Dhaka Mail Logo

সারাদেশ

রাজসিক বিদায়ে ২৬ বছরের শিক্ষকতাজীবনের অবসান জাহাঙ্গীর আলমের

জেলা প্রতিনিধি

১০ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ০৯:৪৭ পিএম

ঘোড়ার গাড়ি ছুটছে ধীরে ধীরে। গাড়িতে বসা অবসরপ্রাপ্ত শিক্ষক জাহাঙ্গীর আলম মোল্যা। আর পাশে ও পেছনে প্রিয় শিক্ষার্থীদের ভিড়। কারও চোখে অশ্রু, কারও মুখে হাসি। ২৬ বছরের শিক্ষকতা জীবনের শেষ দিনে এমনই ব্যতিক্রমী আয়োজনে প্রিয় শিক্ষককে বিদায় জানালেন যশোরের ঐতিহ্যবাহী মুসলিম একাডেমীর শিক্ষক-শিক্ষার্থীরা।

বৃহস্পতিবার (১০ সেপ্টেম্বর) মুসলিম একাডেমী প্রাঙ্গণে সিনিয়র শিক্ষক (ইংরেজি) জাহাঙ্গীর আলম মোল্যার বিদায় ও সংবর্ধনা অনুষ্ঠানের আয়োজন করা হয়। অনুষ্ঠান শেষে ফুলে সাজানো ঘোড়ার গাড়িতে করে তাকে বিদ্যালয় থেকে বাড়িতে পৌঁছে দেন শিক্ষক-শিক্ষার্থী ও প্রতিষ্ঠানের সংশ্লিষ্টরা।

দীর্ঘদিনের কর্মস্থল থেকে এমন ব্যতিক্রমী বিদায় পেয়ে আবেগাপ্লুত হয়ে পড়েন জাহাঙ্গীর আলম মোল্যা। একইভাবে প্রিয় শিক্ষককে বিদায় জানাতে গিয়ে আবেগ ধরে রাখতে পারেননি অনেক শিক্ষার্থী ও সহকর্মী।

২০০০ সালের ১১ মে মুসলিম একাডেমীতে শিক্ষক হিসেবে যোগ দেন জাহাঙ্গীর আলম মোল্যা। এরপর কেটে গেছে ২৬ বছর। ইংরেজি বিষয়ের শিক্ষক হিসেবে তিনি অসংখ্য শিক্ষার্থীকে পাঠদান করেছেন। পাঠ্যবইয়ের জ্ঞানের পাশাপাশি শিক্ষার্থীদের শৃঙ্খলা, নৈতিকতা ও আদর্শের শিক্ষা দেওয়ার চেষ্টা করেছেন তিনি।

দীর্ঘ কর্মজীবনে নিষ্ঠা, সততা ও দক্ষতার সঙ্গে দায়িত্ব পালন করে শিক্ষক-শিক্ষার্থী ও সহকর্মীদের কাছে তিনি অর্জন করেন আলাদা গ্রহণযোগ্যতা। গত ৩০ জুলাই আনুষ্ঠানিকভাবে শিক্ষকতা পেশা থেকে অবসর নেন তিনি।

তবে অবসর নিলেও তার সঙ্গে মুসলিম একাডেমীর সম্পর্কের যেন ইতি টানতে চাননি কেউ। তাই বিদায়ের আয়োজনেও ছিল আবেগ আর ভালোবাসার ছাপ।

বিদায় সংবর্ধনা অনুষ্ঠানে সভাপতিত্ব করেন মুসলিম একাডেমীর প্রধান শিক্ষক পল্লব কান্তি ঘোষ। বক্তব্যে বক্তারা জাহাঙ্গীর আলম মোল্যার দীর্ঘ কর্মজীবনের বিভিন্ন দিক তুলে ধরেন। 

তারা বলেন, একজন শিক্ষক শুধু শ্রেণিকক্ষে পাঠদান করেন না; তার আদর্শ, চিন্তা ও আচরণ শিক্ষার্থীদের জীবন গঠনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। জাহাঙ্গীর আলম মোল্যা দীর্ঘ ২৬ বছর ধরে নিষ্ঠার সঙ্গে সেই দায়িত্ব পালন করেছেন। তার জ্ঞান, আদর্শ ও নিবেদন শিক্ষার্থীদের জন্য দীর্ঘদিন অনুপ্রেরণা হয়ে থাকবে। প্রধান শিক্ষক পল্লব কান্তি ঘোষ বিদায়ী সহকর্মীর সুস্বাস্থ্য, দীর্ঘায়ু ও সুখী জীবন কামনা করেন।

বিদায়ী শিক্ষক জাহাঙ্গীর আলম মোল্যা বলেন, মুসলিম একাডেমী আমার কাছে শুধু একটি কর্মস্থল নয়, এটি আমার জীবনের একটি বড় অংশ। দীর্ঘ ২৬ বছর এই প্রতিষ্ঠানের শিক্ষক হিসেবে দায়িত্ব পালন করেছি। এই সময়ের প্রতিটি দিন, প্রতিটি শ্রেণিকক্ষ এবং প্রিয় শিক্ষার্থীদের সঙ্গে কাটানো মুহূর্তগুলো আমার জীবনের অমূল্য স্মৃতি হয়ে থাকবে।

পরে প্রতিষ্ঠানের পক্ষ থেকে তাকে সম্মাননা স্মারক, উপহারসামগ্রী ও ফুল দিয়ে সংবর্ধনা জানানো হয়। সহকর্মী ও শিক্ষার্থীরা তাকে শুভকামনা জানান। কেউ ফুল হাতে এগিয়ে আসেন, কেউ প্রিয় শিক্ষকের সঙ্গে শেষবারের মতো ছবি তোলেন।

সব আনুষ্ঠানিকতা শেষে আসে সেই বিশেষ মুহূর্ত। বিদ্যালয় প্রাঙ্গণ থেকে বাড়ির উদ্দেশে রওনা হন জাহাঙ্গীর আলম মোল্যা। তবে সাধারণ কোনো গাড়িতে নয়— ঘোড়ার গাড়িতে।

ফুলে সাজানো ঘোড়ার গাড়িতে বসে যখন তিনি মুসলিম একাডেমীর চেনা প্রাঙ্গণ ছেড়ে যাচ্ছিলেন, তখন যেন ফিরে আসছিল ২৬ বছরের স্মৃতি। যে শ্রেণিকক্ষে দাঁড়িয়ে তিনি অসংখ্য শিক্ষার্থীকে পাঠ দিয়েছেন, যে সহকর্মীদের সঙ্গে দীর্ঘ সময় কাটিয়েছেন, সেই প্রিয় প্রতিষ্ঠানকে পেছনে রেখে নতুন জীবনের পথে পা বাড়ালেন তিনি।

প্রতিনিধি/এলএ