Dhaka Mail Logo

সারাদেশ

যাদের ঠিকানা ছিল বন, তারা এখন মানুষের দুয়ারে

জেলা প্রতিনিধি

০২ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ০৬:০০ পিএম

বন্যপ্রাণী। একসময় গভীর বনই ছিল তাদের ঠিকানা। গাছের ছায়া, ঝোপঝাড় আর নির্জন প্রকৃতির বুকেই কেটে যেত তাদের জীবন। কিন্তু সেই চেনা ঠিকানা দিন দিন সংকুচিত হয়ে আসছে। হারিয়ে যাচ্ছে আবাস, কমছে খাবারের উৎস, বাড়ছে নিরাপত্তার সংকট। তাই বাধ্য হয়ে বনের প্রাণীরা এখন পা বাড়াচ্ছে মানুষের বসতির দিকে। কখনো খাবারের খোঁজে, কখনো একটু নিরাপদ আশ্রয়ের আশায় তারা এসে দাঁড়াচ্ছে মানুষের দুয়ারে।

মৌলভীবাজারের শ্রীমঙ্গল উপজেলায় গত এক মাসে লোকালয় থেকে ২০টি বন্যপ্রাণী উদ্ধার করেছে বাংলাদেশ বন্যপ্রাণী সেবা ফাউন্ডেশন। চলতি বছরের ১ থেকে ৩১ আগস্ট পর্যন্ত উপজেলার বিভিন্ন এলাকা থেকে এসব প্রাণী উদ্ধার করা হয়। উদ্ধার হওয়া প্রাণীর মধ্যে রয়েছে অজগর, লজ্জাবতী বানর, উল্টোলেজি বানর, শঙ্খচিল, তক্ষক এবং বিভিন্ন প্রজাতির বিরল সাপ।

বাংলাদেশ বন্যপ্রাণী সেবা ফাউন্ডেশনের পরিচালক স্বপন দেব সজল জানান, আগস্ট মাসজুড়ে শ্রীমঙ্গলের বিভিন্ন এলাকা থেকে মোট ২০টি বন্যপ্রাণী উদ্ধার করা হয়েছে। এদের অনেকগুলো ছিল আহত, ক্লান্ত কিংবা অসুস্থ। উদ্ধার করার পর প্রয়োজন অনুযায়ী তাদের চিকিৎসা ও পরিচর্যা করা হয়। পরে সুস্থ করে বন বিভাগের সহায়তায় নিরাপদ প্রাকৃতিক পরিবেশে অবমুক্ত করা হয়।

ফাউন্ডেশন সূত্রে জানা যায়, গত ২ আগস্ট হাইল হাওর থেকে একটি অজগর উদ্ধার করা হয়। পরদিন ৩ আগস্ট আরামবাগ থেকে একটি বেত আঁচড়া এবং উত্তর ভাড়াউড়া থেকে আরেকটি অজগর উদ্ধার করা হয়। ৪ আগস্ট পূর্বাশা আবাসিক এলাকা থেকে উদ্ধার করা হয় আরও একটি বেত আঁচড়া।

Bon1

৬ আগস্ট হাইল হাওর থেকে একটি মৃত অজগর উদ্ধার করা হয়। এরপর ১২ আগস্ট শাহীবাগ থেকে একটি শঙ্খচিল উদ্ধার করা হয়। পরদিন ৫ নম্বর পুল এলাকা থেকে একটি অজগর এবং ১৪ আগস্ট হাইল হাওর থেকে আরও একটি অজগর উদ্ধার করা হয়।

এরপর ১৫ আগস্ট রূপশপুর থেকে একটি তক্ষক, নোয়াগাঁও থেকে একটি দাঁড়াশ সাপ, উত্তর ভাড়াউড়া থেকে একটি লজ্জাবতী বানর এবং বারিধারা আবাসিক এলাকা থেকে একটি বিরল প্রজাতির সাপ উদ্ধার করা হয়।

১৯ আগস্ট মাঝেরগাঁও থেকে একটি শঙ্খিনী সাপ উদ্ধার করা হয়। ২১ আগস্ট শ্যামলী আবাসিক এলাকা থেকে বিদ্যুৎস্পৃষ্ট অবস্থায় একটি উল্টোলেজি বানর উদ্ধার করা হয়। এরপর ২৫ আগস্ট পূর্বাশা আবাসিক এলাকা থেকে আরও একটি শঙ্খিনী সাপ উদ্ধার করা হয়।

২৬ আগস্ট ভাড়াউড়া বাগান রোড থেকে একটি অজগর এবং সিন্দুরখান ইউনিয়নের কুঞ্জবন এলাকা থেকে বিরল সাইবোল্ডস ওয়াটার স্নেক উদ্ধার করা হয়।

এরপর ২৮ আগস্ট ভাড়াউড়া ৫ নম্বর বস্তি কোয়ার্টার, ২৯ আগস্ট সাতগাঁও-খিলগাঁও এবং ৩০ আগস্ট ইছবপুর থেকে আরও তিনটি অজগর উদ্ধার করা হয়।

পরিবেশকর্মী রাজদীপ দেব দীপ বলেন, বন্যপ্রাণী দেখলেই আতঙ্কিত হয়ে অনেক সময় মানুষ সেটিকে হত্যা করেন। অথচ এসব প্রাণী প্রকৃতির গুরুত্বপূর্ণ অংশ। তাই লোকালয়ে চলে আসা প্রাণীকে হত্যা না করে নিরাপদে উদ্ধার করে উপযুক্ত প্রাকৃতিক পরিবেশে অবমুক্ত করার ব্যবস্থা করতে হবে।

ফাউন্ডেশনের পরিচালক স্বপন দেব সজল বলেন, তিনি নিজে ও পরিবেশকর্মী রাজদীপ দেব অনেক সময় মানুষের ঘরবাড়ি, দোকানপাট এবং হাইল হাওর থেকে এসব প্রাণী উদ্ধার করেন। অনেক ক্ষেত্রে প্রাণীগুলো আহত, ক্লান্ত কিংবা অসুস্থ থাকে। তাদের সযত্নে চিকিৎসা ও পরিচর্যা করে সুস্থ করে তোলার পর বন বিভাগের সহায়তায় আবার ফিরিয়ে দেওয়া হয়।

বিশেষজ্ঞদের মতে, একসময় শ্রীমঙ্গলের লাউয়াছড়া জাতীয় উদ্যানসহ আশপাশের বনাঞ্চল ছিল বন্যপ্রাণীর স্বর্গরাজ্য। কিন্তু সময়ের সঙ্গে সঙ্গে সেই বন সংকুচিত হয়েছে। মানুষের বসতি, রিসোর্ট, কৃষিজমি আর অবাধ প্রবেশে কমে গেছে বন্যপ্রাণীর স্বাভাবিক বিচরণক্ষেত্র ও খাদ্যের উৎস। ফলে বনের প্রাণীরা বাধ্য হয়ে লোকালয়ে চলে আসছে।

Bon3

তারা বলছেন, এভাবে বন ধ্বংস অব্যাহত থাকলে শুধু প্রাণীকুলই নয়, পুরো বাস্তুতন্ত্রই হুমকির মুখে পড়বে। খাদ্যশৃঙ্খল ভেঙে গেলে এর দীর্ঘমেয়াদি প্রভাব পড়বে কৃষি, পরিবেশ এবং মানুষের জীবনযাত্রায়।

বাংলাদেশ পরিবেশ আন্দোলনের (বাপা) জাতীয় পরিষদ সদস্য আ স ম সালেহ সোহেল ঢাকা মেইলকে বলেন, মানুষের দখল ও অযত্নে প্রাকৃতিক আবাসস্থল ধ্বংস হয়ে যাওয়ার কারণে বন্যপ্রাণীরা বাধ্য হয়ে লোকালয়ে চলে আসছে। প্রকৃতির ভারসাম্য রক্ষায় প্রতিটি প্রাণীরই নিজস্ব ভূমিকা রয়েছে। কিন্তু আমরা যদি বন ও পরিবেশ রক্ষা না করি, একদিন এই প্রাণীরাও হারিয়ে যাবে আমাদের পৃথিবী থেকে।

তিনি বলেন, এই উদ্ধার কার্যক্রম শুধু প্রাণ বাঁচানো নয়, মানুষের মধ্যে সচেতনতার আলো ছড়িয়ে দেওয়ারও একটি গুরুত্বপূর্ণ উদ্যোগ।

বন্যপ্রাণী ও প্রকৃতি সংরক্ষণ বিভাগের রেঞ্জ কর্মকর্তা কাজী নাজমুল হক ঢাকা মেইলকে বলেন, উদ্ধার করা বন্যপ্রাণীর স্বাস্থ্য পরীক্ষা করে পরিস্থিতি অনুযায়ী নিরাপদ প্রাকৃতিক পরিবেশে অবমুক্ত করার ব্যবস্থা নেওয়া হয়।

প্রতিনিধি/জেবি