জেলা প্রতিনিধি
০৪ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ০৬:৩০ পিএম
বাগেরহাট পৌরবাসীর সুপেয় পানির সংকট নিরসনে প্রায় ৪০ কোটি টাকা ব্যয়ে নির্মিত সারফেস ওয়াটার ট্রিটমেন্ট প্লান্ট চার বছর ধরে অচল পড়ে আছে। ভৈরব নদ থেকে পানি এনে পচা দিঘিতে সংরক্ষণ এবং পরে ট্রিটমেন্ট প্লান্টে পরিশোধন করে পৌর এলাকার বিভিন্ন ওয়ার্ডে সরবরাহের পরিকল্পনা থাকলেও ২০২১ সালে নির্মাণকাজ শেষ হওয়ার পর কয়েক মাস পরীক্ষামূলক কার্যক্রম চালিয়েই বন্ধ হয়ে যায় প্রকল্পটি।
যদিও প্রকল্পের জলাধার হিসেবে ব্যবহারের কথা থাকা ঐতিহ্যবাহী পচা দিঘি দীর্ঘদিন ধরে ইজারা দিয়ে মাছ চাষ ও মাছ ধরার কাজে ব্যবহৃত হচ্ছে। সর্বশেষ বৃহস্পতিবার (৩ সেপ্টেম্বর) থেকে শুক্রবার (৪ সেপ্টেম্বর) সন্ধ্যা পর্যন্ত দুই দিনব্যাপী দিঘিটিতে চলে বড়শি দিয়ে মাছ ধরার উৎসব। আয়োজকরা বলছেন, এতে অংশ নেন বিভিন্ন জেলা থেকে আসা এক হাজারের বেশি শৌখিন মাছ শিকারি।
শুক্রবার সরেজমিনে দেখা যায়, দিঘিটির চারপাশে ১০৮টি ঘাটে মাছ ধরার ব্যবস্থা করা হয়েছে। প্রতিটি ঘাটের জন্য নেওয়া হয়েছে ২৫ হাজার টাকা করে। সে হিসাবে ঘাট থেকেই প্রায় ২৭ লাখ টাকা আয় হয়েছে।
চট্টগ্রাম, রাজশাহী, ফরিদপুর, বরিশালসহ বিভিন্ন জেলা থেকে আসা মাছ শিকারিরা সকাল থেকে সন্ধ্যা পর্যন্ত বড়শি দিয়ে মাছ ধরেন। আয়োজকদের দাবি, দুই দিনে শত মণের বেশি বিভিন্ন প্রজাতির মাছ ধরা হয়েছে।
তবে স্থানীয় বাসিন্দাদের অভিযোগ, মাছ ধরার সময় বিভিন্ন ধরনের রাসায়নিকযুক্ত টোপ ও খাদ্য ব্যবহার করায় দিঘির পানির গুণাগুণ নষ্ট হচ্ছে। মাছ শিকারের পর কয়েক দিন পর্যন্ত পানিতে দুর্গন্ধ থাকে। কখনো কখনো মাছ মারা যাওয়ার ঘটনাও ঘটে বলে দাবি তাঁদের। এতে দিঘির আশপাশে বসবাসকারী মানুষ রান্না, গোসলসহ দৈনন্দিন কাজে পানি ব্যবহারে সমস্যায় পড়ছেন।
সরেজমিনে দিঘির পানিতে পলিথিন, খাবারের প্যাকেট, সিগারেটের প্যাকেট, পানির বোতল ও একবার ব্যবহারযোগ্য প্লেটসহ বিভিন্ন বর্জ্য ভাসতে দেখা যায়।
স্থানীয় বাসিন্দা রমজান বলেন, ‘আমরা এই পানি রান্না, গোসলসহ বিভিন্ন কাজে ব্যবহার করি। দিঘির চারপাশে হাজার হাজার মানুষ বসবাস করে। বড়শি দিয়ে মাছ ধরার সময় বিভিন্ন ধরনের রাসায়নিক ব্যবহার করা হয়। মাছ মারা গেলে কখনো কখনো ওষুধও দেওয়া হয়। আবার মাছ ধরার জন্য রাসায়নিক মেশানো পচা চার ব্যবহার করা হয়। এতে পানি ব্যবহারের অনুপযোগী হয়ে পড়ে।’
তিনি বলেন, ‘আগে মানুষ এই পানি পান করত। এখন কোনোভাবেই তা খাওয়ার উপযোগী নেই। পৌরসভায় এমনিতেই পানির সংকট রয়েছে। দীর্ঘদিন ধরে বিষয়টি কর্তৃপক্ষকে জানালেও ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি। উল্টো দিঘিটি ইজারা দিয়ে মাছ ধরার মাধ্যমে রাজস্ব নেওয়া হচ্ছে।’
আরও পড়ুন: সুন্দরবনে টেলিটকের নেটওয়ার্ক বিপর্যয়, বিপাকে পর্যটক-জেলে-বনরক্ষীরা
আরেক বাসিন্দা শিমুল বলেন, ‘এখানে বড়শি দিয়ে মাছ ধরার কারণে পানির গুণাগুণ নষ্ট হয়ে যায় এবং দুর্গন্ধ সৃষ্টি হয়। আশপাশের বাড়িঘরের মানুষ এই পানি রান্নাসহ বিভিন্ন কাজে ব্যবহার করেন। একসময় আমরা এই পানি পানও করতাম। কিন্তু দীর্ঘদিন ধরে মাছ ধরার কারণে এখন আর পানি ব্যবহার করা যায় না।’
স্থানীয় বাসিন্দা ইমন শেখ বলেন, ‘পচা দিঘির পানি শোধন করে শহরে সরবরাহ করা গেলে মানুষের অনেক উপকার হবে। বাগেরহাট শহরে পানির সংকট রয়েছে। সরকার এ বিষয়ে দ্রুত উদ্যোগ নেবে— এটাই আমাদের প্রত্যাশা।’
স্থানীয় এক বাসিন্দা নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেন, শহরের মানুষের পানির সংকট দূর করার উদ্দেশ্যে পচা দিঘিটি অতীতেও একাধিকবার খনন করা হয়েছে। কিন্তু সেই দিঘির পানি এখন আর পৌরবাসীর কাজে লাগছে না। অনেক মানুষকে দূর-দূরান্ত থেকে পানি সংগ্রহ করতে হচ্ছে।
তিনি বলেন, ‘জনগণের স্বার্থে তৈরি দিঘি এখন কিছু মানুষের স্বার্থে ব্যবহৃত হচ্ছে। এখানে মাছ চাষ ও মাছ শিকার করে কয়েকজন লাভবান হচ্ছেন, অথচ শহরের হাজার হাজার মানুষ পানির সংকটে ভুগছেন। দিঘিটি মাছ শিকারের জন্য ইজারা না দিয়ে পানি সরবরাহের কাজে ব্যবহার করা হলে সাধারণ মানুষ উপকৃত হবেন।’
জনস্বাস্থ্য প্রকৌশল অধিদপ্তরের আওতায় ২০২০-২১ অর্থবছরে প্রায় ৪০ কোটি টাকা ব্যয়ে বাগেরহাট পৌরসভার পানি সরবরাহ প্রকল্পটি বাস্তবায়ন করা হয়। প্রকল্পের আওতায় ভৈরব নদ থেকে প্রায় চার কিলোমিটার পাইপলাইনের মাধ্যমে পানি এনে পচা দিঘিতে সংরক্ষণের ব্যবস্থা করা হয়। পরে ট্রিটমেন্ট প্লান্টে সেই পানি পরিশোধন করে ওভারহেড ট্যাংকের মাধ্যমে পৌর এলাকার বিভিন্ন ওয়ার্ডে সরবরাহের কথা ছিল।
২০২১ সালের জুনে প্রকল্পের নির্মাণকাজ শেষ হয়। এরপর কয়েক মাস পরীক্ষামূলকভাবে পানি সরবরাহ করা হলেও অল্প সময়ের মধ্যেই কার্যক্রম বন্ধ হয়ে যায়। পরবর্তী সময়ে প্রকল্পটি বাগেরহাট পৌরসভার কাছে হস্তান্তর করা হলেও আর সচল হয়নি।
আরও পড়ুন: তিন মাসের অবরোধের সুফল মিলছে সুন্দরবনে, ফিরেছে সজীবতা
সম্প্রতি প্রকল্প এলাকায় গিয়ে দেখা যায়, দীর্ঘদিন ব্যবহার না হওয়ায় ওভারহেড ট্যাংক, পাম্প হাউস, ওয়াটার ট্রিটমেন্ট প্লান্টসহ বিভিন্ন অবকাঠামো অযত্নে পড়ে আছে। বিভিন্ন যন্ত্রাংশে মরিচা ধরেছে। রিজার্ভারের ঢাকনা, মোটর, ফ্যানসহ কয়েকটি মূল্যবান সরঞ্জাম চুরি হয়ে গেছে বলেও জানা গেছে। দীর্ঘদিন রক্ষণাবেক্ষণের অভাবে সরকারি অর্থে নির্মিত গুরুত্বপূর্ণ এই অবকাঠামো ধীরে ধীরে অকার্যকর হয়ে পড়ছে।
পচা দিঘিটি পানি সরবরাহ প্রকল্পের প্রয়োজনীয় জলাধার হিসেবে ব্যবহারের পরিকল্পনা থাকলেও বর্তমানে এটি মাছ চাষ ও মাছ ধরার জন্য ইজারা দেওয়া হয়েছে। স্থানীয়দের অভিযোগ, দিঘিটি দীর্ঘমেয়াদি ইজারার আওতায় থাকায় পানি সরবরাহ প্রকল্পটি কার্যকর করতে জটিলতা তৈরি হয়েছে।
তবে দিঘিটির ইজারাগ্রহীতা ও মৎস্যজীবী লীগের নেতা মো. আলমগীর হোসেন অভিযোগ অস্বীকার করেন।
তিনি বলেন, ‘আমরা এখানে কোনো সার বা কীটনাশক ব্যবহার করি না। মাছের জন্য উপকারী খাবারই ব্যবহার করা হয়। প্রাকৃতিক উপাদান ব্যবহার করা হয়। এতে পানির কোনো ক্ষতি হয় না, বরং পানির উপকার হয়। আমি আট বছর ধরে সরকারের কাছ থেকে ইজারা নিয়ে এটি করছি।’
বাগেরহাটের জেলা প্রশাসক গোলাম মো. বাতেন বলেন, ‘এটি ছয় বছর মেয়াদি একটি প্রকল্প ছিল। বাগেরহাটের সুপেয় পানির অভাব দূর করতে এই পুকুরের পানিকে কীভাবে কাজে লাগানো যায়, সে পরিকল্পনা থেকেই পাম্প হাউসসহ উন্নয়ন প্রকল্পটি বাস্তবায়ন করা হয়েছিল।’
তিনি বলেন, ‘আমরা প্রকল্পটি আবার চালু করার চেষ্টা করছি। এখানকার পানি ট্রিটমেন্ট করে সরবরাহ করা যায় কি না, সে বিষয়ে মন্ত্রণালয়ের সঙ্গে কথা বলতে হবে। যেহেতু এটি দীর্ঘমেয়াদি ইজারার আওতায় আছে, তাই ইজারার মেয়াদ সংক্ষিপ্ত করে পুকুরটিকে বিশেষ করে খাবার পানি সরবরাহের কাজে ব্যবহার করা যায় কি না, সেটিও আমরা দেখব।’
প্রায় ৪০ কোটি টাকা ব্যয়ে নির্মিত পানি সরবরাহ প্রকল্প দীর্ঘদিন অচল পড়ে থাকা এবং একই সময়ে প্রকল্পের জলাধার হিসেবে ব্যবহারের কথা থাকা পচা দিঘিতে মাছ চাষ ও মাছ শিকারের অনুমতি দেওয়ায় প্রশ্ন উঠেছে সরকারি অর্থের ব্যবহার ও প্রকল্প ব্যবস্থাপনা নিয়ে।
পৌরবাসীর দাবি, দ্রুত প্রকল্পটি সচল করার পাশাপাশি পচা দিঘিকে পানি সরবরাহের মূল জলাধার হিসেবে সংরক্ষণ করা হোক। এতে একদিকে সরকারি অর্থে নির্মিত অবকাঠামো ও যন্ত্রপাতি রক্ষা পাবে, অন্যদিকে দীর্ঘদিনের সুপেয় পানির সংকট থেকেও বাগেরহাট পৌরবাসী মুক্তি পেতে পারেন।
প্রতিনিধি/এএম