জেলা প্রতিনিধি
০১ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ০৭:৩৫ পিএম
সাগরের নীল জলরাশি, প্রবালের ছোঁয়া, সাদা বালুর সৈকত আর সারি সারি নারকেলগাছ—সবই আছে। নেই শুধু সেই চেনা কোলাহল। জেটিঘাটে পর্যটকের ভিড় নেই, সৈকতে নেই ছবি তোলার হিড়িক, রেস্তোরাঁয় নেই খাবারের অর্ডার। অধিকাংশ হোটেল-রিসোর্ট ও দোকানপাটে ঝুলছে তালা। পর্যটকশূন্য সেন্টমার্টিনে এখন সবচেয়ে বেশি শোনা যায় সাগরের ঢেউয়ের শব্দ।
তবে থেমে নেই জীবন। পর্যটনের ওপর নির্ভরশীল মানুষগুলো বাঁচার জন্য খুঁজছেন বিকল্প পথ। কেউ মাছ ধরছেন, কেউ জাল বুনছেন, কেউ অলস সময় কাটাচ্ছেন। আবার কেউ পর্যটকদের জন্য তৈরি করা রেস্তোরাঁয় বসিয়েছেন ক্যারাম বোর্ড। সংসার চালাতে কেউ কেউ ছেড়ে যাচ্ছেন দ্বীপ।
কক্সবাজারের টেকনাফ থেকে প্রায় ৯ কিলোমিটার দক্ষিণে বঙ্গোপসাগরের বুকে দেশের একমাত্র প্রবাল দ্বীপ সেন্টমার্টিন। প্রায় ১২ হাজার মানুষের বসবাস এই দ্বীপে। বেসরকারি সংস্থার হিসাবে, তাঁদের মধ্যে প্রায় ৫ হাজার মানুষ সরাসরি বা পরোক্ষভাবে পর্যটনশিল্পের সঙ্গে যুক্ত। পরিবেশ ও জীববৈচিত্র্য রক্ষায় সরকারের বিধিনিষেধের কারণে ২০২৬ সালের ১ ফেব্রুয়ারি থেকে দ্বীপে পর্যটকের যাতায়াত বন্ধ রয়েছে। বছরের বড় একটি সময় পর্যটন বন্ধ থাকায় দীর্ঘমেয়াদি আয়-রোজগারের সংকটে পড়েছেন দ্বীপের বাসিন্দারা।
২০ লাখ টাকার রেস্তোরাঁ এখন ১০ টাকার ক্যারামের ওপর নির্ভরশীল
সেন্টমার্টিন জেটিঘাট থেকে বাজারপাড়ায় ঢুকতেই ডান পাশে চোখে পড়ে দারুচিনি রেস্টুরেন্ট। একসময় পর্যটকদের পদচারণায় সরগরম থাকা রেস্তোরাঁটি এখন প্রায় খালি। খাবারের টেবিলের জায়গা নিয়েছে ক্যারাম বোর্ড।
প্রতি গেম ১০ টাকা দিয়ে স্থানীয় তরুণেরা সেখানে ক্যারাম খেলছেন। আর সেই খেলাই এখন রেস্তোরাঁর মালিক সৈয়দ আমিনের আয়ের অন্যতম উৎস। তিনি জানান, প্রতিদিন গড়ে ৪০০ থেকে ৫০০ টাকা আয় হয়। অথচ এই রেস্তোরাঁর পেছনে ব্যয় হয়েছে প্রায় ২০ লাখ টাকা।
সৈয়দ আমিন বলেন, একসময় তাঁর রেস্তোরাঁয় ২০ জনের বেশি কর্মচারী কাজ করতেন। পর্যটক কমে যাওয়ায় একে একে সবাইকে বিদায় দিতে হয়েছে। এখন রেস্তোরাঁ চালানোর মতো ব্যবসা নেই। তাই খালি জায়গায় ক্যারাম খেলার ব্যবস্থা করেছেন।
ক্যারাম খেলতে আসা স্থানীয় যুবক মনিরুল ইসলাম বলেন, সেন্টমার্টিনের মানুষ এখন খুব কষ্টে জীবন কাটাচ্ছেন। পর্যটক না থাকায় রিকশা, হোটেল, রেস্তোরাঁ—সবখানেই আয় কমে গেছে।
দারিদ্র্য বাড়ছে, বদলে যাচ্ছে পেশা
পর্যটন বন্ধের প্রভাব শুধু হোটেল-রেস্তোরাঁয় সীমাবদ্ধ নেই। পর্যটক পরিবহন, দোকানপাট, খাবারের ব্যবসা, গাইডিং, নৌযানসহ বিভিন্ন পেশায় এর প্রভাব পড়েছে।
স্থানীয় মুজিবুর রহমান বলেন, দ্বীপে এখন নীরব দুর্ভিক্ষ চলছে। অনেকে আগে ব্যবসা করতেন। এখন বড়শি নিয়ে সাগরে যান। কিন্তু মাছ ধরেও নিশ্চয়তা নেই। চরম দারিদ্র্য ঘিরে ধরেছে সেন্টমার্টিনবাসীকে। তাঁর দুই বন্ধু সংসার চালাতে না পেরে দ্বীপ ছেড়ে কক্সবাজার শহরে চলে গেছেন।
মুজিবুর রহমান বলেন, আন্তর্জাতিকভাবে পরিচিত এই দ্বীপের বাসিন্দা হয়েও তাঁদের চরম দারিদ্র্য ও অসহায় অবস্থায় বসবাস করতে হচ্ছে।
শাহিনা রেস্তোরাঁ, আল্লাহর দান রেস্টুরেন্ট, ইউরো বাংলা, এশিয়া বাংলা রেস্টুরেন্টসহ বাজারের অনেক ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানও বন্ধ। কোথাও তালা ঝুলছে, কোথাও কর্মচারী নেই। রাস্তার পাশে অলস সময় কাটাচ্ছেন কর্মহীন মানুষ।
সরেজমিনে স্থানীয়দের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, দ্বীপের প্রায় ৩০০ হোটেল, রিসোর্ট, কটেজ ও রেস্তোরাঁ বছরের বড় একটি সময় বন্ধ থাকে। পর্যটন খাতের সঙ্গে যুক্ত প্রায় পাঁচ হাজার মানুষ এতে সরাসরি বা পরোক্ষভাবে আয় হারাচ্ছেন।
পরিবেশ বাঁচছে, সংকটে মানুষ
পর্যটকের চাপ কমে যাওয়ার একটি ইতিবাচক দিকও চোখে পড়ছে। সৈকত ও দ্বীপের বিভিন্ন অংশে প্রকৃতি অনেকটা স্বাভাবিক হয়ে উঠেছে। স্থানীয়রা জানান, পর্যটকের চাপ কমায় কেয়াবন, সৈকত ও সামুদ্রিক জীববৈচিত্র্যের ওপরও চাপ কমেছে।
সাম্প্রতিক সরেজমিন পর্যবেক্ষণে সৈকতে গাঙচিল, লাল কাঁকড়া, শামুক-ঝিনুকের বিচরণ এবং কাছিমের ডিম সংরক্ষণের কার্যক্রমও দেখা গেছে।
পর্যটনসেবী আইনজীবী কেফায়েত উল্লাহ খান বলেন, পরিবেশ রক্ষার নীতির সুফল প্রকৃতিতে মিলছে। কিন্তু সেই নীতির সঙ্গে মানুষের জীবিকার বিকল্প ব্যবস্থা তৈরি না হওয়ায় দ্বীপবাসীর মধ্যে হতাশা, সংকট ও চরম দারিদ্র্য তৈরি হয়েছে। অনিশ্চিত হয়ে পড়েছে দ্বীপের মানুষের আয়। অনেক পরিবারের বয়স্ক ব্যক্তিরা টাকার অভাবে চিকিৎসা করাতে পারছেন না।
বর্তমান নীতিতে পর্যটকের সংখ্যা নিয়ন্ত্রণ করা হয়েছে। সর্বশেষ পর্যটন মৌসুমে দিনে সর্বোচ্চ দুই হাজার পর্যটক যাওয়ার সুযোগ ছিল। নভেম্বর মাসে রাতযাপন নিষিদ্ধ এবং ডিসেম্বর ও জানুয়ারিতে সীমিত আকারে রাতযাপনের অনুমতি দেওয়া হয়েছিল। ২০২৫-২৬ মৌসুমে দুই মাসে প্রায় ১ লাখ ১৭ হাজার পর্যটক সেন্টমার্টিন ভ্রমণ করেছিলেন। তবে সীমিত সময় ও পর্যটকের সংখ্যার কারণে স্থানীয় পর্যটন ব্যবসায়ীরা আগের তুলনায় বড় ধরনের চাপের মুখে পড়েছেন।
খাদ্য সরবরাহ নিয়েও দুশ্চিন্তা
সেন্টমার্টিনবাসীর আরেকটি বড় সমস্যা নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের সরবরাহ। দ্বীপের অধিকাংশ খাদ্যপণ্য ও প্রয়োজনীয় সামগ্রী টেকনাফ হয়ে নৌপথে আসে। কিন্তু বৈরী আবহাওয়ায় সাগর উত্তাল হলে ট্রলার চলাচল বন্ধ হয়ে যায়। তখন দ্বীপে পণ্য সরবরাহও ব্যাহত হয়।
টেকনাফ-সেন্টমার্টিন ট্রলার মালিক সমিতির সভাপতি আব্দুর রশিদ বলেন, সাগরে বৈরী আবহাওয়া বা সতর্কসংকেত জারি হলে যাত্রীবাহী ট্রলার চলাচল বন্ধ রাখতে হয়। এতে দ্বীপবাসীর টেকনাফের সঙ্গে যোগাযোগ বন্ধ হওয়ার পাশাপাশি খাদ্যপণ্য সরবরাহেও সমস্যা তৈরি হয়।
দ্বীপবাসীর দাবি, জরুরি পরিস্থিতির জন্য সরকারি উদ্যোগে একটি খাদ্যগুদাম স্থাপন করা হলে নৌযোগাযোগ বন্ধের সময় খাদ্যসংকট অনেকটাই সামাল দেওয়া সম্ভব হবে।
চিকিৎসাসেবাও অপ্রতুল
স্বাস্থ্যসেবাও দ্বীপবাসীর দীর্ঘদিনের উদ্বেগের কারণ। নিয়মিত চিকিৎসক না থাকায় সাধারণ রোগের চিকিৎসার জন্যও অনেক সময় টেকনাফে যেতে হয়। কিন্তু বৈরী আবহাওয়ায় নৌযান বন্ধ থাকলে সেই সুযোগও থাকে না।

স্থানীয় বাসিন্দা তৈয়ব উল্লাহ বলেন, সেন্টমার্টিন হাসপাতালে দীর্ঘদিন ধরে জলাতঙ্কের প্রতিষেধক টিকা না থাকার বিষয়টি উদ্বেগের। দ্বীপে বিপুলসংখ্যক কুকুর থাকায় কুকুরের কামড়ের ঘটনায় দ্রুত টিকা পাওয়া জরুরি।
টেকনাফ উপজেলা স্বাস্থ্য ও পরিবার পরিকল্পনা কর্মকর্তা রেজাউল হোসাইন বলেন, তিনি বর্তমানে অসুস্থতার কারণে ছুটিতে আছেন। তবে তাঁর জানা মতে, সেন্টমার্টিনে বর্তমানে কোনো চিকিৎসক কর্মরত নেই। সেখানে চিকিৎসক দেওয়ার বিষয়ে কাজ চলছে।
রেবিস টিকার বিষয়ে তিনি বলেন, বিষয়টি প্রাণিসম্পদ বিভাগের আওতাধীন। সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নিচ্ছেন।
বিদ্যুৎ নিয়েও অনিশ্চয়তা
দ্বীপবাসীর আরেক দুর্ভোগ বিদ্যুৎ। সৌরবিদ্যুৎনির্ভরতার কারণে বর্ষাকালে পর্যাপ্ত সূর্যালোক না থাকলে উৎপাদন কমে যায়। পাশাপাশি নিয়মিত বিদ্যুৎ সরবরাহে সমস্যা থাকায় অনেক সময় ঘণ্টার পর ঘণ্টা বিদ্যুৎহীন থাকতে হয়। এতে ঘরবাড়ির পাশাপাশি ছোট ব্যবসা ও দোকানপাটও ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে।
তৈয়ব উল্লাহ বলেন, রেবিস টিকা, বিদ্যুৎ ও খাদ্য—তিনটি বিষয়ই দ্বীপবাসীর জন্য জরুরি। বিকল্প বিদ্যুতের ব্যবস্থা এবং একটি সরকারি খাদ্যগুদাম থাকলে দুর্যোগের সময় মানুষের ভোগান্তি অনেক কমবে।
সাগরেও নিরাপত্তার শঙ্কা
সেন্টমার্টিনের অনেক পরিবার মাছ ধরার সঙ্গে যুক্ত। কিন্তু নাফ নদী ও সাগরকেন্দ্রিক নিরাপত্তা পরিস্থিতি নিয়েও জেলেদের মধ্যে উদ্বেগ রয়েছে। স্থানীয়দের অভিযোগ, মিয়ানমারের রাখাইন অঞ্চলে আরাকান আর্মির তৎপরতার কারণে সাগরে মাছ ধরতে যাওয়ার ক্ষেত্রে অনেকেই নিরাপত্তাহীনতায় ভোগেন।
স্থানীয় বাসিন্দা মহিউদ্দিন বলেন, অধিকাংশ মানুষ পর্যটননির্ভর। পর্যটক না থাকায় আয় কমেছে। চিকিৎসাসেবা অপ্রতুল, নৌযান বন্ধ থাকলে টেকনাফে যাওয়া যায় না। আবার সাগরে নিরাপত্তার বিষয়টিও আছে। সব মিলিয়ে মানুষ নানামুখী সংকটে আছেন।
দুর্যোগে আশ্রয় কোথায়?
সেন্টমার্টিনের ভৌগোলিক অবস্থানই দ্বীপবাসীর জন্য বড় ঝুঁকি। ঘূর্ণিঝড়, জলোচ্ছ্বাস কিংবা দীর্ঘস্থায়ী বৈরী আবহাওয়ায় দ্বীপের সঙ্গে মূল ভূখণ্ডের যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন হয়ে যেতে পারে।
স্থানীয়দের আশঙ্কা, বড় ধরনের ঘূর্ণিঝড় বা জলোচ্ছ্বাস হলে দ্বীপের বিস্তীর্ণ এলাকা প্লাবিত হতে পারে। এ কারণে পর্যাপ্ত আশ্রয়কেন্দ্র, উপকূলীয় সুরক্ষা এবং দুর্যোগের আগে খাদ্য ও ওষুধ মজুত রাখার দাবি দীর্ঘদিনের।
সেন্টমার্টিন ইউনিয়ন পরিষদের ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান ফয়েজুল ইসলাম বলেন, দ্বীপবাসী দীর্ঘদিন ধরে নানামুখী সংকটে রয়েছেন। সমস্যাগুলো সরকারের নজরে এনে দ্রুত কার্যকর উদ্যোগ নেওয়া প্রয়োজন। এসব সমস্যার সমাধান হলে মানুষের জীবনযাত্রা অনেকটাই স্বাভাবিক হবে। পর্যটন নিয়ন্ত্রণের পাশাপাশি বিকল্প জীবিকা চান দ্বীপবাসী।
সেন্টমার্টিনের পরিবেশ রক্ষায় পর্যটন নিয়ন্ত্রণের প্রয়োজনীয়তা নিয়ে দ্বীপবাসীর বড় অংশের আপত্তি নেই। আপত্তি মূলত বিকল্প জীবিকার ব্যবস্থা না থাকা নিয়ে।
দ্বীপবাসীর দাবি, পর্যটন পুরোপুরি বন্ধ বা সীমিত করার পাশাপাশি তাঁদের জন্য বিকল্প কর্মসংস্থান তৈরি করতে হবে। মাছ সংরক্ষণ ও বিপণনের ব্যবস্থা, ক্ষুদ্র ব্যবসায় সহায়তা, দক্ষতা উন্নয়ন প্রশিক্ষণ, নিরাপদ নৌযোগাযোগ, খাদ্য মজুত, নিয়মিত চিকিৎসক ও ওষুধ সরবরাহ এবং নিরবচ্ছিন্ন বিদ্যুতের ব্যবস্থা করা জরুরি।
কক্সবাজারের জেলা প্রশাসক এমএ মান্নান জানান, সেন্টমার্টিনে প্রতি মাসে প্রয়োজনীয় খাদ্যসামগ্রী পাঠানো হয়। পাশাপাশি জরুরি পরিস্থিতিতে ব্যবহারের জন্য আলাদা খাদ্য মজুত রাখতে একটি খাদ্যগুদাম নির্মাণের পরিকল্পনা রয়েছে।
প্রকৃতি রক্ষায় পর্যটন নিয়ন্ত্রণের সুফল যেমন সেন্টমার্টিনের পরিবেশে পড়ছে, তেমনি এর আর্থিক চাপও পড়ছে দ্বীপবাসীর জীবনে। তাই পরিবেশ সংরক্ষণ ও মানুষের জীবিকা—দুইয়ের মধ্যে সমন্বয় করেই টেকসই পরিকল্পনা নেওয়ার দাবি স্থানীয়দের।
উল্লেখ্য, ২০২৬ সালের ১ ফেব্রুয়ারি থেকে সেন্টমার্টিনে পর্যটকের যাতায়াত বন্ধ রয়েছে।
এআর