জেলা প্রতিনিধি
০১ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ০৮:০১ এএম
হবিগঞ্জের বাহুবল উপজেলার মিরপুর ইউনিয়নের পশ্চিম জয়পুর গ্রামের কৃষক মো. মতিন মিয়া উন্নত জাতের জি-নাইন (জি-৯) কলা চাষ করে সাফল্য পেয়েছেন। কৃষি বিভাগের কারিগরি সহায়তায় তার ৩০ শতক জমির প্রদর্শনী প্লটে এ জাতের কলার চাষ স্থানীয় কৃষকদের মধ্যে আগ্রহ তৈরি করেছে।
সরেজমিনে দেখা যায়, বাড়ির সামনের প্রায় ৩০ শতক জমিতে সারিবদ্ধভাবে লাগানো হয়েছে জি-নাইন জাতের কলাগাছ। অধিকাংশ গাছেই বড় বড় কলার ছড়া ঝুলছে। কোনো কোনো গাছে নতুন করে মোচাও বের হয়েছে। খেত দেখতে আশপাশের গ্রামের কৃষকেরা আসছেন। তারা এ জাতের কলার ফলন, পরিচর্যা ও বাজারজাতকরণ সম্পর্কে খোঁজখবর নিচ্ছেন।
কৃষি বিভাগ সূত্রে জানা যায়, ফ্রিপ প্রকল্পের আওতায় গত বছরের নভেম্বর মাসে ৩০ শতক জমিতে ৮০টি জি-নাইন কলার চারা রোপণ করেন মতিন মিয়া। জমির সর্বোচ্চ ব্যবহার নিশ্চিত করতে কলার সঙ্গে সাথি ফসল হিসেবে মাসকালাই চাষ করেন তিনি। মাসকালাই সংগ্রহের পর একই জমিতে লেবুর চারা রোপণ করেন।
কৃষক মতিন মিয়া বলেন, কৃষি অফিসের সহযোগিতায় তিনি জি-নাইন কলার চাষ শুরু করেন এবং চারা কৃষি অফিস থেকেই পেয়েছেন। পরিচর্যা, সারসহ অন্যান্য কাজে তার প্রায় ৭ হাজার টাকা খরচ হয়েছে। এখন গাছে গাছে কলার ছড়া এসেছে এবং কিছু কলা বিক্রিও শুরু করেছেন। অনেকেই চারা কিনতে তার সঙ্গে যোগাযোগ করছেন। এ মৌসুমে কলা ও চারা বিক্রি করে লক্ষাধিক টাকা আয় হবে বলে আশা করছেন তিনি।

মতিন মিয়া বলেন, নতুন জাত হওয়ায় শুরুতে কিছুটা শঙ্কা ছিল। তবে কৃষি বিভাগের নিয়মিত পরামর্শ ও তদারকিতে কোনো সমস্যায় পড়তে হয়নি। উপসহকারী কৃষি কর্মকর্তা মো. শামিমুল হক শামীম নিয়মিত খোঁজখবর নিয়েছেন এবং প্রয়োজনীয় পরামর্শ দিয়েছেন।
উপসহকারী কৃষি কর্মকর্তা মো. শামিমুল হক শামীম বলেন, জি-নাইন জাতের কলা দেশে তুলনামূলক নতুন হলেও বিশ্বের বিভিন্ন দেশে এটি জনপ্রিয়। বাহুবলের মিরপুর ইউনিয়নে প্রথমবারের মতো এ জাতের কলার প্রদর্শনী প্লট স্থাপন করা হয়েছে। কৃষকের জন্য টিস্যু কালচারের চারা সংগ্রহ করে দেওয়া হয়েছে এবং শুরু থেকেই কারিগরি পরামর্শ দেওয়া হচ্ছে।
শামিমুল হক বলেন, জি-নাইন উচ্চ ফলনশীল ও রফতানিযোগ্য জাতের কলা। অনুকূল পরিবেশে একটি ছড়ার ওজন আড়াই মণ পর্যন্ত হতে পারে। প্রতিটি ছড়িতে প্রায় ২০০ থেকে ৫০০টি কলা ধরে। সঠিক পরিচর্যা করা হলে প্রচলিত অনেক জাতের তুলনায় এ জাতের কলা চাষে কৃষকেরা বেশি লাভবান হতে পারেন।
তবে টিস্যু কালচারের চারা ব্যবহারের ক্ষেত্রে চারার বয়স গুরুত্বপূর্ণ বলে জানান তিনি। ল্যাবে বেশি বয়স হয়ে গেলে জমিতে রোপণের পর গাছ আগেভাগে ফলন দিতে শুরু করতে পারে। এতে প্রত্যাশিত উৎপাদন ব্যাহত হতে পারে। তাই মানসম্মত ও সঠিক বয়সের চারা ব্যবহারের পরামর্শ দেন তিনি।

বাহুবল উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা চিন্ময় কর অপু বলেন, মিরপুর ইউনিয়নে জি-নাইন কলার প্রথম প্রদর্শনী সফল হওয়ায় স্থানীয় কৃষকদের মধ্যে আগ্রহ তৈরি হয়েছে। অনেক কৃষক ইতোমধ্যে এ জাতের কলা চাষের বিষয়ে কৃষি অফিসে যোগাযোগ করছেন। কৃষি বিভাগ প্রয়োজনীয় কারিগরি সহায়তা ও পরামর্শ দিচ্ছে।
তিনি বলেন, কলা চাষে বিটল পোকার আক্রমণ একটি সমস্যা। কচি কলার ত্বক এই পোকা কুরে খাওয়ায় পরে সেখানে কালো দাগ দেখা যায়। এতে কলার গুণগত মান নষ্ট না হলেও দেখতে খারাপ হওয়ায় কৃষকেরা বাজারে অনেক সময় ন্যায্য দাম পান না।
এ সমস্যা এড়াতে কলায় ব্যাগিং প্রযুক্তি ব্যবহারের পরামর্শ দেন চিন্ময় কর অপু। তার মতে, মোচা বের হওয়ার পর বিশেষ ব্যাগ দিয়ে কলার ছড়া ঢেকে দিলে বিটল পোকার আক্রমণ থেকে সুরক্ষা পাওয়া যায়। এতে অতিরিক্ত কীটনাশক বা ছত্রাকনাশক ব্যবহারের প্রয়োজন হয় না। ব্যাগিং করা কলা দেখতে আকর্ষণীয় হওয়ায় বাজারে ভালো দামও পাওয়া যায়।
স্থানীয় কৃষকেরা জানান, মতিন মিয়ার খেত দেখে তারা জি-নাইন কলা চাষে উৎসাহিত হয়েছেন। তাদের অনেকে আগামী মৌসুমে নিজেদের জমিতে এ জাতের কলা চাষের পরিকল্পনা করছেন। কৃষি বিভাগের সহযোগিতা অব্যাহত থাকলে বাহুবলে বাণিজ্যিকভাবে জি-নাইন কলার চাষ আরও বাড়বে বলে তারা আশা করছেন।
প্রতিনিধি/এসএস