার প্রয়োগ শূন্যের কোঠায়। তবে অনিয়মের বিরুদ্ধে কিছু প্রশাসনিক ব্যবস্থা মিলছে। 

নওগাঁ জেলা কাজী সমিতির সভাপতি কাজী এম এম আমিনুল ইসলাম বলেন, ‘হাতে গোনা কয়েকজন অসাধু ব্যক্তির অনিয়মের দায় পুরো কাজী সমাজ নেবে না। ইতোমধ্যে আত্রাই ও রানীনগর উপজেলার অভিযুক্ত দুই কাজীর বিরুদ্ধে প্রশাসনিক ব্যবস্থা নিতে জেলা রেজিস্টার বরাবর লিখিত আবেদন করা হয়েছে। তবে ভুয়া কাজীরাও অনেক জায়গায় অবৈধভাবে বিবাহ নিবন্ধনের কাজ করছে।’ 

জেলা রেজিস্টার মো. সাইফুল ইসলাম বলেন, ‘অভিযুক্ত কাজীদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিতে সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়ে সুপারিশ পাঠানো হয়েছে এবং অভিযুক্ত একজন কাজীকে ইতোমধ্যে গ্রেফতার করে হাজতে পাঠানো হয়েছে।’ 

নওগাঁর জেলা প্রশাসক মোহাম্মদ সাইফুল ইসলাম বলেন, ‘বাল্যবিয়ে ও অবৈধ নিবন্ধনের বিরুদ্ধে জেলা প্রশাসন জিরো টলারেন্স নীতি গ্রহণ করেছে। অনুমোদিত ম্যারেজ রেজিস্ট্রার হোক কিংবা ভুয়া কাজী— অপরাধে জড়িত থাকার প্রমাণ মিললেই আইন অনুযায়ী কঠোর ব্যবস্থা নেওয়া হবে।’ 

প্রতিনিধি/ এজে