৩০ আগস্ট ২০২৬, ০৬:৫৪ পিএম
২০১৭ সালের দিকে জিআই পণ্য হিসেবে স্বীকৃতি পেলেও জয়পুরহাটে বাণিজ্যিকভাবে গড়ে উঠেনি লতিরাজ কচু বেচাকেনার বিক্রয় কেন্দ্র কিংবা বড় ধরনের হাট-বাজার। ফলে জেলার কৃষিভিত্তিক এই ব্র্যান্ডিং পণ্য বাণিজ্যিক ভাবে দেশের চাহিদা মিটিয়ে বিদেশে রপ্তানির অপার সম্ভাবনা থাকলেও তা নানা সমস্যা, সংকটে আটকে আছে।
স্থানীয় কৃষকদের দাবি, সরকারি-বেসরকারি উদ্যোগে জেলায় লতিরাজ কচু বেচাকেনার নিদিষ্ট হাট-বাজার গড়ে উঠলে জেলায় লতিরাজ কচু চাষে উদ্বুদ্ধ হবেন আরও কৃষক। অল্প খরচে বেশি লাভজনক হওয়ায় দিন দিন জনপ্রিয় হয়ে উঠেছে এই কৃষি পণ্য। লতিরাজ কচু জেলার ব্র্যান্ডিং পণ্য হলেও বেশিরভাগ চাষাবাদ হয় পাঁচবিবি উপজেলায় এবং একমাত্র অস্থায়ী ভাবে গড়ে উঠা পাঁচবিবির বটতলী লতিরাজ কচুর হাট।
জেলা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদফতর সূত্রে জানা গেছে, চলতি মৌসুমে জয়পুরহাটের পাঁচটি উপজেলার বিভিন্ন মাঠে প্রায় ১২০৯ হেক্টর জমিতে লতিরাজ কচুর চাষাবাদ হয়েছে।
আরও পড়ুন: জিআই অনুমোদন পেল আরও ৪ পণ্য
কৃষি বিভাগ বলছে, পাঁচবিবির কচুর লতির গুণগত মান ভালো হওয়ায় দেশের বিভিন্ন বাজারে এর চাহিদা রয়েছে। আধুনিক বাজার ব্যবস্থাপনা, সরাসরি পাইকারের সঙ্গে কৃষকের সংযোগ এবং সংরক্ষণ ও পরিবহনের সুবিধা নিশ্চিত করা গেলে এই কৃষিপণ্যকে ঘিরে আরও বড় বাজার তৈরি হতে পারে।
কৃষি সংশ্লিষ্টরা বলছেন, কচুর লতিকে শুধু স্থানীয় বাজারের পণ্য হিসেবে না দেখে বাণিজ্যিকভাবে উৎপাদন ও বাজারজাতের উদ্যোগ নেওয়া প্রয়োজন। কৃষকদের প্রশিক্ষণ, উন্নত জাতের চারা, সহজ শর্তে ঋণ এবং ন্যায্যমূল্য নিশ্চিত করা গেলে পাঁচবিবির কচুর লতি কৃষকের আয়ের অন্যতম উৎস হয়ে উঠতে পারে। নানা সংকটের মধ্যেও তাই সম্ভাবনার হাতছানি দিচ্ছে পাঁচবিবির কচুর লতি। কৃষকের উৎপাদন থেকে ভোক্তার বাজার-পুরো ব্যবস্থাপনায় সমন্বয় করা গেলে এই কৃষিপণ্যই বদলে দিতে পারে জেলার কৃষি খাতকে।
স্থানীয় কৃষকদের অভিযোগ, স্থানীয়ভাবে কচুর লতির চাহিদা থাকায় প্রতি বছরই বাড়ছে আবাদ। তবে বাজার ব্যবস্থাপনার দুর্বলতা, পরিবহন সংকট, সংরক্ষণের সুযোগ না থাকা এবং ন্যায্যমূল্য না পাওয়ায় সম্ভাবনাময় এই কৃষিপণ্য থেকে কাঙ্ক্ষিত সুফল পাচ্ছেন না অনেক কৃষক। তাই অনেক কৃষকই মুখ ফিরিয়ে নিচ্ছেন লতির চাষাবাদ থেকে।
পাঁচবিবি উপজেলার পাটাবুকা গ্রামের কৃষক হাফিজুর শেখ বলেন, ‘এ বছর এক বিঘার সামান্য বেশি জমিতে লতিরাজ কচু চাষাবাদ করেছি। এক বিঘা জমিতে কচুর চারা, সার, শ্রমিক, সেচ, কীটনাশক, আগাছা পরিষ্কার, নিয়মিত পরিচর্যা করাসহ সব মিলে খরচ হয়েছে ৪০ থেকে ৫০ হাজার টাকা। আর তিনি এক বিঘার সামান্য বেশি জমিতে লতিরাজ কচু বিক্রি করেছেন বিক্রি করেছেন লক্ষাধিক টাকা।’
তিনি আরও বলেন, ‘একদিকে যেমন অল্প খরচে বেশি লাভবান হচ্ছে কৃষক অন্যদিকে বাজার ব্যবস্থাপনা ভালো না থাকায় পড়তে হয় বিড়ম্বনায়। প্রতিদিন এই হাট থেকে ৪ থেকে ৫টি ট্রাকে লোড করে দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে লতি নিয়ে যায় বিভিন্ন হাটে। বর্তমান প্রতি কেজি লতি হাটে বিক্রি হচ্ছে ৫০ থেকে ৫২ টাকা দরে।’
বটতলী লতিরাজ কচুর হাটে শ্রমিকের কাজে নিয়োজিত বৃদ্ধ ইউসুফ আলী মন্ডল বলেন, ‘প্রতিদিন ভোরে উপজেলার বিভিন্ন এলাকা থেকে কৃষকেরা লতি নিয়ে আসে হাটে। পরে সেগুলো বিভিন্ন পাইকারের কাছে বিক্রি করেন কৃষকেরা। সকাল থেকে দুপুর পর্যন্ত চলে বেচাকেনা। এরপর দূর-দূরান্তে থেকে আসা পাইকারা কৃষকের থেকে লতিরাজ কচু কিনে নিয়ে প্যাকেজিং করে ট্রাকে বোঝায় করে বিভিন্ন জেলায় নিয়ে যায়।’
আরও পড়ুন: জিআই স্বীকৃতি পেল মানিকগঞ্জের হাজারী গুড়
স্থানীয় ব্যবসায়ী মমিজুল হক অভিযোগ করে বলেন, ‘লতিরাজ কচু জেলার ব্র্যান্ডিং পণ্য হিসেবে স্বীকৃতি পেলেও আজ পর্যন্ত জেলার কোথাও সরকারি-বেসরকারিভাবে কচুর লতি বেচাকেনার হাট-বাজার গড়ে ওঠেনি। পাঁচবিবির বটতলীতে আমরা ব্যবসায়ীরা স্থানীয় কৃষকদের থেকে জায়গা ভাড়া করে নিয়ে হাট-বাজার বসায় কিন্তু সেখানেও দিতে হয় জমা।’
তিনি আরও বলেন, ‘হাটজুড়ে নানা সমস্যা, সংকট আছে। হাটের জায়গা নেই, ব্যবসায়ীদের ভাড়া করা জায়গায় হাট বসে, খোলা আকাশের নিচেই রোদ, বৃষ্টিতে ভিঁজে এখানে ব্যবসা করতে হয়। তাছাড়া বর্ষায় কাদা হয় এবং ময়লা ফেলার জায়গাটুকুও নেই।’
জয়পুরহাট জেলা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদফতরের উপ-পরিচালক মনজু আলম সরকার বলেন, অল্প খরচে বেশি লাভবান হওয়ায় দিন দিন কচুর লতি চাষ বৃদ্ধি পাচ্ছে। তবে জেলার এই কৃষি পণ্যকে আরও লাভজনক পর্যায়ে নিতে হলে স্থায়ীভাবে বাজার ব্যবস্থাপনা গড়ে তোলা, দূর-দূরান্তে থেকে আসা হাইকারদের জন্য বিশ্রামাগার, হাটের টয়লেট ব্যবস্থা, শেড নির্মাণ ও কৃষকদের সরাসরি কচু বিক্রির সুযোগ সৃষ্টি করা এবং দেশের চাহিদা মিটিয়ে বিদেশে রফতানি করা প্রয়োজন। এতে একদিকে যেমন কৃষকেরা লাভবান হবে, অন্যদিকে বিদেশে রফতানির মধ্যদিয়ে সরকারি রাজস্ব বাড়বে বলে আশা করেন এই কর্মকর্তা।
প্রতিনিধি/এমআই