জেলা প্রতিনিধি
০৮ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ০১:০৫ পিএম
কেউ নিঃসন্তান, কেউ থাকেন নাতি-নাতনির সঙ্গে, আবার কারও ঠাঁই হয়েছে জনাকীর্ণ ঘরে। ঠিকমতো চিকিৎসাসেবাও জোটে না। দু-মুঠো খাবারেই দিন পার করেন গ্রামের অনেক প্রবীণ। সুবিধাবঞ্চিত ও অসহায় এসব প্রবীণের পাশে দাঁড়িয়েছে নাটোরের গুরুদাসপুর উপজেলার খুবজিপুরের ‘প্রবীণ সেবাকেন্দ্র’। বর্তমানে নিবন্ধিত ১৮০ জন প্রবীণকে আজীবন বিনা মূল্যে চিকিৎসাসেবা ও ওষুধ দেওয়ার ব্যবস্থা করেছে কেন্দ্রটি।
প্রবীণ সেবাকেন্দ্র সূত্রে জানা গেছে, ২০২০ সালে গুরুদাসপুর উপজেলার খুবজিপুর গ্রামে ১০ কাঠা জমির ওপর একতলা ভবনে কেন্দ্রটি প্রতিষ্ঠা করা হয়। এর প্রতিষ্ঠাতা স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের সাবেক সচিব মো. সাইদুর রহমান। শুরুতে ৯৪ জন রোগী নিয়ে কার্যক্রম শুরু হলেও বর্তমানে নিবন্ধিত প্রবীণ রোগীর সংখ্যা ১৮০। তাদের মধ্যে ৬০ জন পুরুষ ও ১২০ জন নারী।

কেন্দ্রে একজন উপসহকারী কমিউনিটি মেডিকেল অফিসার, একজন থেরাপিস্ট ও একজন অফিস সহকারী রয়েছেন। ১১টি কক্ষের এ কেন্দ্রে প্রবীণদের বিনা মূল্যে চিকিৎসা ও ওষুধ দেওয়া হয়। সাধারণ রোগীরাও ৫০ টাকা ফি দিয়ে চিকিৎসা ও থেরাপি নিতে পারেন। সকাল ৯টা থেকে বিকেল ৫টা পর্যন্ত কেন্দ্রটি খোলা থাকে। শুক্রবার সাপ্তাহিক ছুটি।
প্রবীণ সেবাকেন্দ্রটি কোনো বৃদ্ধাশ্রম নয়। এটি মূলত প্রবীণদের চিকিৎসাসেবা দেওয়ার প্রতিষ্ঠান। এখানে রক্তচাপ ও ডায়াবেটিস পরীক্ষা, রোগ নির্ণয় ও থেরাপি দেওয়া হয়। যেসব প্রবীণ চলাফেরা করতে পারেন না, তাদের বাড়িতে গিয়ে স্বাস্থ্য পরীক্ষা ও ওষুধ দেওয়া হয়। পাশাপাশি প্রতি মাসে ঢাকার বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকদের নিয়ে ক্যাম্পের মাধ্যমে প্রবীণদের চিকিৎসাসেবা দেওয়া হয়।

থেরাপি নিতে আসা মালা খাতুন বলেন, ‘অনেক দিন ধরে এখানে থেরাপি নিচ্ছি। কোমরের ব্যথা অনেক কমে গেছে। অন্য থেরাপি সেন্টারে চিকিৎসা নিয়েও ব্যথা কমেনি। গত এক মাস ধরে এখানে থেরাপি নিচ্ছি। এখানকার চিকিৎসাসেবা ভালো। ৫০ টাকা ফি দিয়ে থেরাপি নিতে পারছি।’
প্রবীণ মো. মোজাম্মেল হোসেন বলেন, ‘২০২০ সাল থেকে নিবন্ধনের মাধ্যমে এই সেবা কেন্দ্রের চিকিৎসা নিচ্ছি। এখানে ডাক্তার দেখেন, বিনা মূল্যে চিকিৎসা ও ওষুধ দেন। কোনো টাকা-পয়সা লাগে না। কিডনি ও শ্বাসকষ্টের সমস্যা নিয়ে এখানে চিকিৎসা নিয়ে এখন অনেক ভালো আছি।’
আরেক প্রবীণ জবেদা খাতুন বলেন, ‘২০২০ সাল থেকে এখানকার ওষুধ খাচ্ছি। অনেক সময় অসুস্থ হয়ে পড়লে তারা বাড়িতে গিয়ে পরীক্ষা করে ওষুধ দিয়ে আসেন। শুধু ওষুধ নয়, বছরের বিশেষ দিনগুলোতে আমাদের মতো প্রবীণদের জন্য খাদ্যসামগ্রীও বাড়িতে পাঠানো হয়। আগে টাকার অভাবে চিকিৎসা করাতে পারতাম না। এখন বিনা মূল্যে চিকিৎসা পাচ্ছি।’

প্রবীণ সেবাকেন্দ্রের খুবজিপুর ইউনিটের সাধারণ সম্পাদক ও শিক্ষক আবু সাইদ সরকার বলেন, ‘এলাকার যেসব অসহায় প্রবীণের সামান্য জ্বর হলে একটি নাপা কিনে খাওয়ানোর মানুষ নেই, টাকার অভাবে চিকিৎসা নিতে পারেন না—তাদের জন্যই এই সেবা কেন্দ্র। আমাদের বেশির ভাগ রোগীর বয়স ৬০ বছরের বেশি। অনেকের বয়স ১০০ বছর পেরিয়েছে। তাদের অনেকেই কেন্দ্রে আসতে পারেন না। তাদের বাড়িতে গিয়ে সেবা দিতে হয়।’
তিনি বলেন, ‘নিবন্ধিত ১৮০ জন প্রবীণের আজীবন চিকিৎসার দায়িত্ব আমাদের। প্রতি মাসে ঢাকার বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকদের ক্যাম্পের মাধ্যমে তাদের চিকিৎসাসেবার আওতায় আনা হয়।’
কেন্দ্রের উপসহকারী কমিউনিটি মেডিকেল অফিসার হাসানুজ্জামান বলেন, নিবন্ধিত ১৮০ জন প্রবীণ রোগীর স্বাস্থ্য পরীক্ষা করে প্রতি মাসে বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকেরা ব্যবস্থাপত্র দেন। এরপর তাদের প্রয়োজনীয় ওষুধ সরবরাহ করা হয়। যারা চলাফেরা করতে পারেন না, তাদের বাড়িতে গিয়ে স্বাস্থ্য পরীক্ষা ও ওষুধ দেওয়া হয়। বিশেষ করে রক্তচাপ ও ডায়াবেটিস পরীক্ষা করা হয়। নিবন্ধিত রোগীদের মধ্যে ৬০ থেকে ৭০ বছর বয়সী যেমন আছেন, তেমনি ১০০ বছর বয়সী রোগীও রয়েছেন। তাদের বেশির ভাগই দরিদ্র।

প্রবীণ সেবাকেন্দ্রের প্রতিষ্ঠাতা সভাপতি ও সাবেক স্বাস্থ্য সচিব মো. সাইদুর রহমান বলেন, ‘আমার মায়ের বার্ধক্যের কষ্টগুলো খুব কাছ থেকে দেখেছি। তাদের কষ্টগুলো আমরা অনেক সময় বুঝতে পারি না। কেন তারা অবুঝের মতো আচরণ করেন, কেন কথা শুনতে চান না—পরবর্তী সময়ে তাদের কষ্টগুলো অনুভব করতে পেরেছি।’
তিনি বলেন, ‘একজন সমাজকর্মী হিসেবে তাদের জন্য কিছু করার তাগিদ অনুভব করি। ২০২০ সালে প্রবীণ সেবাকেন্দ্র প্রতিষ্ঠা করি। প্রথম দিকে প্রবীণদের চিকিৎসার জন্য ক্যাম্প করতাম। কিন্তু ক্যাম্পে স্থায়ী চিকিৎসাসেবা দেওয়া সম্ভব নয়। অনেক রোগী ব্যবস্থাপত্র নেওয়ার পরও ওষুধ কিনতে পারতেন না। অনেকে নিয়মিত ওষুধও খেতেন না।’
সাইদুর রহমান আরও বলেন, ‘এরপর কীভাবে সব সময় প্রবীণদের পাশে থেকে স্থায়ী চিকিৎসাসেবা নিশ্চিত করা যায়, তা নিয়ে ভাবি। পরে বিভিন্ন গ্রামের অসহায় ও দরিদ্র প্রবীণদের নিবন্ধনের মাধ্যমে নিয়মিত চিকিৎসাসেবা চালু করি। আমরা যদি প্রবীণদের পাশে দাঁড়াতে পারি, তাহলে অন্তত বার্ধক্যে আমাদের বাবা-মায়েদের চিকিৎসাসেবা নিশ্চিত করা সম্ভব হবে।’
প্রতিনিধি/এসএস