জেলা প্রতিনিধি
৩০ আগস্ট ২০২৬, ০১:৩০ পিএম
বইয়ের পাতায় ভবিষ্যতের স্বপ্ন, আর কৃষিজমিতে সেই স্বপ্ন বাস্তবায়নের চেষ্টা। পড়াশোনার পাশাপাশি কৃষিকে কাজে লাগিয়ে নিজের পায়ে দাঁড়ানোর পথ খুঁজে নিয়েছেন দিনাজপুরের বোচাগঞ্জের তরুণ মিনহাজ উদ্দিন। মাদরাসায় ফাজিল (অনার্স) পড়ার পাশাপাশি ৫০ শতক জমিতে আধুনিক পদ্ধতিতে চাষ করছেন হলুদ ও কালো রঙের তরমুজ। দুই প্যাকেট বীজ দিয়ে শুরু করা সেই শখ এখন তাকে এগিয়ে নিচ্ছে কৃষি উদ্যোক্তা হওয়ার পথে।
মিনহাজ উদ্দিন বোচাগঞ্জ উপজেলার ৬ নম্বর রণগাঁও ইউনিয়নের চণ্ডীপুর গ্রামের গোলাম মোস্তফার ছোট ছেলে। ২০২৩ সালে চণ্ডীপুর দাখিল মাদরাসা থেকে দাখিল এবং ২০২৫ সালে ঢাকার তা’মীরুল মিল্লাত কামিল মাদরাসা থেকে আলিম পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হন তিনি। বর্তমানে একই মাদরাসায় ফাজিল (অনার্স) পড়ছেন।
আলিম পরীক্ষা শেষ করার পর শখের বসে দুই প্যাকেট তরমুজের বীজ সংগ্রহ করেন মিনহাজ। বাড়ির পাশে নিজের জমিতে শুরু করেন তরমুজ চাষ। প্রথমবার ভালো ফলন পাওয়ার পর কৃষির প্রতি তার আগ্রহ আরও বেড়ে যায়। তখনই পড়াশোনার পাশাপাশি কৃষিকে বাণিজ্যিকভাবে করার চিন্তা শুরু করেন তিনি।

পরে উপজেলা কৃষি কার্যালয়ে যোগাযোগ করলে কর্মকর্তাদের কাছ থেকে আধুনিক পদ্ধতিতে তরমুজ চাষের বিষয়ে পরামর্শ পান মিনহাজ। সেই পরামর্শ কাজে লাগিয়ে এবার বড় পরিসরে রঙিন তরমুজ চাষের উদ্যোগ নেন তিনি।
নিজের অর্থায়নে মালচিং পদ্ধতিতে মাচা তৈরি করে দুই জাতের তরমুজ চাষ করছেন মিনহাজ। এর মধ্যে ‘সূর্য ডিম’ জাতের হলুদ তরমুজের বীজ বাইরে থেকে সংগ্রহ করে নিজ উদ্যোগে চাষ করেছেন তিনি। অন্যদিকে ‘মার্সেলো’ জাতের কালো তরমুজ উপজেলা কৃষি কার্যালয়ের সরকারি একক ফল বাগান প্রদর্শনীর আওতায় চাষ করা হয়েছে।
৫০ শতক জমি লিজ নেওয়াসহ তরমুজ চাষে মিনহাজের মোট খরচ হয়েছে প্রায় ৮০ হাজার টাকা। ইতিমধ্যে তরমুজ বিক্রি শুরু করেছেন তিনি। বর্তমানে প্রতি কেজি তরমুজ ৭০ থেকে ৮০ টাকা দরে বিক্রি করছেন।
৭০ থেকে ৮০ দিনের মধ্যে তরমুজ সংগ্রহ শেষ হওয়ার কথা থাকলেও এরই মধ্যে প্রায় পুরো বাগানের তরমুজ বিক্রি হয়ে গেছে। ইতিমধ্যে প্রায় ১ লাখ টাকার তরমুজ বিক্রি করেছেন মিনহাজ। বাজারদর অনুকূলে থাকলে পুরো মৌসুমে ২ লাখ ৫০ হাজার থেকে ৩ লাখ টাকার তরমুজ বিক্রি হবে বলে আশা করছেন তিনি।
তরুণ উদ্যোক্তা মিনহাজ উদ্দিন বলেন, ‘শখের বসে বাড়ির পাশে নিজের অল্প জমিতে দুই প্যাকেট বীজ দিয়ে তরমুজ চাষ শুরু করেছিলাম। প্রথমবার ভালো ফলন পাওয়ার পর মনে হয়েছে, পড়াশোনার পাশাপাশি এটিকে বাণিজ্যিকভাবে করা সম্ভব। ৫০ শতক জমি লিজ নেওয়াসহ মোট খরচ হয়েছে প্রায় ৮০ হাজার টাকা। এর মধ্যে ১ লাখ টাকার তরমুজ বিক্রি করেছি। বাজারদর অনুকূলে থাকলে প্রায় ২ লাখ ৫০ হাজার থেকে ৩ লাখ টাকার তরমুজ বিক্রি হবে বলে আশা করছি।’

তিনি আরও বলেন, ‘আমি মাদরাসায় পড়াশোনা করছি। লেখাপড়ার পাশাপাশি কৃষিকাজ করছি। যারা লেখাপড়া করে ঘুরে বেড়াচ্ছেন, তারা কৃষি কার্যালয়ে যোগাযোগ করে আমার মতো উদ্যোক্তা হতে পারেন। কৃষিকে কাজে লাগিয়ে নিজের পায়ে দাঁড়ানোর সুযোগ রয়েছে।’
বোচাগঞ্জ উপজেলা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদফতর সূত্রে জানা যায়, ২০২৫-২৬ অর্থবছরে দিনাজপুর অঞ্চলে টেকসই কৃষি উন্নয়ন প্রকল্পের আওতায় ‘রণগাঁও টেকসই কৃষি উন্নয়ন কৃষক গ্রুপ’-এর মাধ্যমে সরকারি একক ফল বাগান প্রদর্শনী বাস্তবায়ন করা হচ্ছে। এর আওতায় ‘মার্সেলো’ জাতের কালো তরমুজ চাষ করা হয়েছে।
বোচাগঞ্জ উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা নয়ন কুমার সাহা বলেন, ‘২০২৫-২৬ অর্থবছরে দিনাজপুর অঞ্চলে টেকসই কৃষি উন্নয়ন প্রকল্পের আওতায় মিনহাজ উদ্দিনকে একক ফল বাগান প্রদর্শনীর মাচায় তরমুজ চাষের জন্য প্রয়োজনীয় বীজ, সারসহ অন্যান্য কৃষি উপকরণ উপজেলা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদফতর থেকে সরবরাহ করা হয়েছে। উপসহকারী কৃষি কর্মকর্তা মাহবুব আলম নিয়মিত মাচায় তরমুজ চাষে তাকে কারিগরি পরামর্শ দিয়েছেন।’
তিনি আরও বলেন, ‘মিনহাজ উদ্দিনের উদ্যোগটি সত্যিই প্রশংসনীয়। তিনি একজন মাদরাসার শিক্ষার্থী হয়েও পড়াশোনার পাশাপাশি আধুনিক পদ্ধতিতে তরমুজ চাষে যুক্ত হয়েছেন। বিশেষ করে নিজের উদ্যোগে নতুন জাতের তরমুজ চাষের পাশাপাশি কৃষি কার্যালয়ের পরামর্শ ও প্রদর্শনীর আওতায় আরেকটি জাতের তরমুজ চাষ করছেন।’
বোচাগঞ্জ উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা মো. মারুফ হাসান বলেন, ‘পড়াশোনার পাশাপাশি মিনহাজ উদ্দিনের কৃষি উদ্যোক্তা হওয়ার উদ্যোগটি অত্যন্ত প্রশংসনীয়। আধুনিক পদ্ধতিতে তরমুজ চাষের মাধ্যমে তিনি যেমন নিজের কর্মসংস্থানের পথ তৈরি করছেন, তেমনি অন্য তরুণদেরও কৃষিতে সম্পৃক্ত হওয়ার অনুপ্রেরণা দিচ্ছেন।’
তিনি আরও বলেন, ‘তরুণেরা চাকরির অপেক্ষায় না থেকে কৃষি বিভাগের পরামর্শ ও আধুনিক প্রযুক্তি কাজে লাগিয়ে কৃষিকে উদ্যোক্তা হওয়ার ক্ষেত্র হিসেবে গ্রহণ করতে পারেন। মিনহাজের মতো শিক্ষিত তরুণদের এমন উদ্যোগ স্থানীয় কৃষিতে নতুন সম্ভাবনা তৈরি করবে।’
প্রতিনিধি/এসএস