জেলা প্রতিনিধি
০৯ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ০৯:২৬ এএম
একসময় ঢাকার ব্যস্ত শহরে অফিসের চার দেয়ালের মধ্যে কাটত দিন। মাস শেষে বেতন আসত, চলছিল চেনা জীবন। তবে মনের মধ্যে ছিল নিজের মাটিতে দাঁড়িয়ে কিছু করার স্বপ্ন। শেষ পর্যন্ত সেই স্বপ্নের টানে ২০১৪ সালে ঢাকার চাকরি ছেড়ে গ্রামের বাড়িতে ফিরে আসেন দিনাজপুরের কাহারোল উপজেলার রামচন্দ্রপুর গ্রামের উদ্যোক্তা মীর মহসিন আলী চৌধুরী।
মাত্র ১৩টি গরু দিয়ে শুরু করা সেই উদ্যোগ এখন রূপ নিয়েছে বড় বাণিজ্যিক খামারে। তার গড়ে তোলা ‘পৃথ্বী অ্যাগ্রো’ এখন দিনাজপুরের অন্যতম বড় বাণিজ্যিক মহিষের খামার। গরু মোটাতাজাকরণের পাশাপাশি বর্তমানে খামারে রয়েছে ৭৪টি মহিষ। গরু ও মহিষের খামারে তার মোট বিনিয়োগ প্রায় দেড় কোটি টাকা।
চাকরি ছেড়ে গ্রামে ফেরার পর ১৩টি গরু দিয়ে শুরু হয় মহসিনের খামারের যাত্রা। প্রায় তিন মাস পরপর গরু মোটাতাজা করে বিক্রি করতেন তিনি। লাভের অর্থ নিজের কাজে ব্যয় না করে আবার খামারে বিনিয়োগ করতেন। এভাবে ধীরে ধীরে বাড়তে থাকে গরুর সংখ্যা ও ব্যবসার পরিধি।
একপর্যায়ে গরু মোটাতাজাকরণ থেকে পাওয়া লাভের অর্থ দিয়ে কয়েকটি মহিষ কেনেন মহসিন। শুরু করেন মহিষ মোটাতাজাকরণ। পাঁচটি মহিষ দিয়ে শুরু করা সেই উদ্যোগ এখন দাঁড়িয়েছে ৭৪টিতে।

মহিষের সংখ্যা বাড়ানোর পদ্ধতিটাও ছিল ধারাবাহিক। একটি মহিষ বিক্রি করে দুটি, দুটি থেকে চারটি, চারটি থেকে আটটি—এভাবে ধীরে ধীরে বাড়তে থাকে খামারের মহিষের সংখ্যা। ব্যবসা থেকে পাওয়া লাভ আবার খামারে বিনিয়োগ করাই ছিল তার মূল কৌশল।
বর্তমানে ৭৪টি মহিষের পাশাপাশি খামারে গরু মোটাতাজাকরণও চলছে। পশুর খাদ্যের চাহিদা মেটাতে নিজস্ব জমিতে নেপিয়ার ঘাস ও ভুট্টা চাষ করছেন মহসিন। রয়েছে ভুসি তৈরির ব্যবস্থাও।
মহিষের স্বাস্থ্য ও আরাম নিশ্চিত করতে খামারে নেওয়া হয়েছে নানা ব্যবস্থা। পর্যাপ্ত ফ্যানের পাশাপাশি গরমের সময় পানি ছিটিয়ে মহিষকে ঠান্ডা রাখার ব্যবস্থা রয়েছে। নিয়মিত গোসল, পরিষ্কার-পরিচ্ছন্নতা, পুষ্টিকর খাবার ও সার্বক্ষণিক পরিচর্যায় রাখা হয় পশুগুলোকে।
মহিষের খাদ্যতালিকায় রয়েছে ভুট্টা, কাঁচা ঘাস, খড়, ভুসি ও অন্যান্য পুষ্টিকর খাবার। প্রায় তিন মাস পরপর মোটাতাজা করা মহিষ বিক্রি করা হয়। সেই অর্থ দিয়ে আবার নতুন মহিষ কেনা হয়। এভাবেই চলছে খামারের ব্যবসা।
মহসিনের উদ্যোগে শুধু তার নিজের অর্থনৈতিক পরিবর্তন হয়নি, স্থানীয় বেকার যুবকদেরও কর্মসংস্থানের সুযোগ তৈরি হয়েছে। বর্তমানে খামারে নিয়মিত কাজ করছেন আটজন কর্মী। মহিষকে গোসল করানো, খাবার দেওয়া, গোবর পরিষ্কার, পানি দেওয়া, গরমের সময় পানি ছিটিয়ে ঠান্ডা রাখা ও স্বাস্থ্য পর্যবেক্ষণসহ বিভিন্ন কাজ করেন তারা।

খামারের উদ্যোক্তা মীর মহসিন আলী চৌধুরী বলেন, ‘মানুষের লক্ষ্য ও উদ্দেশ্য সঠিক থাকলে এবং সততা, পরিশ্রম ও নিয়ম-শৃঙ্খলা বজায় রাখলে সফল হওয়া সম্ভব। আমি চাকরি ছেড়ে নিজের স্বপ্নকে বাস্তবায়ন করেছি। প্রতিদিন অন্যান্য ব্যবসায়িক কাজ শেষ করে যখন খামারে আসি, তখন আলাদা এক ধরনের প্রশান্তি অনুভব করি।’
ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা সম্পর্কে তিনি বলেন, ‘খামারটি আরও সম্প্রসারণ করতে চাই। পাশাপাশি আরও বেশি মানুষের কর্মসংস্থান সৃষ্টি করতে চাই।’
খামারের কর্মী সাদিকুল ইসলাম বলেন, ‘প্রতিদিন মহিষগুলোর গোসল করানো, গোবর পরিষ্কার, খাবার দেওয়া, গরমের সময় পানি ছিটিয়ে ঠান্ডা রাখা এবং খামার পরিষ্কার রাখাই আমাদের প্রধান কাজ। আমার মতো আরও কয়েকজন যুবকেরও কর্মসংস্থান হয়েছে।’
কাহারোল উপজেলা প্রাণিসম্পদ কর্মকর্তা ডা. মো. আবু সরফরাজ হোসেন বলেন, ‘আমাদের পক্ষ থেকে খামারিদের নিয়মিত প্রশিক্ষণ দেওয়া হচ্ছে। পাশাপাশি নিয়মিত ভ্যাকসিন, সরকারি মূল্যে কৃমিনাশক ওষুধ এবং প্রয়োজনীয় চিকিৎসাসেবা দেওয়া হচ্ছে। খামারিরা যেন প্রয়োজনীয় চিকিৎসাসেবা থেকে বঞ্চিত না হন, সে বিষয়টি আমরা নিয়মিত নিশ্চিত করছি।’
তিনি আরও বলেন, ‘মহসিন অত্যন্ত আগ্রহী একজন খামারি। তিনি নিয়মিত আমাদের অফিসে এসে বিভিন্ন বিষয়ে পরামর্শ নেন। খামারকে কীভাবে আরও সমৃদ্ধ ও লাভজনক করা যায়, সে বিষয়েও আমাদের কাছ থেকে প্রয়োজনীয় পরামর্শ গ্রহণ করেন।’
প্রতিনিধি/এসএস