Dhaka Mail Logo

সারাদেশ

হাতিয়ায় প্রাথমিক শিক্ষা অফিসে স্মারক জালিয়াতিসহ নানা অনিয়মের অভিযোগ

উপজেলা প্রতিনিধি

৩১ আগস্ট ২০২৬, ১২:০৬ পিএম

নোয়াখালীর হাতিয়া উপজেলা প্রাথমিক শিক্ষা অফিসে স্মারক নম্বর জালিয়াতি, সরকারি নথি গোপন, ঘুষ গ্রহণ, বিদ্যালয় পরিদর্শনে অনিয়ম, বদলি ও সংযুক্তিতে অনিয়ম, ভুয়া ভাউচার এবং তদন্ত প্রতিবেদন পরিবর্তনসহ নানা গুরুতর অনিয়মের অভিযোগ উঠেছে। এসব অভিযোগের কেন্দ্রে রয়েছেন উপজেলা প্রাথমিক শিক্ষা কর্মকর্তা মো. আব্দুল জব্বার ও উচ্চমান সহকারী মো. নাজিম উদ্দিন।

অভিযোগের প্রমাণ হিসেবে ২০২৬ সালের ফেব্রুয়ারি থেকে ২৩ জুন পর্যন্ত পত্র প্রেরণ রেজিস্টারের ২৮৪ থেকে ৫৮৯ নম্বর পর্যন্ত ১৮ পৃষ্ঠা সংগ্রহ করে পর্যালোচনা করা হয়েছে। এতে দেখা যায়, ৩৯টি স্মারকে শুধু নম্বর লেখা রয়েছে; তারিখ, প্রাপক ও বিষয়—গুরুত্বপূর্ণ এসব ঘর ফাঁকা। অভিযোগকারীদের দাবি, পরবর্তীতে সুবিধাজনক সময়ে এসব স্মারকে তথ্য যুক্ত করে চিঠি জারি করা হয়েছে এবং এর মাধ্যমে বিভিন্ন অনিয়ম ও অর্থ আদায় করা হয়েছে।

অভিযোগ রয়েছে, গত তিন বছরে এভাবে স্মারক ও নথি ব্যবহারের মাধ্যমে শিক্ষকদের ভয়ভীতি দেখানো, কৈফিয়ত তলব, তদন্ত প্রতিবেদন পরিবর্তন, বদলি ও সংযুক্তির প্রস্তাব এবং বাজেট ল্যাপস ঠেকানোর নামে অনিয়ম করা হয়েছে। বিদ্যুৎ, টিএ/ডিএ, ইন্টারনেট ও কন্টিনজেন্সি বিলসহ বিভিন্ন খাতেও অনিয়মের অভিযোগ রয়েছে। একই সঙ্গে লাখ লাখ টাকা ঘুষ নেওয়ার অভিযোগ করেছেন কয়েকজন ভুক্তভোগী।

33ebd3ce-260e-4806-b7a9-59526a970483

নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক এক সহকারী উপজেলা প্রাথমিক শিক্ষা কর্মকর্তা বলেন, ২০২৪ সালের ৪ মার্চ তারিখ দিয়ে তাকে স্মারকবিহীন কারণ দর্শানোর নোটিশ দেওয়া হয়। ১৬ দিন পর তিনি নোটিশটি পান। পরে ১৯ মার্চ সেটি গ্রহণ করে ২১ মার্চ উচ্চমান সহকারী নাজিম উদ্দিনের কাছে জবাব জমা দেন।

নথিপত্র ও সংশ্লিষ্টদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, ২০২৫ সালের ৯ জানুয়ারি উপজেলা প্রাথমিক শিক্ষা কর্মকর্তা মো. আব্দুল জব্বার সরেজমিন পরিদর্শনে গিয়ে নিঝুম দ্বীপ বাতায়ন কিল্লা সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের সহকারী শিক্ষক আবু বক্কর সিদ্দিককে ৮ জানুয়ারি এবং বসুন্ধরা গ্রাম সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের সহকারী শিক্ষক তামজিদ হোসেনকে ৫ জানুয়ারি থেকে অনুপস্থিত দেখিয়ে স্মারকবিহীন কৈফিয়ত তলব করেন। মধ্য চর আমানুল্লাহ সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের সহকারী শিক্ষক ফয়সল ইসলামকেও ২০২৪ সালের ৪ মার্চ স্মারকবিহীন কৈফিয়ত তলব করা হয়।

8b5b02b9-7594-446c-9edc-c0a6d6935482

অভিযোগ রয়েছে, তামজিদ হোসেন পাঁচ দিন অনুপস্থিত থাকার পর ২০২৫ সালের ১২ জানুয়ারি কৈফিয়ত তলব করা হলেও তার বিরুদ্ধে কোনো ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি এবং তিনি নিয়মিত বেতন পেয়েছেন। অভিযোগকারীদের দাবি, এর বিনিময়ে নগদ অর্থ লেনদেন হয়েছিল। অন্যদিকে আবু বক্কর সিদ্দিক ও ফয়সল ইসলামের কৈফিয়ত তলবের আদেশে পরে যথাক্রমে স্মারক নম্বর ৫২ ও ৩১৮ যুক্ত করে বিভাগীয় মামলার সুপারিশ করা হয়।

দক্ষিণ রাজের হাওলা সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের সহকারী শিক্ষক মফিজ উদ্দিনের শৃঙ্খলাবিরোধী কর্মকাণ্ডের বিষয়ে ২০২৪ সালের ৯ জুন বিদ্যালয়টির প্রধান শিক্ষক উপজেলা শিক্ষা কর্মকর্তার কাছে অভিযোগ করেন। পরে দুজন সহকারী উপজেলা প্রাথমিক শিক্ষা কর্মকর্তা সরেজমিন তদন্ত করে অভিযোগের সত্যতা পাওয়ার কথা উল্লেখ করে ওই বছরের ২৪ জুন ০৯ নম্বর স্মারকে শিক্ষা কর্মকর্তা বরাবর প্রতিবেদন দেন।

8911479a-57ca-4cb5-bd33-12f5e03945c4

এ ছাড়া হাতিয়া শহর আদর্শ সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের সহকারী শিক্ষক এ.এইচ.এম. আলাউদ্দিন ২০২৪ সালের ১২ জুন উপজেলা শিক্ষা কর্মকর্তার মাধ্যমে জেলা প্রাথমিক শিক্ষা কর্মকর্তার কাছে মফিজ উদ্দিনের বিরুদ্ধে অভিযোগ করেন। অভিযোগকারীর দাবি, এসব নথি গোপন রেখে অর্থের বিনিময়ে স্মারক জালিয়াতি করা হয়েছে।

লম্বরিয়া সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে মাত্র দুজন শিক্ষক কর্মরত থাকা অবস্থায় সহকারী শিক্ষক মিরাজ উদ্দিনকে মদনখালী সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে সংযুক্তির আদেশ দেওয়ার অভিযোগও রয়েছে। নোয়াখালী জেলা প্রাথমিক শিক্ষা কর্মকর্তা (চলতি দায়িত্ব) ইসরাত নাসিমা হাবীবের কার্যালয়ের ২০২৫ সালের ২৪ নভেম্বরের ৩৫৪৩(৬) নম্বর পত্রে এ আদেশ দেওয়া হয়। অভিযোগ ওঠার প্রায় সাত মাস পর চলতি মাসে আদেশটি বাতিল করা হয়েছে। তবে সংশ্লিষ্টদের বিরুদ্ধে কোনো ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি বলে অভিযোগ রয়েছে।

a7791ea0-bbb0-4418-9512-fd28c01f87a5

এর আগে মধ্য চর আমানুল্লাহ সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের সহকারী শিক্ষক ফয়সল ইসলামকে সংযুক্তির জন্য ২০২৪ সালের ৪ সেপ্টেম্বর ৬৫২ নম্বর পত্রে বিদ্যালয়ের শূন্য পদ তিনটির পরিবর্তে দুটি দেখিয়ে প্রস্তাব পাঠানোর অভিযোগ ওঠে। পরে ২ অক্টোবর সংযুক্তির আদেশ দেওয়া হয়। এরপর ৭ অক্টোবর ২০২৪ সালের ৭২১ নম্বর সংশোধনী প্রস্তাবের মাধ্যমে তা বাতিল করা হয় বলে সংশ্লিষ্ট নথিতে দেখা যায়।

কাউনিয়া সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের সহকারী শিক্ষক মহিমা বেগম ২০২৩ সালের ডিসেম্বর থেকে ২০২৫ সালের ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত দীর্ঘ সময় কর্মস্থলে অনুপস্থিত থাকলেও নিয়মিত বেতন পাওয়ার অভিযোগ রয়েছে। একইভাবে হাজী লাল মিয়া সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের সহকারী শিক্ষক মোহাং মোশাররফ হোসেন ২০২৪ সালের ১১ থেকে ২৬ অক্টোবর পর্যন্ত ১৬ দিন অনুপস্থিত থাকলেও তার কাছে মাত্র তিন দিনের কৈফিয়ত তলব করা হয় এবং পরে কোনো ব্যবস্থা না নিয়ে নিয়মিত বেতন দেওয়া হয়েছে বলে অভিযোগ রয়েছে।

f5bb95ca-d7f7-43f8-9b14-a028f42cef06

বাতায়ন কিল্লা সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের সহকারী শিক্ষক আবু বক্কর সিদ্দিক অভিযোগ করেন, ২০২৩ সালের ২২ জানুয়ারি তিনি অন্যত্র বদলির আদেশ পান। তার দাবি, ২০ হাজার টাকা ঘুষ না দেওয়ায় মো. আব্দুল জব্বার ও নাজিম উদ্দিন তাকে বদলিকৃত কর্মস্থলে যোগ দিতে বাধা দেন। পরে কোনো কারণ দর্শানো ছাড়াই ২০২৫ সালের সেপ্টেম্বর থেকে আট মাস তার বেতন-ভাতা বন্ধ রাখা হয় বলে অভিযোগ করেন তিনি।

আবু বক্কর সিদ্দিক বলেন, “এই সমস্যা থেকে উত্তরণের জন্য চলতি বছরের ১৫ ফেব্রুয়ারি আমি অফিসে গেলে উচ্চমান সহকারী নাজিম উদ্দিন আমাকে চারতলা থেকে ফেলে দেওয়ার হুমকি দেন এবং অফিসে আর না আসতে বলেন। এ সময় সাবেক সহকারী উপজেলা প্রাথমিক শিক্ষা কর্মকর্তা মো. মাহবুবুর রহমান উপস্থিত ছিলেন।”

তিনি আরও বলেন, “তাদের যোগসাজশে জেলা প্রাথমিক শিক্ষা কর্মকর্তা (চলতি দায়িত্ব) ইশরাত নাসিমা হাবীব উল্টো আমার বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেন। গত ১৮ আগস্ট শৃঙ্খলা ভঙ্গের অভিযোগে আমার বেতন গ্রেড এক ধাপ নিচে নামানোর লঘুদণ্ড দেওয়া হয়েছে।”

8911479a-57ca-4cb5-bd33-12f5e03945c4

আরেক অভিযোগে বলা হয়, মো. আব্দুল জব্বার ২০২২ সালে হাতিয়ায় কর্মরত না থাকলেও ২০২৫ সালের ২৩ ডিসেম্বর ইউআরসি ডাটা এন্ট্রি অপারেটরের বিরুদ্ধে বিভাগীয় তদন্তে লিখিত সাক্ষ্য দেন। ভুক্তভোগীর দাবি, শিক্ষক মফিজ উদ্দিন ও তৎকালীন সহকারী উপজেলা প্রাথমিক শিক্ষা কর্মকর্তা কামরুল হাসানের আনা অভিযোগের বিষয়ে তিনি অসত্য সাক্ষ্য দিয়েছেন। তবে কামরুল হাসানের বিরুদ্ধেও ২০২২ সালের গণিত অলিম্পিয়াডের প্রশিক্ষণে অনুপস্থিত থেকেও ২১ হাজার ৬০০ টাকা গ্রহণ এবং একই সময়ে বিদ্যালয় পরিদর্শনের অভিযোগ রয়েছে।

এ ছাড়া আবু বক্কর সিদ্দিকের বিরুদ্ধে করা বিভাগীয় মামলার প্রতিবেদনে নিজের যোগদানের সাল এক বছর কম দেখিয়ে ২০২৪ সালে যোগদান করেছেন বলে উল্লেখ করা হয়েছে—এমন অভিযোগও করেছেন তিনি।

অন্যদিকে, প্রাথমিক শিক্ষা অধিদফতরের ২০২৫ সালের ১৮ ও ২৫ নভেম্বরের দুটি অফিস আদেশে দেখা যায়, ১৮ নভেম্বর মো. আব্দুল জব্বারকে রাজবাড়ীর গোয়ালন্দ উপজেলা শিক্ষা অফিসে বদলির আদেশ দেওয়া হয়। এর এক সপ্তাহের মধ্যে ২৫ নভেম্বর ৫৮২ নম্বর পত্রে সেই আদেশ বাতিল করা হয়। এরপর তিনি হাতিয়ায় বহাল থাকেন।

7d48bb78-a00f-4516-b2e9-fa58d9276bb3

নাজিম উদ্দিনের বিরুদ্ধেও স্থানীয় প্রভাব খাটিয়ে কর্মকর্তা-কর্মচারী ও শিক্ষকদের হয়রানি এবং বিভিন্ন অনিয়মে জড়িত থাকার অভিযোগ রয়েছে। সংশ্লিষ্টদের দাবি, তার প্রভাবের কারণে অনেক কর্মকর্তা-কর্মচারী হাতিয়া ছেড়ে যেতে বাধ্য হয়েছেন।

সাবেক হিসাব সহকারী মো. মেহেদী হাসান হাতিয়ায় দুই বছর তিন মাস কর্মরত থাকলেও তাকে কোনো কাজ বা কর্মবণ্টন আদেশ দেওয়া হয়নি বলে অভিযোগ রয়েছে। অভিযোগকারীদের দাবি, নাজিম উদ্দিন শিক্ষকদের কাছ থেকে টাকা নিয়ে তার কাজ করতেন এবং এর একটি অংশ আব্দুল জব্বারকে দিতেন। বিদ্যালয় পরিদর্শন ও তদন্তের সময়ও সুবিধাভোগী শিক্ষক প্রতিনিধিকে সঙ্গে নিয়ে টাকা আদায়ের অভিযোগ রয়েছে। এসব অনিয়মের বিরোধিতা করায় অফিস সহায়ক মো. আব্দুল লতিফকে নোয়াখালীর চাটখিলে বদলি করা হয়েছে বলে ভুক্তভোগীদের দাবি।

29e1d31c-2e1d-4474-9f28-7e63c6036c22

অভিযোগকারীদের আরও দাবি, জেলা প্রাথমিক শিক্ষা অফিসের সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের যোগসাজশে দীর্ঘদিন ধরে এসব অনিয়ম চললেও কার্যকর ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি। এতে শিক্ষক, কর্মকর্তা ও কর্মচারীদের মধ্যে আতঙ্ক তৈরি হয়েছে। অনিয়মের প্রতিবাদ করায় একাধিক কর্মকর্তা-কর্মচারী হাতিয়া ছেড়ে যেতে বাধ্য হয়েছেন বলেও দাবি করেছেন সংশ্লিষ্ট দফতরের একজন দায়িত্বশীল ব্যক্তি।

অভিযোগের বিষয়ে হাতিয়া উপজেলা প্রাথমিক শিক্ষা কর্মকর্তা (চলতি দায়িত্ব) মো. আব্দুল জব্বার বলেন, “অফিসের ভালো-মন্দ বিষয় দেখার জন্য জেলা শিক্ষা কর্মকর্তা আছেন। আমরা সেখানে জবাবদিহি করব।”

36592e9f-1ed4-4704-bac4-5e909e25d2fd

নোয়াখালী জেলা প্রাথমিক শিক্ষা কর্মকর্তা (চলতি দায়িত্ব) ইসরাত নাসিমা হাবীবকে অভিযোগগুলোর বিষয়ে জানানো হলে তিনি পরে এ বিষয়ে কথা বলবেন জানিয়ে ফোন রেখে দেন।

প্রাথমিক ও গণশিক্ষা মন্ত্রণালয়ের অতিরিক্ত সচিব (প্রশাসন) মনোয়ারা ইশরাত বলেন, “আমরা লিখিত অভিযোগ পেলে প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নেব।”

ভুক্তভোগীরা অভিযোগগুলোর তদন্ত করে সত্যতা পাওয়া গেলে দায়ীদের বিরুদ্ধে প্রচলিত আইন ও সরকারি বিধি অনুযায়ী ব্যবস্থা নেওয়ার দাবি জানিয়েছেন।

প্রতিনিধি/এসএস