Dhaka Mail Logo

সারাদেশ

খুলনায় মিষ্টিতে ক্ষতিকর রাসায়নিক, হোটেলের খাবারে মলের জীবাণু

জেলা প্রতিনিধি

১০ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ১০:৪১ এএম

শিশু থেকে বৃদ্ধ—সব বয়সী মানুষের পছন্দের মিষ্টিজাতীয় খাবারেও মিলছে ক্ষতিকর উপাদান ও জীবাণু। পরীক্ষায় মিষ্টিতে কলিফর্ম ব্যাকটেরিয়ার উপস্থিতি পাওয়া গেছে। রসালো জিলাপিকে মুচমুচে ও আকর্ষণীয় রাখতে ব্যবহার করা হচ্ছে কাপড়ে ব্যবহৃত ক্ষতিকর রং ও রাসায়নিক। শুধু মিষ্টি নয়, হোটেলের সালাদ, মাছ-মাংসের তরকারি ও ভর্তাতেও পাওয়া গেছে মানবদেহের জন্য ক্ষতিকর জীবাণু।

খুলনা জেলা নিরাপদ খাদ্য অফিসের সংগ্রহ করা বিভিন্ন খাদ্যপণ্যের নমুনা পরীক্ষায় এমন তথ্য উঠে এসেছে।

সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা বলছেন, খাদ্যে ভেজাল ও দূষণ রোধে নিয়মিত অভিযান ও সচেতনতা কার্যক্রম পরিচালনা করা হলেও অসাধু ব্যবসায়ীদের একটি অংশ নিয়ম মানছে না। অনেক ক্ষেত্রে সতর্কতা ও জরিমানার মধ্যেই ব্যবস্থা সীমাবদ্ধ থাকছে। এতে অসাধু ব্যবসায়ীদের দৌরাত্ম্য কমছে না।

জেলা নিরাপদ খাদ্য অফিস সূত্রে জানা গেছে, গত এক বছরে খুলনার বিভিন্ন বাজার ও প্রতিষ্ঠান থেকে ১ হাজার ৫১১টি খাদ্যপণ্যের নমুনা সংগ্রহ করা হয়েছে। এর মধ্যে ৪৬৩টি নমুনায় ভেজাল বা অনিরাপদ উপাদান শনাক্ত হয়েছে।

পরীক্ষায় মিষ্টিজাতীয় খাবারের পাশাপাশি বিভিন্ন হোটেল ও রেস্তোরাঁর খাবারেও জীবাণুর উপস্থিতি পাওয়া গেছে। সালাদ, মাছ ও মাংসের তরকারি এবং বিভিন্ন ধরনের ভর্তায় মানবমলের সঙ্গে সম্পর্কিত জীবাণু বা কলিফর্ম ব্যাকটেরিয়া শনাক্ত হয়েছে। একই সঙ্গে পাস্তা, দুধ, সস, সরিষার তেল, চিপস, ডালডা, গুড়, ঘি ও মধুসহ বিভিন্ন খাদ্যপণ্যে অতিমাত্রায় ভেজালের তথ্য পাওয়া গেছে।

800246311_1063366913069902_1745772047189632571_n

বিশেষজ্ঞদের মতে, খাদ্যে ক্ষতিকর রাসায়নিক ও জীবাণুর উপস্থিতি তাৎক্ষণিকভাবে খাদ্য বিষক্রিয়া, ডায়রিয়া, বমি ও পেটের নানা অসুস্থতার কারণ হতে পারে। দীর্ঘদিন এসব খাবার গ্রহণ করলে শরীরের গুরুত্বপূর্ণ অঙ্গ ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার ঝুঁকি বাড়তে পারে। খাদ্যদূষণ ও ভেজালের প্রবণতা অব্যাহত থাকলে দীর্ঘমেয়াদে ক্যানসার, কিডনি ও লিভারের রোগ, হৃদ্‌রোগ, থাইরয়েডের জটিলতা, শিশুদের বিকাশজনিত সমস্যা এবং পানিবাহিত রোগের প্রকোপ বাড়তে পারে বলে তারা আশঙ্কা করছেন।

জেলা নিরাপদ খাদ্য কর্মকর্তা মো. মোখলেসুর রহমান বলেন, ‘খুলনার বিভিন্ন বাজার থেকে সংগৃহীত নমুনা সক্ষমতা অনুযায়ী আমাদের ল্যাবে পরীক্ষা করি। আবার অনেক পণ্য আছে, যেগুলো পরীক্ষা করার সক্ষমতা আমাদের নেই। সেগুলো ঢাকায় পাঠাতে হয়।’

তিনি আরও বলেন, ‘মানুষকে সচেতন হওয়ার পাশাপাশি ব্যবসায়ীদের সততার সঙ্গে ব্যবসা করতে হবে।’

সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের অভিযোগ, কোনো প্রতিষ্ঠানের পণ্যে ভেজাল শনাক্ত হলে অনেক ক্ষেত্রে প্রথমে সতর্ক করা হয় এবং পরে ফলোআপে রাখা হয়। ফলে বড় ধরনের শাস্তির মুখোমুখি হন খুব কম ব্যবসায়ী।

799673187_1770249214213045_2377090657693687560_n

ভোক্তা অধিকার নিয়ে কাজ করা কনসাস কনজুমার সোসাইটি খুলনার সমন্বয়কারী কামাল মোস্তফা বলেন, খুলনা জেলায় প্রায় ২৬ লাখ মানুষের বসবাস। অথচ এই বিপুলসংখ্যক ভোক্তার নিরাপদ খাদ্য নিশ্চিত করার দায়িত্বে নিয়োজিত মাত্র পাঁচজন। তার অভিযোগ, অসাধু ব্যবসায়ীরা নিয়মিত ভেজাল খাদ্য বিক্রি করলেও দুর্বল আইনের কারণে অনেক সময় শাস্তির মুখোমুখি হন না। কখনো কখনো নামমাত্র জরিমানা দিয়ে আবার একই কাজে জড়িয়ে পড়েন তারা।

কামাল মোস্তফা বলেন, ‘নিরাপদ খাদ্য ও ভোক্তা অধিকার—এই দুই প্রতিষ্ঠানের কার্যক্রম বাড়াতে হবে। লোক দেখানো অভিযান করলে চলবে না।’

মেডিসিন বিশেষজ্ঞ ডা. ফরহাদুল ইসলাম তুহিন বলেন, মিষ্টিজাতীয় খাবারে যে ক্ষতিকর রাসায়নিক ব্যবহার করা হচ্ছে, তাতে সোডিয়াম সালফাইড থাকে। এসব রাসায়নিক মূলত টেক্সটাইল শিল্পে ব্যবহার করা হয়। জিলাপি বা মিষ্টি চকচকে করতে এগুলো মেশানো হচ্ছে, যা মানবদেহের জন্য ক্ষতিকর।

798214392_2335084487244807_3451138856686116871_n

তিনি বলেন, খাবারের সঙ্গে এসব ক্ষতিকর রাসায়নিক শরীরে প্রবেশ করলে মাথা ঘোরা ও বমি বমি ভাব হতে পারে। কারও অ্যালার্জি থাকলে শ্বাসকষ্টও হতে পারে। কখনো কখনো তা গুরুতর ঝুঁকি তৈরি করতে পারে।

সাধারণ ভোক্তাদের পরামর্শ দিয়ে তিনি বলেন, মিষ্টিজাতীয় খাবার কেনা বা খাওয়ার সময় অস্বাভাবিক চকচকে মনে হলে তা এড়িয়ে চলাই ভালো। এ ছাড়া খাবার গ্রহণের ক্ষেত্রে সচেতন হওয়া জরুরি।

প্রতিনিধি/এসএস