জেলা প্রতিনিধি
০৬ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ১২:৪৩ পিএম
কুমিল্লার জেলা প্রশাসক রোজী আক্তারের বিরুদ্ধে গণমাধ্যমকর্মীদের সঙ্গে সাক্ষাৎ না করা, অপেক্ষায় বসিয়ে রাখা, ফোন না ধরা এবং বিভিন্ন বিষয়ে বক্তব্য চাইলে অতিরিক্ত জেলা প্রশাসকদের (এডিসি) কাছে পাঠিয়ে দেওয়ার অভিযোগ উঠেছে। একই ধরনের অভিযোগ রয়েছে পুলিশ প্রশাসনের কয়েকজন কর্মকর্তার বিরুদ্ধেও।
এমন আচরণে ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন স্থানীয় কয়েকজন গণমাধ্যমকর্মী ও সাংবাদিক নেতা। সম্প্রতি বিভিন্ন বিষয়ে বক্তব্য নিতে গিয়ে নিজেদের এমন অভিজ্ঞতার কথা জানিয়েছেন কয়েকজন সাংবাদিক।
কুমিল্লায় শব্দদূষণ রোধে জেলা প্রশাসনের উদ্যোগ সম্পর্কে জানতে গত ৯ আগস্ট জেলা প্রশাসক রোজী আক্তারকে একাধিকবার ফোন করেন ঢাকা মেইলের কুমিল্লা জেলা প্রতিনিধি সাকলাইন যোবায়ের। তিনি ফোন না ধরায় পরে অতিরিক্ত জেলা প্রশাসক (সার্বিক) মো. সাইফুল ইসলামের বক্তব্য নিতে হয় তাকে।
সম্প্রতি জেলা প্রশাসকের কার্যালয়ে যান দৈনিক আমার দেশের কুমিল্লা প্রতিনিধি এম হাসান। ভিজিটিং কার্ড দেওয়ার কিছুক্ষণ পর সহকারী কমিশনার রাফিদ খান এসে তাকে জানান, জেলা প্রশাসক অতিরিক্ত জেলা ম্যাজিস্ট্রেটের সঙ্গে যোগাযোগ করতে বলেছেন। জেলা প্রশাসকের সঙ্গে সরাসরি কথা বলার জন্য আবারও অনুরোধ করা হলেও তাতে সাড়া দেওয়া হয়নি বলে জানান এম হাসান।
এম হাসান বলেন, গত ১৬ বছরে কুমিল্লায় বিএনপি-জামায়াতের নেতাকর্মীদের বিরুদ্ধে প্রায় ১ হাজার ২০০ মামলা হয়েছে। এসব মামলা প্রত্যাহার ও নিষ্পত্তির বিষয়টি সংশ্লিষ্ট কমিটির মাধ্যমে দেখভাল করা হচ্ছে। জেলা প্রশাসক ওই কমিটির সভাপতি। এ বিষয়ে তার বক্তব্য জানতে চাওয়া হলেও তাকে পাওয়া যায়নি।
নারীর ক্ষমতায়ন বিষয়ে বক্তব্য নিতে জেলা প্রশাসকের কার্যালয়ে যান ডিবিসির কুমিল্লা প্রতিনিধি নাসির উদ্দিন। ভিজিটিং কার্ড পাঠানোর পর তাকে কিছুক্ষণ অপেক্ষা করতে বলা হয়। প্রায় ১০ মিনিট পর সহকারী কমিশনার রাফিদ খান এসে জানান, এ বিষয়ে অতিরিক্ত জেলা প্রশাসক (সার্বিক) মো. সাইফুল ইসলামের বক্তব্য নিতে হবে।
নাসির উদ্দিন জেলা প্রশাসকের বক্তব্য নেওয়ার আগ্রহ প্রকাশ করে বলেন, বিষয়টি যেহেতু নারীসংক্রান্ত, তাই জেলা প্রশাসকের বক্তব্য থাকলে প্রতিবেদনটি আরও সমৃদ্ধ হবে। পরে অতিরিক্ত জেলা প্রশাসক সাইফুল ইসলাম জেলা প্রশাসকের কক্ষে গিয়ে ফিরে আসেন এবং দুঃখ প্রকাশ করেন বলে জানান নাসির উদ্দিন। শেষ পর্যন্ত তাকে এডিসির বক্তব্য নিয়েই প্রতিবেদন করতে হয়।
পুলিশ কর্মকর্তাদের বিরুদ্ধেও সাংবাদিকদের ফোন না ধরার অভিযোগ রয়েছে। গত ৩ সেপ্টেম্বর মাদকের বিষয়ে জানতে অতিরিক্ত পুলিশ সুপার (ক্রাইম অ্যান্ড অপস) পংকজ বড়ুয়াকে তাঁর সরকারি মোবাইল নম্বরে ও হোয়াটসঅ্যাপে ১৫ বারের বেশি ফোন করেন এক সাংবাদিক। তবে তিনি কোনো কল ধরেননি। হোয়াটসঅ্যাপে পরিচয় দিয়ে বার্তা পাঠানো হলেও তিনি কোনো জবাব দেননি বলে অভিযোগ করা হয়েছে।
গত ৪ সেপ্টেম্বর ঢাকা মেইল ও নয়া শতাব্দীর কুমিল্লা প্রতিনিধি সাকলাইন যোবায়ের গত তিন মাসে জেলা গোয়েন্দা (ডিবি) পুলিশের মাদকবিরোধী অভিযানের তথ্য জানতে ডিবির ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) শামসুল আলম শাহর সঙ্গে যোগাযোগ করেন। ওসি তাকে ডিবির ক্রাইম বিভাগের সঙ্গে যোগাযোগ করতে বলেন।
সাকলাইন যোবায়ের বলেন, তিনি বিষয়টি সংবাদে উল্লেখ করার কথা জানালে ওসি তাকে বলেন, ‘আপনি এটি উল্লেখ করবেন কেন?’ এরপর ফোনের সংযোগ বিচ্ছিন্ন করে দেন।
গত ৪ সেপ্টেম্বর কুমিল্লার মুরাদনগরে ইলিশ মাছবাহী একটি পিকআপে ডাকাতির ঘটনা ঘটে। এ সময় চালক ও মাছ ব্যবসায়ীকে মারধর করে হাত-পা ও মুখ বেঁধে সড়কের পাশে ফেলে রেখে পিকআপসহ প্রায় ৯ লাখ ৫০ হাজার টাকা মূল্যের ইলিশ ও নগদ টাকা লুট করে নিয়ে যায় ডাকাতেরা।
এ ঘটনায় তথ্য জানতে অতিরিক্ত পুলিশ সুপারকে (সদর সার্কেল) ১১ বার ফোন করেন সময় টিভি ও কালবেলার প্রতিনিধি জহিরুল হক বাবু। তিনি ফোন না ধরায় ক্ষোভ প্রকাশ করে জহিরুল হক বাবু বলেন, ‘আর কতবার কল দিলে তিনি কল রিসিভ করতেন, আমার জানা নেই।’
কুমিল্লা প্রেসক্লাবের সাধারণ সম্পাদক ও দৈনিক আজকের কুমিল্লার সম্পাদক ইমতিয়াজ আহমেদ জিতু বলেন, ‘সম্প্রতি যোগদান করা জেলা প্রশাসক সংবাদসংক্রান্ত বিষয়ে বক্তব্য দিতে চান না—এমন কথা বেশ কয়েকজন বলেছেন। বিষয়টি যদি সত্যি হয়ে থাকে, তাহলে কুমিল্লায় কর্মরত সাংবাদিকদের সঙ্গে জেলা প্রশাসনের দূরত্ব বাড়বে। যা খুবই দুঃখজনক। আমি আশা করব, জেলা প্রশাসক ও পুলিশ প্রশাসনের কর্তাব্যক্তিরা কুমিল্লায় কর্মরত সাংবাদিকদের সঙ্গে বিভিন্ন বিষয়ে কথা বলবেন, বক্তব্য দেবেন। দায়িত্বশীল পদে থেকে তারা সাংবাদিকদের এড়িয়ে চলতে পারেন না।’
কুমিল্লা প্রেসক্লাবের সভাপতি ও ৭১ টেলিভিশনের নিজস্ব প্রতিবেদক কাজী এনামুল হক ফারুক বলেন, ‘উনি রাষ্ট্রের প্রতিনিধিত্ব করেন। আমাদের জানার বিষয়টা ওনার কাছ থেকেই। গণমাধ্যমকর্মীরা তাদের কাছে বক্তব্য চাইবেন। তারা যদি না দেন, তাহলে গণমাধ্যম যাবে কার কাছে? আমি আশা করব, জেলা প্রশাসক ও পুলিশ প্রশাসনের দায়িত্বশীল ব্যক্তিরা গণমাধ্যমের সঙ্গে তাদের দূরত্ব যেন না বাড়ান।’
প্রতিনিধি/এসএস