জেলা প্রতিনিধি
০৭ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ০৭:৪১ এএম
বৃষ্টি এলেই বিছানা সরাতে হয়। ঘরের চালের ছিদ্র দিয়ে বৃষ্টির ফোঁটার সঙ্গে দেখা যায় আকাশও। টিনের বেড়ার অনেক জায়গা খুলে গেছে। চালের বিভিন্ন অংশ ঝুরঝুর করে খসে পড়ছে। সোয়া তিন শতাংশ জমির ওপর দাঁড়িয়ে থাকা সেই জরাজীর্ণ ঘরের একটি বিছানায় শুয়ে আছে হিয়া মনি।
মাথায় অসহনীয় যন্ত্রণা। ঠিকমতো হাঁটতে পারে না। চোখে ঝাপসা দেখে। খাওয়ারও ইচ্ছা নেই। অথচ এই কষ্টের মধ্যেও ছোট্ট মেয়েটির মনে একটি স্বপ্ন জেগে আছে—আবার স্কুলে ফিরবে। সহপাঠীদের সঙ্গে বসবে, বই-খাতা নিয়ে ক্লাস করবে।
ক্ষীণ কণ্ঠে হিয়া বলে, ‘আমি আবার স্কুলে যেতে চাই। আমি বাঁচতে চাই।’
গাইবান্ধার সুন্দরগঞ্জ পৌরসভার ৮ নম্বর ওয়ার্ডের হরি মহন্ত ও বিউটি রানী দম্পতির একমাত্র সন্তান হিয়া মনি। সুন্দরগঞ্জ শহীদ মিনার সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের তৃতীয় শ্রেণির শিক্ষার্থী সে। কিন্তু প্রায় দুই বছর ধরে অসুস্থতার সঙ্গে লড়াই করতে করতে বই-খাতা আর সহপাঠীদের কাছ থেকে দূরে সরে গেছে মেয়েটি।
হিয়ার বাবা হরি মহন্তের সকাল শুরু হয় চায়ের কেটলির ধোঁয়া দিয়ে। উপজেলা পরিষদ পুকুরের পশ্চিম পাড়ে সরকারি জায়গায় পলিথিন দিয়ে ঘেরা ছোট্ট একটি চায়ের দোকান তার। একটি টেবিল, জোড়াতালি দেওয়া দুটি বেঞ্চ, কয়েকটি চায়ের কাপ-গ্লাস আর সামান্য কিছু বিস্কুট ও কেক—এই তার দোকানের সম্বল।
চায়ের কেটলিতে আগুন জ্বলে, কিন্তু হরি মহন্তের সংসারে যেন প্রতিদিনই জ্বলে দুশ্চিন্তার আগুন। দিন শেষে দোকান থেকে যে আয় হয়, তাতে সংসার চালানোই কঠিন। এর মধ্যে একমাত্র মেয়ের চিকিৎসার খরচ জোগাড় করা তার কাছে অসম্ভব হয়ে উঠেছে।
প্রায় দুই বছর আগে হিয়া অসুস্থ হয়ে পড়ে। জ্বর, বমি আর মাথাব্যথা কিছুতেই কমছিল না। স্থানীয়ভাবে চিকিৎসা করিয়েও সুস্থ হয়নি সে। পরে রংপুরে শিশু বিশেষজ্ঞের কাছে নেওয়া হয়। সেখান থেকে নিউরো বিশেষজ্ঞের পরামর্শে রংপুর মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে ভর্তি করা হয় হিয়াকে।
পরীক্ষা-নিরীক্ষার পর পরিবারের সদস্যরা জানতে পারেন, হিয়ার মাথায় ব্রেইন টিউমার হয়েছে। উন্নত চিকিৎসার জন্য তাকে ঢাকায় নেওয়ার পরামর্শ দেওয়া হয়। কিন্তু অর্থের অভাবে সেখানেই থেমে যায় চিকিৎসার পথ।
মেয়েকে বাঁচানোর ইচ্ছা আছে, কিন্তু সামর্থ্য নেই হরি মহন্তের। চিকিৎসার জন্য প্রয়োজন হতে পারে কয়েক লাখ টাকা। সামান্য চায়ের দোকানের আয় দিয়ে এত বড় অঙ্কের টাকা জোগাড় করা তার পক্ষে অসম্ভব।
তাই এখন মেয়ের পাশে বসে থাকা আর অসহায় চোখে তার কষ্ট দেখা ছাড়া যেন আর কোনো পথ নেই বাবা-মায়ের।
জরাজীর্ণ ঘরের বিছানায় শুয়ে থাকা মেয়ের কপালে হাত রেখে বসে থাকেন মা বিউটি রানী। কখনো মেয়ের মাথায় হাত বুলিয়ে দেন, কখনো চোখের পানি লুকানোর চেষ্টা করেন।
হিয়া বলে, ‘আমার মাথায় অনেক যন্ত্রণা হয়। হাঁটতে পারি না। চোখে ঝাপসা দেখি। খেতে পারি না। আমি আবার স্কুলে যেতে চাই।’
হরি মহন্ত বলেন, ‘মেয়েকে বাঁচানোর সাধ আছে, কিন্তু টাকা নেই। ডাক্তার বলেছেন ঢাকায় চিকিৎসা করাতে হবে। অনেক টাকা লাগবে। আমার ছোট্ট চায়ের দোকানের আয় দিয়ে সংসারই চলে না। মেয়ের চিকিৎসা করাব কীভাবে?’
বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক কমলা কান্ত বসুনিয়া বলেন, ‘হিয়া অত্যন্ত শান্ত, ভদ্র ও মিষ্টি স্বভাবের শিক্ষার্থী। অসুস্থতার কারণে দীর্ঘদিন ধরে সে স্কুলে আসছে না। এর আগে শিক্ষক ও শিক্ষার্থীরা মিলে পরিবারটিকে কিছু সহযোগিতা করেছিলেন।’
একটি জরাজীর্ণ ঘরের বিছানায় শুয়ে হিয়ার দিন কাটে। শরীর তাকে আটকে রেখেছে ঘরের চার দেয়ালের মধ্যে। কিন্তু স্বপ্নটা এখনো মরে যায়নি। সে আবার স্কুলে যেতে চায়। বই-খাতা হাতে নিতে চায়। সহপাঠীদের সঙ্গে ক্লাসে বসতে চায়।
তার সেই স্বপ্ন পূরণে এখন প্রয়োজন মানুষের সহযোগিতা।
হিয়া মনির চিকিৎসায় সহযোগিতা করতে বিকাশ-নগদ: ০১৭৪০-৪৩৪৫৭৩।
প্রতিনিধি/এসএস