Dhaka Mail Logo

সারাদেশ

বাঁধে পাইপ বসিয়ে ঘেরে নোনাপানি, লাল হয়ে মরছে ধানের চারা

জেলা প্রতিনিধি

৩০ আগস্ট ২০২৬, ০৬:৪৫ পিএম

কপোতাক্ষ নদের পাড়ে মাটির বেড়িবাঁধ। বাঁধের এক পাশে নোনাপানি, অন্য পাশে বিস্তীর্ণ ফসলের মাঠ। মাঠজুড়ে সদ্য রোপণ করা ধানের চারা। কোথাও সবুজ, কোথাও আবার লালচে হয়ে শুকিয়ে যাচ্ছে। চিংড়িঘের সংলগ্ন জমিগুলোর অবস্থা সবচেয়ে খারাপ। নোনাপানি চুঁইয়ে ঢুকে লালচে হয়ে গেছে ধানের চারা। কোথাও মরে পড়ে আছে চারা।

সাতক্ষীরার আশাশুনি উপজেলার চাকলা গ্রামের নদীতীরবর্তী এলাকায় গত বৃহস্পতিবার দুপুরে সরেজমিনে এমন চিত্র দেখা গেছে। স্থানীয় কৃষকদের অভিযোগ, চিংড়িঘেরে নোনাপানি তোলার জন্য বেড়িবাঁধে পাইপ বসানো হয়েছে। এতে একদিকে বাঁধের স্থায়িত্ব হুমকির মুখে পড়ছে, অন্যদিকে নোনাপানি ঢুকে ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে ফসলি জমি।

সরেজমিনে দেখা যায়, বেড়িবাঁধের নিচ দিয়ে পাইপ নেওয়ার একটি স্থানে সম্প্রতি মাটি দেওয়া হয়েছে। মাটি এখনো নরম। ওই পাইপের মাধ্যমে কপোতাক্ষ নদ থেকে পাশের চিংড়িঘেরে পানি নেওয়ার ব্যবস্থা রয়েছে।

স্থানীয় বাসিন্দা শাকিরা বেগম বলেন, কয়েক দিন আগে বেড়িবাঁধ কেটে নদীর পানি তোলার জন্য পাইপ বসানো নিয়ে স্থানীয় লোকজনের সঙ্গে ঘেরমালিকদের বিরোধ হয়।

তার অভিযোগ, ঘেরের নোনাপানি চুঁইয়ে পাশের জমিতে ঢুকে ধানের চারা লাল হয়ে মারা যাচ্ছে। নোনাপানি তোলা বন্ধ না হলে এলাকায় চাষাবাদ করা কঠিন হয়ে পড়বে।

চাকলা গ্রামের কৃষক আব্দুল্লাহ ঢালী বলেন, গত বছরও ওই বিলে ভাল ধান হয়েছিল। এবার পাশের ঘেরের নোনাপানি ঢুকে তার তিন বিঘাসহ আশপাশের অনেক জমির ধানের চারা ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। তার দাবি, নোনাপানি তোলা বন্ধ হলেই বিরোধেরও অবসান হবে।

কৃষক নুরমান সর্দারের ছয় বিঘা জমির ধানের চারাও নষ্ট হয়েছে। তিনি বলেন, ধানের চারা লাল হয়ে গেছে। এবার আর ধান হবে না। ঘেরমালিকেরা নোনাপানি তুলে মাছ চাষ করবেন, আর তাদের জন্য আমাদের ধান মরবে, এটা মেনে নেওয়া যায় না।

নুরমান সর্দারের দাবি, চাকলা ছাড়াও শুভদ্রঘাটি, রুয়ার বিলসহ আশপাশের এলাকায় দেড় হাজা বিঘার বেশি জমিতে ধান চাষ হয়। এর বিপরীতে তিন-চারজন ঘেরমালিক প্রায় ১৫০ থেকে ২০০ বিঘা জমিতে বাঁধ কেটে নোনাপানি ঢুকিয়ে চিংড়ি চাষ করছেন।

চাকলা উন্নয়ন কমিটির সদস্য মো. তৌহিদুল ইসলাম বলেন, চাকলার তেলিখালির বিলে ২৫০ বিঘার বেশি জমিতে ধান চাষ হয়েছে। এর বিপরীতে একটি ঘের রয়েছে প্রায় ৩০ বিঘা জমিতে। রাস্তার অন্য পাশেও রয়েছে আরো ১৫ থেকে ২০ বিঘা ঘের।

তার অভিযোগ, মূল বেড়িবাঁধ ছিদ্র করে নোনাপানি তোলায় পাশের ধানের জমিতে পানি ঢুকে চারা নষ্ট হয়ে যাচ্ছে।

তবে বাঁধ কেটে পাইপ বসানোর অভিযোগ অস্বীকার করেছেন ঘেরমালিক আসলাম হোসেন। তিনি বলেন, আমি বেড়িবাঁধ বা রাস্তা কাটিনি। বাঁধের গোড়ার মাটি সরে গিয়ে আগে থেকে থাকা পাইপের মুখ ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছিল। পরে স্থানীয় গণ্যমান্য ব্যক্তিদের পরামর্শে সেটি মেরামত করেছি। আমি প্রায় ৩০ বছর ধরে এখানে ঘের করেছি।

তিনি আরও বলেন, গত বছরও ঘের ছিল, তখন পাশের জমির ধানের ক্ষতি হয়নি। এবার আমি চিকিৎসার জন্য হাসপাতালে থাকায় ঘের দেখাশোনার লোক না থাকায় সেখানে পানি বেড়ে যায়।

স্থানীয় ইউপি সদস্য আব্দুর রউফ সানার অভিযোগ, চাকলা খেয়াঘাটসংলগ্ন তেলিখালীর বিলে আসলাম হোসেন বেড়িবাঁধ কেটে প্রায় দুই ফুট গভীর করে পাইপ বসিয়ে নোনাপানি তুলছেন। প্রায় ৩০ থেকে ৩৫ বিঘা ঘেরের জন্য নোনাপানি তোলায় পাশের প্রায় ১৫০ বিঘা জমির ধান চাষ হুমকির মুখে পড়েছে।

এ ঘটনায় গত ২৩ আগস্ট এলাকাবাসীর পক্ষ থেকে সাতক্ষীরা পানি উন্নয়ন বোর্ডের (পাউবো) নির্বাহী প্রকৌশলীর কাছে লিখিত অভিযোগ দেওয়া হয়। অভিযোগে বলা হয়, আসলাম হোসেনসহ ১০ থেকে ১২ জন চাকলা গ্রামের তেলিখালী বিল এলাকায় কপোতাক্ষ নদের বন্যা নিয়ন্ত্রণ বাঁধ কেটে পাইপ বসিয়েছেন। এতে শত শত বিঘা জমির ফসল নষ্ট হচ্ছে।

সাতক্ষীরা পাউবোর উপ-বিভাগীয় প্রকৌশলী মো. রাশিদুল ইসলাম বলেন, অভিযোগ পাওয়ার পর ঘটনাস্থলে গিয়ে অভিযোগের সত্যতা পাওয়া গেছে। ঘেরমালিক আসলাম হোসেনের বিরুদ্ধে পাউবোর পক্ষ থেকে মামলা করার প্রস্তুতি নেওয়া হচ্ছে। পাশাপাশি এ ধরনের পাইপ উচ্ছেদেও কার্যক্রম চলছে। চাকলা এলাকায় আরও কয়েকজন একইভাবে বেড়িবাঁধ ক্ষতিগ্রস্ত করে নোনাপানি তোলার সঙ্গে জড়িত থাকার তথ্য পাওয়া গেছে। সরেজমিনে জরিপ করে তাদের বিরুদ্ধেও আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হবে।

প্রতিনিধি/এফএ