Dhaka Mail Logo

সারাদেশ

বিচারের আশায় ভুক্তভোগী, অভিযোগের কথা ‘ভুলে গেছেন’ সিভিল সার্জন

জেলা প্রতিনিধি

০৩ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ১১:০২ এএম

অন্তঃসত্ত্বা স্ত্রীকে লাথি মারার ঘটনায় গর্ভপাত হলেও মামলার মেডিকেল রিপোর্টে তা উল্লেখ না করে শুধু ‘পায়ে ঘষা’ লাগার কথা উল্লেখ করার অভিযোগ উঠেছে। এ ঘটনায় নেত্রকোনার সিভিল সার্জনের কাছে লিখিত অভিযোগ দিয়েছেন ভুক্তভোগীর স্বামী। অভিযোগ দেওয়ার এক মাস পেরিয়ে গেলেও এর তদন্ত বা কোনো ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি। উল্টো অভিযোগের বিষয়টি ‘ভুলে যাওয়ার’ কথা জানিয়েছেন সিভিল সার্জন গোলাম মাওলা।

বুধবার (২ সেপ্টেম্বর) বিকেলে অভিযোগের বিষয়ে কী ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে, জানতে চাইলে সিভিল সার্জন গোলাম মাওলা বলেন, ‘ওইটা মোহনগঞ্জের বিষয়, সেখানেই অভিযোগ দিয়েছে, তারা দেখবে। আমি সবকিছু দেখার সময় পাই না।’

অভিযোগটি তার কাছেই দেওয়া এবং তিনি তা গ্রহণ করেছেন—এ কথা জানানো হলে তিনি বলেন, ‘ওহ, আমি রিসিভ করেছি? বিষয়টা ভুলে গেছি, অনেক ফাইলের নিচে পড়ে গেছে। আমাকে অভিযোগের কপিটা একটু পাঠান। দেখে আগামী সপ্তাহে তদন্ত করা হবে।’

এর আগে গত ২৯ জুলাই জেলা সিভিল সার্জনের কাছে লিখিত অভিযোগ দেন ভুক্তভোগী গৃহবধূর স্বামী সালমান শাহ। পরে ১ আগস্ট সিভিল সার্জন অভিযোগ পাওয়ার বিষয়টি নিশ্চিত করেছিলেন। এরপরও অভিযোগের তদন্ত না হওয়ায় ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন ভুক্তভোগী ও তাঁর স্বামী।

সালমান শাহ মোহনগঞ্জ উপজেলার সুয়াইর গ্রামের মো. হাসিম উদ্দিনের ছেলে।

অভিযোগে সালমান শাহ উল্লেখ করেন, গত ৩ জুন তুচ্ছ ঘটনাকে কেন্দ্র করে প্রতিবেশী ফেরদৌস মিয়া তার তিন মাসের অন্তঃসত্ত্বা স্ত্রী আশা আক্তারকে (২২) মারধর করেন। একপর্যায়ে তার তলপেটে লাথি মারা হলে রক্তক্ষরণ শুরু হয়। পরে তাকে মোহনগঞ্জ উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে নেওয়া হলে চিকিৎসকেরা হাসপাতালে ভর্তি ও আলট্রাসনোগ্রাম করার পরামর্শ দেন।

অভিযোগে আরও বলা হয়, ওই দিন একটি বেসরকারি ডায়াগনস্টিক সেন্টারে করা আলট্রাসনোগ্রামে তিন মাসের গর্ভধারণ এবং জীবিত ভ্রূণের অস্তিত্ব পাওয়া যায়। তবে পরদিন অন্য একটি ডায়াগনস্টিক সেন্টারের আলট্রাসনোগ্রাম প্রতিবেদনে ‘নরমাল স্টাডি’ উল্লেখ করা হয়। এতে গর্ভের সন্তান নষ্ট হয়ে যাওয়ার বিষয়টি নিশ্চিত হয় বলে অভিযোগে দাবি করা হয়েছে।

এ ঘটনায় ফেরদৌস মিয়ার বিরুদ্ধে মোহনগঞ্জ থানায় মামলা করা হলে তিনি আত্মগোপনে চলে যান। পরে ৫ জুন আশা আক্তারকে ময়মনসিংহ মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে স্থানান্তর করা হয়।

অভিযোগ অনুযায়ী, মামলার তদন্ত কর্মকর্তা উপপরিদর্শক (এসআই) জয় পাল মেডিকেল রিপোর্ট চেয়ে মোহনগঞ্জ উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে আবেদন করেন। ২৮ জুন রিপোর্ট দেওয়ার কথা থাকলেও তার এক দিন আগে, ২৭ জুন একটি রিপোর্ট আদালতে পাঠানো হয়। পরে তদন্ত কর্মকর্তাকেও ওই রিপোর্টের একটি কপি দেওয়া হয়।

সালমান শাহর দাবি, ওই রিপোর্টে আঘাতজনিত গর্ভপাত বা আলট্রাসনোগ্রামের কোনো তথ্য উল্লেখ করা হয়নি। বরং শুধু ‘পায়ে ঘষা’ লাগার কথা লেখা হয়। ওই রিপোর্ট আদালতে জমা দেওয়ার পর অভিযুক্ত ফেরদৌস মিয়া জামিন পান।

সালমান শাহ আরও অভিযোগ করেন, বিষয়টি উপজেলা স্বাস্থ্য ও পরিবার পরিকল্পনা কর্মকর্তাকে জানালে ২ জুলাই নতুন করে একটি মেডিকেল রিপোর্ট দেওয়া হয়। সে সময় হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ আগের রিপোর্টটিকে ভুয়া এবং তাতে থাকা চিকিৎসকদের স্বাক্ষর জাল বলে জানায়।

সালমান শাহ প্রশ্ন তোলেন, প্রথম রিপোর্টটি যদি ভুয়া হয়ে থাকে, তাহলে সেটি কীভাবে হাসপাতাল থেকে আদালত ও তদন্ত কর্মকর্তার কাছে পৌঁছাল। তিনি ঘটনার সুষ্ঠু তদন্ত করে জড়িত ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে আইনগত ব্যবস্থা নেওয়ার দাবি জানান।

আরও পড়ুন

পাকা বাড়ি-জমির মালিকের হাতেও ভিজিএফের কার্ড

অভিযোগে থাকা ওই মেডিকেল রিপোর্টে স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সের তৎকালীন আবাসিক চিকিৎসা কর্মকর্তা (আরএমও) ডা. অলক কান্তি তালুকদার, চিকিৎসক পার্থ সেন ও ডা. মোস্তাফিজুর রহমানের স্বাক্ষর রয়েছে। তবে ওই তিন চিকিৎসকই জানিয়েছেন, তারা ওই রিপোর্টে স্বাক্ষর করেননি। তাদের দাবি, রিপোর্টটি নকল এবং এতে তাদের স্বাক্ষর জাল করে বসানো হয়েছে। তারা ঘটনার তদন্তও দাবি করেছেন।

এদিকে গত ৯ আগস্ট এ ঘটনায় করা মামলায় আদালত ফেরদৌস মিয়ার বিরুদ্ধে গ্রেফতারি পরোয়ানা জারি করেন। এরপর থেকে তিনি পলাতক রয়েছেন।

ভুক্তভোগী আশা আক্তার বলেন, ‘স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে অসহায় মানুষ ভরসা নিয়ে যায়। অথচ সেখান থেকে জাল মেডিকেল রিপোর্ট দিয়ে আমার সঙ্গে প্রতারণা করা হয়েছে। ঊর্ধ্বতনের কাছে বিচার দিলাম। বিচারের আশায় বসে আছি, অথচ তিনি নাকি অভিযোগের বিষয় ভুলে গেছেন। আসলে গরিবের বিচার পাওয়ার জায়গা নাই। মার খেলাম, পেটের সন্তান নষ্ট হলো, এখন বিচারও পাচ্ছি না। এদিকে ফেরদৌস মিয়াকে গ্রেফতারও করতে পারছে না পুলিশ।’

মামলার তদন্ত কর্মকর্তা মোহনগঞ্জ থানার উপপরিদর্শক (এসআই) জয় পাল বলেন, ‘মোহনগঞ্জ উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্স ও ময়মনসিংহ মেডিকেল কলেজ (মমেক) হাসপাতাল—দুই জায়গা থেকেই মেডিকেল রিপোর্ট হাতে পেয়েছি। সম্প্রতি মমেকের রিপোর্টটি পেয়েছি। দ্রুত এই মামলার অভিযোগপত্র আদালতে জমা দেওয়া হবে।’

তিনি বলেন, মামলার প্রধান আসামি ফেরদৌস মিয়া পলাতক রয়েছেন। মোবাইল ফোন বন্ধ থাকায় তার অবস্থান শনাক্ত করা যাচ্ছে না। তাকে গ্রেফতারের চেষ্টা চলছে। মামলার অন্য আসামিরা জামিনে রয়েছেন।

প্রতিনিধি/এসএস