জেলা প্রতিনিধি
০৩ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ১০:১৮ এএম
চার কক্ষের পাকা বাড়ি, তিন বিঘা ফসলি জমি ও যাতায়াতের জন্য নিজস্ব মোটরসাইকেল—বাহ্যিকভাবে সচ্ছল এমন পরিবারের নামও রয়েছে সরকারি ভিজিএফ (ভালনারেবল গ্রুপ ফিডিং) চালের তালিকায়। নওগাঁর বদলগাছী উপজেলার বালুভরা ইউনিয়ন পরিষদে ভিজিএফের চাল বিতরণে এমন অনিয়মের অভিযোগ উঠেছে। স্থানীয়দের অভিযোগ, প্রকৃত দিনমজুর ও ভূমিহীনদের বাদ দিয়ে সচ্ছল ও রাজনৈতিকভাবে প্রভাবশালী ব্যক্তিদের নাম তালিকায় অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে।
উপজেলা প্রকল্প বাস্তবায়ন কার্যালয়ের তথ্য অনুযায়ী, দুই ঈদে বালুভরা ইউনিয়নের ১ হাজার ৬৮৭টি চরম দরিদ্র ও ভূমিহীন পরিবারের জন্য ১০ কেজি করে চাল বরাদ্দ দেওয়া হয়। তবে স্থানীয়দের অভিযোগ, ইউপি চেয়ারম্যান আল এমরান হোসেন নিয়মনীতি অনুসরণ না করে পছন্দের ব্যক্তিদের নাম দিয়ে তালিকা তৈরি করেছেন।
খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, ইউনিয়নের ৬ নম্বর ওয়ার্ডের চাঁদপুর গ্রামের লুৎফর রহমান পেশায় রাজমিস্ত্রি এবং স্থানীয় শ্রমিক দলের নেতা। তার তিন বিঘা জমি, পাকা বাড়ি ও নিজস্ব মোটরসাইকেল রয়েছে। এরপরও তার স্ত্রী মালা বেগম নিয়মিত ভিজিএফের চাল পাচ্ছেন।

মালা বেগম বিষয়টি স্বীকার করে বলেন, ‘গত দুই ঈদে ভোটার আইডি কার্ড দেখিয়ে চাল পেয়েছি। তবে তালিকায় নাম কীভাবে এসেছে, তা স্বামী ভালো বলতে পারবেন।’
একই ওয়ার্ডের দোনইল গ্রামের বাসিন্দা ফেরদৌস আলী আগে প্রবাসে ছিলেন। বর্তমানে তিনি ঢাকায় নিরাপত্তাকর্মীর চাকরি করেন। গ্রামে তার চার বিঘা জমি ও আধাপাকা বাড়ি রয়েছে। এরপরও তার নাম রয়েছে ভিজিএফের তালিকায়। তার স্ত্রী জানান, তাদের এক আত্মীয় (জামাই) ইউপি কার্যালয়ে যুক্ত থাকায় তিনি চাল তুলে আনেন।
সরকারের নীতিমালা অনুযায়ী, ভূমিহীন, অসচ্ছল ও দরিদ্র পরিবারগুলোই ভিজিএফের সহায়তা পাওয়ার যোগ্য। সচ্ছল ব্যক্তিদের নাম তালিকায় থাকায় স্থানীয়দের মধ্যে ক্ষোভের সৃষ্টি হয়েছে।
স্থানীয় বাসিন্দা আব্দুল লতিফ ও মামুন বলেন, ‘প্রভাবশালীদের সঙ্গে সখ্যতা থাকলেই সরকারি সহায়তার কার্ড মেলে। আর আমরা যারা দিন আনি দিন খাই, তাদের কপালে কিছুই জোটে না।’
স্থানীয়দের অভিযোগ, ইউনিয়নের ২ নম্বর ওয়ার্ডের বারাতৈল, ৪ নম্বর ওয়ার্ডের মির্জাপুর এবং ৭ নম্বর ওয়ার্ডের পশ্চিম বালুভরা গ্রামেরও কয়েকজন সচ্ছল ব্যক্তির নাম ভিজিএফের তালিকায় রয়েছে।

অনিয়মের বিষয়ে জানতে চাইলে ৬ নম্বর ওয়ার্ডের ইউপি সদস্য ইদ্রিস আলী দায় দেন চেয়ারম্যানের ওপর। তিনি বলেন, ‘আমি ৫০টি কার্ড পেয়েছিলাম, যা প্রকৃত দরিদ্রদের মধ্যে দিয়েছি। তবে লুৎফর রহমানের পরিবার বিএনপি করার সুবাদে দলীয় কোটায় ইউপি চেয়ারম্যানের মাধ্যমে কার্ডটি পেয়েছে।’
তবে ইউপি চেয়ারম্যান আল এমরান ভিজিএফের চালকে ‘ঈদ উপহার’ হিসেবে উল্লেখ করে বলেন, ‘আমরা ঈদ বোনাস হিসেবে সবাইকে চাল দিয়ে থাকি। এখানে ৪০ শতাংশ দলীয় এবং বাকি কার্ড চেয়ারম্যান-মেম্বারদের মধ্যে ভাগ করা হয়। ঈদ বোনাস হিসেবে কিছু সচ্ছল পরিবারের নাম থাকতেই পারে, যা অস্বীকার করার উপায় নেই।’
উপজেলার ভারপ্রাপ্ত প্রকল্প বাস্তবায়ন কর্মকর্তা (পিআইও) প্রকৌশলী মো. মাহবুবুর রহমান বলেন, ‘ভিজিএফের চাল বিতরণের সুনির্দিষ্ট নিয়ম রয়েছে। কেবল প্রকৃত অসহায় ব্যক্তিরাই এটি পাওয়ার অধিকার রাখেন। এখানে কোনো অনিয়ম ও স্বজনপ্রীতি হয়ে থাকলে তদন্ত সাপেক্ষে দ্রুত প্রয়োজনীয় আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হবে।’
প্রতিনিধি/এসএস