জেলা প্রতিনিধি
০৫ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ১২:৫৫ পিএম
একসময় দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের রান্নাঘরেই সীমাবদ্ধ ছিল চুইঝালের ব্যবহার। এখন সেই চুইঝাল ধীরে ধীরে হয়ে উঠছে বাগেরহাটের সম্ভাবনাময় অর্থকরী ফসল। জেলায় বাড়ছে এর আবাদ ও উৎপাদন, সেই সঙ্গে সম্প্রসারিত হচ্ছে বাজার। স্থানীয় চাহিদার পাশাপাশি দেশের বিভিন্ন অঞ্চলেও জনপ্রিয়তা বাড়ায় চুইঝাল চাষে আগ্রহী হচ্ছেন কৃষকেরা।
উচ্চ বাজারমূল্য ও বছরজুড়ে চাহিদা থাকায় সম্ভাবনাময় এ মসলা ভবিষ্যতে বাগেরহাটের কৃষি অর্থনীতিতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা।
বাগেরহাটের বিভিন্ন হাট-বাজারে সারা বছরই চুইঝাল বিক্রি হয়। স্বাভাবিক সময়ে প্রতি কেজি ৪০০ থেকে ৮০০ টাকা দরে বিক্রি হলেও আকার ও মানভেদে বর্তমানে দাম উঠেছে ৮০০ থেকে ১ হাজার টাকা পর্যন্ত। বিশেষ মৌসুমে চাহিদা বাড়লে দাম আরও বাড়ে। তবে দাম তুলনামূলক বেশি হলেও চুইঝালের ক্রেতার কমতি নেই।
স্থানীয় ব্যবসায়ীরা বলছেন, চুইঝালের চাহিদা এখন আর শুধু বাগেরহাট বা দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের মধ্যে সীমাবদ্ধ নেই। দেশের বিভিন্ন এলাকায় এর ব্যবহার বাড়ছে। বিশেষ করে গরু, হাঁসসহ বিভিন্ন ধরনের মাংস রান্নায় চুইঝালের ব্যবহার জনপ্রিয় হওয়ায় এর বাজারও সম্প্রসারিত হচ্ছে।

মোরেলগঞ্জ শহরের কাঁচাবাজারের চুইঝাল বিক্রেতা মহাসিন তালুকদার বলেন, সারা বছরই চুইঝালের ভালো বিক্রি হয়। তবে বিভিন্ন উৎসব ও বিশেষ মৌসুমে চাহিদা বেড়ে যায়। আগে চিকন চুইঝাল প্রতি কেজি ৪০০ থেকে ৬০০ টাকা এবং তুলনামূলক মোটা চুইঝাল ৮০০ টাকা দরে বিক্রি করতেন। এখন পাইকারি দাম বেড়ে যাওয়ায় আকারভেদে ৮০০ থেকে ১ হাজার টাকা পর্যন্ত বিক্রি করছেন।
ফতিরহাটের ব্যবসায়ী মামুন হোসেন বলেন, স্বাভাবিক সময়ে প্রতিদিন ৫ থেকে ১০ কেজি চুইঝাল বিক্রি হয়। বিশেষ মৌসুমে তা বেড়ে ২০ থেকে ৩০ কেজি পর্যন্ত হয়। স্থানীয় চাষি ও গৃহস্থদের কাছ থেকে চুইঝাল সংগ্রহ করে বাজারজাত করেন তারা।
তার মতে, চাহিদা বাড়ার সময় অনেক ক্ষেত্রে অপরিপক্ব গাছও বাজারে চলে আসে। এতে সাময়িকভাবে সরবরাহ বাড়লেও পরবর্তী সময়ে পরিণত চুইঝালের সংকট তৈরি হয়। ফলে বাজারে দামও বেড়ে যায়।

বাড়ছে চুইঝালের আবাদ
কৃষি বিভাগের তথ্য অনুযায়ী, বাগেরহাটে প্রতিবছরই চুইঝালের আবাদ বাড়ছে। গত বছরের তুলনায় এবার ৭ হেক্টর বেশি জমিতে এর চাষ হয়েছে। বর্তমানে জেলায় প্রায় ৩২ হেক্টর জমিতে চুইঝালের আবাদ রয়েছে। এ বছর উৎপাদন হয়েছে প্রায় ৪০ টন, যার বাজারমূল্য দুই কোটি টাকার বেশি।
সদর উপজেলার যাত্রাপুর এলাকার চুইঝাল চাষি নজরুল ইসলাম বলেন, একটি চুইগাছ পরিণত হতে ছয় মাস থেকে প্রায় এক বছর সময় লাগে। পরিণত হলে গাছের কাণ্ড কেটে চুইঝাল সংগ্রহ করা হয়। ফলে হঠাৎ চাহিদা বেড়ে গেলেও দ্রুত উৎপাদন বাড়ানো সম্ভব হয় না।
তিনি বলেন, চুইঝালের দাম তুলনামূলক ভালো পাওয়ায় কৃষকদের মধ্যে এ ফসল চাষে আগ্রহ বাড়ছে। জমির পাশাপাশি অনেকেই বাড়ির আঙিনা ও অন্যান্য গাছের সঙ্গে চুইলতা চাষ করছেন।

ঐতিহ্য ছাড়িয়ে বাড়ছে বাজার
দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের বাগেরহাট, খুলনা, যশোর, নড়াইল ও সাতক্ষীরায় চুইঝালের ব্যবহার দীর্ঘদিনের। স্থানীয় খাবারের স্বাদ ও ঐতিহ্যের সঙ্গে মিশে আছে এই মসলা। বিশেষ করে মাংস রান্নায় এর ব্যবহার বেশি।
চুই লতাজাতীয় উদ্ভিদ। এর কাণ্ড ধূসর এবং পাতা পানপাতার মতো সবুজ। রান্নায় মূলত এর কাণ্ড ব্যবহার করা হয়। স্থানীয়ভাবে চুইঝাল মসলা হিসেবে ব্যবহারের পাশাপাশি ভেষজ গুণসম্পন্ন উদ্ভিদ হিসেবেও পরিচিত।
স্থানীয় ক্রেতা আজাহার শেখ বলেন, গরুর মাংস রান্নায় চুইঝাল তাদের পরিবারের নিয়মিত উপকরণ। প্রয়োজন অনুযায়ী বাজার থেকে চুইঝাল কেনেন তারা।
আরেক ক্রেতা সাগর আহমেদ বলেন, মাংসের পাশাপাশি বিভিন্ন মজাদার খাবারেও চুইঝাল ব্যবহার করেন। তার মতে, এ অঞ্চলের মানুষের খাবারের অভ্যাসের সঙ্গে চুইঝাল ওতপ্রোতভাবে জড়িয়ে আছে।

কৃষকের জন্য নতুন সম্ভাবনা
চুইঝালের অন্যতম বড় সম্ভাবনা এর বাজারমূল্য ও দীর্ঘস্থায়ী চাহিদা। অন্যান্য অনেক ফসলের তুলনায় প্রতি কেজিতে ভালো দাম পাওয়ায় কৃষকদের কাছে এটি আকর্ষণীয় হয়ে উঠছে। একই সঙ্গে দেশের বিভিন্ন এলাকায় জনপ্রিয়তা বাড়ায় ভবিষ্যতে এর বাজার আরও সম্প্রসারিত হওয়ার সুযোগ রয়েছে।
জেলা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদফতরের উপপরিচালক মো. মোতাহার হোসেন বলেন, চুইঝালের কদর দিন দিন বাড়ছে। গত বছরের তুলনায় এবার বাগেরহাটে চুইঝালের আবাদ ৭ হেক্টর বেড়েছে। বর্তমানে ৩২ হেক্টর জমিতে চাষ হচ্ছে এবং উৎপাদন হয়েছে প্রায় ৪০ টন। এর বাজারমূল্য দুই কোটি টাকার বেশি। ব্যক্তিগত ও বাণিজ্যিক—দুইভাবেই এ অঞ্চলে চুইঝালের চাষ বাড়ছে।
কৃষি সংশ্লিষ্টরা মনে করছেন, পরিকল্পিতভাবে চুইঝালের চাষ সম্প্রসারণ করা গেলে এটি বাগেরহাটের কৃষকদের জন্য গুরুত্বপূর্ণ অর্থকরী ফসল হয়ে উঠতে পারে। এ জন্য প্রয়োজন মানসম্মত চারা উৎপাদন, কৃষকদের প্রশিক্ষণ, আধুনিক চাষপদ্ধতির বিস্তার এবং উন্নত বাজারজাত ব্যবস্থা।

চাহিদা বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে অপরিপক্ব চুইগাছ কেটে ফেলার প্রবণতা নিয়ন্ত্রণ করাও জরুরি বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা। এতে চুইঝালের গুণগত মান বজায় রাখার পাশাপাশি দীর্ঘমেয়াদে উৎপাদনও টেকসই হবে।
বছরজুড়ে চাহিদা, তুলনামূলক উচ্চ বাজারমূল্য এবং দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে ক্রমবর্ধমান জনপ্রিয়তা—সব মিলিয়ে বাগেরহাটে চুইঝাল চাষের সামনে তৈরি হয়েছে নতুন সম্ভাবনা। সঠিক পরিকল্পনা ও কৃষকদের প্রয়োজনীয় সহায়তা নিশ্চিত করা গেলে স্থানীয় ঐতিহ্যের এই মসলা বাগেরহাটের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ অর্থকরী ফসল হয়ে উঠতে পারে।
প্রতিনিধি/এসএস