জেলা প্রতিনিধি
০৮ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ০৭:৫৬ পিএম
গাজীপুর ক্রমেই ডেঙ্গুর হটস্পট হয়ে উঠছে। প্রশাসনের উদাসীনতা, জনসাধারণের সচেতনতার অভাব এবং মশক নিধনে সিটি করপোরেশনের দায়সারা উদ্যোগের কারণে ডেঙ্গু, চিকুনগুনিয়াসহ মশাবাহিত রোগের প্রকোপ বাড়ছে। এতে অতিষ্ঠ হয়ে পড়েছে জনজীবন। সরকারি-বেসরকারি হাসপাতালগুলোতে বাড়ছে রোগীর চাপ। শয্যা সংকটে শহীদ তাজউদ্দীন আহমদ মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে অনেক রোগীকে মেঝে ও করিডোরে চিকিৎসা নিতে হচ্ছে।
স্থানীয়দের অভিযোগ, মশক নিধনে সিটি করপোরেশনের দায়সারা কর্মসূচির কারণে মশার উপদ্রব বেড়েছে। ফলে আশঙ্কাজনকভাবে বাড়ছে ডেঙ্গুর প্রকোপ।
সরেজমিনে দেখা গেছে, গাজীপুর সিটি করপোরেশনের কোনাবাড়ী, কাশিমপুর, টঙ্গী ও জয়দেবপুরসহ বিভিন্ন এলাকায় ব্যাপক হারে বেড়েছে ডেঙ্গু আক্রান্ত রোগীর সংখ্যা। যত্রতত্র জমে থাকা পানি, ময়লা-আবর্জনা, স্থানীয়দের সচেতনতার অভাব এবং সিটি করপোরেশনের গাফিলতির কারণে সন্ধ্যার পর মশার উপদ্রবে টেকা দায়। এতে ডেঙ্গু, চিকুনগুনিয়াসহ বিভিন্ন মশাবাহিত রোগ বাড়ছে।
গত রোববার কোনাবাড়ী এলাকায় ডেঙ্গুতে আক্রান্ত হয়ে ইফতেখার হোসেন সিয়াম (১৪) নামে দশম শ্রেণির এক শিক্ষার্থীর মৃত্যু হয়েছে। ওই রাতে ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় তার মৃত্যু হয় বলে জানান স্বজনরা।
পরিবারের সদস্যরা জানান, কয়েকদিন ধরে সিয়াম জ্বরে ভুগছিলেন। পরে জ্বরের তীব্রতা বেড়ে গেলে পরীক্ষা-নিরীক্ষা করা হয়। পরীক্ষায় ডেঙ্গু শনাক্ত হওয়ার পর গত শুক্রবার তাকে কোনাবাড়ী শরীফ জেনারেল হাসপাতালে ভর্তি করা হয়।
সেখানে চিকিৎসাধীন অবস্থায় শারীরিক অবস্থার অবনতি হলে রোববার রাত ১০টার দিকে তাকে ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে নেওয়ার পরামর্শ দেওয়া হয়। পরে রাতেই তাকে ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে নেওয়া হয়। সেখানে রাত ১২টা ৫০ মিনিটে কর্তব্যরত চিকিৎসক সিয়ামকে মৃত ঘোষণা করেন।
এর আগে গত ২৫ আগস্ট কুদ্দুস নগর এলাকায় সুমাইয়া আক্তার এবং ৪ সেপ্টেম্বর মোহনা আক্তার নামে আরও দুই শিক্ষার্থী ডেঙ্গুতে আক্রান্ত হয়ে মারা যান। মাত্র ১৪ দিনের ব্যবধানে ওই এলাকায় তিনজন ডেঙ্গু আক্রান্ত হয়ে মারা যাওয়ার ঘটনায় উদ্বেগ দেখা দিয়েছে।
এছাড়া গত রোববার (১ সেপ্টেম্বর) ডেঙ্গু আক্রান্ত হয়ে কাপাসিয়ার বাসিন্দা আজিম খান (১৭) নামে এক কিশোরের মৃত্যু হয়েছে।
অল্প সময়ের ব্যবধানে চারজনের ডেঙ্গুতে মৃত্যুর ঘটনায় সিটি করপোরেশন এলাকাসহ বিভিন্ন এলাকায় উদ্বেগ ও আতঙ্ক দেখা দিয়েছে।
স্থানীয় বাসিন্দারা জানান, বর্ষা মৌসুমে কোনাবাড়ীসহ বিভিন্ন আবাসিক এলাকা ও অলিগলিতে মশার প্রকোপ বেড়েছে। অনেক জায়গায় জমে থাকা পানি সময়মতো অপসারণ করা হচ্ছে না। পাশাপাশি নিয়মিত মশক নিধন কার্যক্রম না থাকায় ডেঙ্গুর ঝুঁকি বাড়ছে।
ডেঙ্গুর প্রকোপ বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে রোগীর পথ্য হিসেবে ব্যবহৃত ডাবের দামও বেড়েছে বলে জানান স্থানীয়রা। কয়েকজন এলাকাবাসী বলেন, চিকিৎসকরা ডেঙ্গু রোগীদের তরল খাবার খেতে বলেন। ফলে ডেঙ্গুর প্রকোপ বাড়ায় কোনাবাড়ী এলাকায় একটি ডাব ১৫০ থেকে ২০০ টাকায় বিক্রি হচ্ছে।
এদিকে শহীদ তাজউদ্দীন আহমদ মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের ডেঙ্গু ওয়ার্ডে পা রাখলেই চোখে পড়ে রোগীর চাপের চিত্র। শয্যার সংকটে অনেক রোগীকে করিডোর বা মেঝেতে চিকিৎসা নিতে হচ্ছে। কারও শরীরে জ্বর, কেউ দুর্বল হয়ে পড়েছেন, আবার কেউ ডেঙ্গুর যন্ত্রণায় কাতরাচ্ছেন। এমন পরিস্থিতিতেও অনেক রোগীকে মশারি ছাড়াই রাত কাটাতে দেখা গেছে।
আক্রান্তের সংখ্যা বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে এই হাসপাতালসহ অন্যান্য হাসপাতালেও রোগীর চাপ বেড়েছে। চিকিৎসক ও নার্সদের ব্যস্ততাও বেড়েছে কয়েক গুণ। তবে শয্যা সংকটের কারণে চিকিৎসাসেবা দিতে গিয়ে হিমশিম খেতে হচ্ছে হাসপাতাল কর্তৃপক্ষকে।
শহীদ তাজউদ্দীন আহমদ মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের আবাসিক চিকিৎসক (মেডিসিন) ডা. শেখ কামরুল করিম জানান, বর্তমানে হাসপাতালে ১১৩ জন ডেঙ্গু রোগী ভর্তি রয়েছেন। চলতি বছরের জানুয়ারি থেকে এ পর্যন্ত হাসপাতালে ডেঙ্গু আক্রান্ত হয়ে ১ হাজার ৫৮২ জন রোগী ভর্তি হয়েছেন। এ সময়ে মারা গেছেন তিনজন।
তিনি বলেন, হাসপাতালের বিদ্যমান শয্যায় সাধারণ রোগীর চাপ তো রয়েছেই। এর সঙ্গে ডেঙ্গু রোগীর সংখ্যা বেড়ে যাওয়ায় পরিস্থিতি সামাল দেওয়া কঠিন হয়ে পড়েছে।
গাজীপুরের সিভিল সার্জন ডা. মো. মামুনুর রহমান জানান, গত সোমবার পর্যন্ত জেলার দুটি সরকারি হাসপাতাল ও পাঁচটি উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে ৩০৯টি পরীক্ষা করা হয়েছে। এর মধ্যে ৪৫ জনের ডেঙ্গু শনাক্ত হয়েছে। বেসরকারি হাসপাতাল ও ক্লিনিক থেকে পাওয়া ৪৬২টি পরীক্ষার প্রতিবেদনের মধ্যে ৯১ জন পজিটিভ হয়েছেন। সরকারি-বেসরকারি মিলিয়ে ৭৭১টি পরীক্ষায় ১৩৬ জন ডেঙ্গু শনাক্ত হয়েছেন। ওইদিন পর্যন্ত হাসপাতালে ভর্তি ছিলেন ১৮৯ জন ডেঙ্গু রোগী।
তিনি আরও বলেন, চিকিৎসার জন্য সরকারি হাসপাতালগুলোতে পর্যাপ্ত ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে। সরকারিভাবে রোগ নির্ণয় ও চিকিৎসার জন্য পর্যাপ্ত শয্যার ব্যবস্থা রাখা হয়েছে। এছাড়া সরকারি নির্দেশনায় হাসপাতাল পরিষ্কার-পরিচ্ছন্নতার কার্যক্রমও চলমান রয়েছে।
শহীদ তাজউদ্দীন আহমদ মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে চিকিৎসাধীন সালমা আক্তার জানান, ভেতরে শয্যা না পেয়ে তাদের করিডোরে অবস্থান করতে হচ্ছে। অনেক সময় বিছানা কিংবা মশারিও পাওয়া যায় না।
কোনাবাড়ী থেকে হাসপাতালে আসা রোগীর স্বজন আকলিমা বেগম ডেঙ্গু বিস্তারের জন্য মশা নিধনে কার্যকর উদ্যোগের ঘাটতিকে দায়ী করেছেন। তার অভিযোগ, সিটি করপোরেশনের পক্ষ থেকে নিয়মিত ও কার্যকরভাবে মশা নিধন করা হচ্ছে না। বিভিন্ন স্থানে নালা ও ময়লার স্তূপ পড়ে থাকায় সেখানেই মশার বংশবিস্তার হচ্ছে।
তবে সিটি করপোরেশন কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে, মশা নিয়ন্ত্রণ ও জনসচেতনতা বাড়াতে প্রতিটি ওয়ার্ডে স্বেচ্ছাসেবক নিয়োগ করা হয়েছে। পাশাপাশি নিয়মিত ওষুধ ছিটানোর কার্যক্রমও চলছে।
মশার লার্ভা ধ্বংসের জন্য সোমবার দুপুরে বিটিআইয়ের (ব্যাসিলাস থুরিনজিয়েনসিস ইসরায়েলেনসিস) প্রয়োগ শুরু হয়েছে। শহীদ তাজউদ্দীন আহমদ মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে এই কার্যক্রমের উদ্বোধন করেন সিটি করপোরেশনের প্রশাসক মো. শওকত হোসেন সরকার।
গাজীপুর সিটি করপোরেশনের অতিরিক্ত প্রধান প্রকৌশলী সুদীপ বসাক বলেন, বিটিআই মূলত নির্দিষ্ট ধরনের মশার লার্ভার বিরুদ্ধে কার্যকর একটি জৈব উপাদান। এটি লার্ভা ধ্বংসে ব্যবহার করা হয় এবং মশার জীবনচক্রের শুরুতেই নিয়ন্ত্রণের সুযোগ তৈরি করে। ফলে নিয়মিত লার্ভা শনাক্তকরণ, প্রজননস্থল পরিষ্কার এবং প্রয়োজনীয় স্থানে বিটিআই প্রয়োগের মাধ্যমে মশার ঘনত্ব কমিয়ে আনার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।
এ সময় প্রশাসক শওকত হোসেন সরকার সাংবাদিকদের বলেন, বিটিআই মশার লার্ভা নিধনের একটি কার্যকর ওষুধ। মশার প্রাদুর্ভাব বেশি এমন নয়টি ওয়ার্ডে প্রথমে এটি প্রয়োগ করা হবে। পর্যায়ক্রমে ৫৭টি ওয়ার্ডে ডেঙ্গু ও মশাবাহিত বিভিন্ন রোগের বিস্তার রোধে মশার লার্ভা ধ্বংসে এ কার্যক্রম চালানো হবে।
প্রশাসক আরও বলেন, মশার বংশবিস্তার নিয়ন্ত্রণে শুধু উড়ন্ত মশা নিধন নয়, লার্ভা ধ্বংসের ওপরও গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে। এ লক্ষ্যে মশার সম্ভাব্য প্রজননস্থল চিহ্নিত করে সেখানে বিটিআই প্রয়োগ করা হবে। গাজীপুর সিটি করপোরেশন ইতোমধ্যে মশার প্রজননস্থল ধ্বংস অভিযান এবং পরিবেশবান্ধব বিটিআই বায়োপেস্টিসাইডের পরীক্ষামূলক প্রয়োগ শুরু করেছে।
জমে থাকা পানিতে এডিস মশার বংশবিস্তার ঘটে। ফলে মশার লার্ভা অবস্থাতেই ধ্বংস করতে পারলে পরবর্তী সময়ে পূর্ণাঙ্গ মশার সংখ্যা কমিয়ে আনা সম্ভব হবে। ডেঙ্গু নিয়ন্ত্রণে মশার প্রজননস্থল ধ্বংসের পাশাপাশি নগরবাসীর সচেতনতাও গুরুত্বপূর্ণ।
তবে হাসপাতালের করিডোরে ঠাঁই নেওয়া রোগী ও স্বজনরা বলছেন, শুধু হাসপাতালকেন্দ্রিক চিকিৎসা ব্যবস্থাপনা নয়, ডেঙ্গুর বিস্তার ঠেকাতে আক্রান্ত এলাকায় মশা নিয়ন্ত্রণ ও পরিচ্ছন্নতা কার্যক্রমও সমান গুরুত্বপূর্ণ। নগরীর নালা, ময়লার স্তূপ ও সম্ভাব্য প্রজননস্থলগুলো কার্যকরভাবে নিয়ন্ত্রণে না এলে হাসপাতালের ওপর রোগীর চাপ আরও বাড়ার আশঙ্কা করছেন তারা।
প্রতিনিধি/এমআর