জেলা প্রতিনিধি
২৮ আগস্ট ২০২৬, ০২:১৫ পিএম
ভোরের আলো ফোটার আগেই ঠাকুরগাঁও শহরের আব্দুর রশিদ ডিগ্রি কলেজ প্রাঙ্গণে জড়ো হন দেশের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে আসা দৌড়বিদেরা। কেউ নিজের সক্ষমতা যাচাই করতে, কেউ সুস্থ থাকার প্রত্যয়ে, আবার কেউ নতুন মানুষের সঙ্গে পরিচিত ও বন্ধুত্ব গড়ে তুলতে এসেছেন। তাদের পদচারণায় মুখর হয়ে ওঠে পুরো এলাকা।
শুক্রবার (২৮ আগস্ট) ভোর সাড়ে পাঁচটায় ‘সুস্থতা, সম্প্রীতি ও বন্ধুত্বের জয়গানে’ এই প্রত্যয় সামনে রেখে ঠাকুরগাঁও রানার্সের আয়োজনে অনুষ্ঠিত হয় ‘ঠাকুরগাঁও হাফ ম্যারাথন ২০২৬’। এতে দেশের ৩২ জেলা থেকে ২৭০ জন দৌড়বিদ অংশ নেন।
বাংলাদেশের ২৩তম নবনির্বাচিত রাষ্ট্রপতি মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীরের প্রতি সম্মান জানিয়ে এবারের আয়োজনটি তাকে উৎসর্গ করা হয়েছে। আয়োজনটির সার্বিক তত্ত্বাবধানে ছিল মেসার্স গার্ডেনিয়া।

ম্যারাথনে অংশ নেওয়া দৌড়বিদেরা বলেন, দৌড় তাদের কাছে শুধু প্রতিযোগিতা নয়, সুস্থ ও সুন্দর জীবনযাপনেরও একটি মাধ্যম। দেশের বিভিন্ন জেলা থেকে আসা মানুষের সঙ্গে একসঙ্গে দৌড়ানোর সুযোগ তাদের আনন্দ দিয়েছে। পাশাপাশি ঠাকুরগাঁওয়ের প্রকৃতি, ইতিহাস ও ঐতিহ্য দেখার সুযোগ পেয়েও তারা উচ্ছ্বসিত।
ঢাকা থেকে আসা তরুণী দৌড়বিদ জিনায়া মেহেজাবীন বলেন, ‘দৌড়ের মাধ্যমে শরীর ও মন দুটোই ভালো রাখা যায়। দেশের বিভিন্ন জেলা থেকে আসা এত মানুষের সঙ্গে একসঙ্গে দৌড়াতে পেরে খুব ভালো লাগছে। ঠাকুরগাঁওয়ের পরিবেশও বেশ সুন্দর।’

অংশগ্রহণকারী জেসমিন নাহার লাকি বলেন, ‘ম্যারাথনকে ঘিরে শুধু দৌড় নয়, অনেক নতুন মানুষের সঙ্গে পরিচয় হয়েছে। একসঙ্গে দৌড়ানোর মাধ্যমে বন্ধুত্ব তৈরি হচ্ছে। এ ধরনের আয়োজন নিয়মিত হওয়া দরকার।’
গাজীপুর থেকে আসা ৭৯ বছর বয়সী এক দৌড়বিদ বলেন, তিনি এর আগে অনেক ম্যারাথনে অংশ নিয়েছেন। তবে ঠাকুরগাঁওয়ের হাফ ম্যারাথন তার কাছে ব্যতিক্রমী মনে হয়েছে। শিক্ষার্থীদের আয়োজনে তিনি মুগ্ধ হয়েছেন এবং এই বয়সেও ম্যারাথনে অংশ নেওয়ার জন্য নতুন করে অনুপ্রাণিত হয়েছেন। ভবিষ্যতে আরও বড় আয়োজন হলে আবারও ঠাকুরগাঁওয়ে আসার প্রত্যাশা জানান তিনি।

ঢাকা থেকে আসা আরেক তরুণী সুমাইয়া আক্তার বলেন, ‘ঠাকুরগাঁওয়ের মাটিতে দেশের ৩২ জেলা থেকে দৌড়বিদদের অংশগ্রহণ অত্যন্ত আনন্দের বিষয়। আমরা চাই, এ ধরনের আয়োজনের মাধ্যমে ঠাকুরগাঁও দেশের মানুষের কাছে আরও বেশি পরিচিত হয়ে উঠুক এবং তরুণেরা খেলাধুলার প্রতি আরও আগ্রহী হোক।’
আয়োজকেরা জানান, তরুণদের খেলাধুলায় উৎসাহিত করা, সুস্থ জীবনযাপনে মানুষকে উদ্বুদ্ধ করা এবং দেশের বিভিন্ন জেলার মানুষের মধ্যে বন্ধুত্ব ও সম্প্রীতি বাড়ানোই ছিল আয়োজনের মূল উদ্দেশ্য। একই সঙ্গে রাষ্ট্রপতির জেলা হিসেবে ঠাকুরগাঁওকে দেশের মানুষের কাছে তুলে ধরার লক্ষ্যও ছিল।

ঠাকুরগাঁও রানার্সের প্রধান পৃষ্ঠপোষক ও মেসার্স গার্ডেনিয়ার স্বত্বাধিকারী মো. নূর-এ-শাহাদৎ স্বজন বলেন, ‘দৌড়ের মাধ্যমে আমরা মানুষকে একত্রিত করতে চেয়েছি। দেশের বিভিন্ন জেলা থেকে মানুষ এসে ঠাকুরগাঁওয়ে দৌড়েছেন, এখানকার ইতিহাস ও ঐতিহ্য দেখেছেন। এর মাধ্যমে স্বাস্থ্যসচেতনতা বাড়ার পাশাপাশি ঠাকুরগাঁওয়ের পরিচিতিও দেশের বিভিন্ন প্রান্তে ছড়িয়ে পড়বে।’
তিনি আরও বলেন, মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর খেলাধুলার সঙ্গে যুক্ত ছিলেন এবং ক্রীড়ার প্রতি তার আগ্রহ রয়েছে। তার প্রতি সম্মান জানাতেই এবারের হাফ ম্যারাথন তাকে উৎসর্গ করা হয়েছে।

ম্যারাথন উপলক্ষে দেশের বিভিন্ন জেলা থেকে আসা দৌড়বিদদের ঠাকুরগাঁওয়ের ঐতিহ্যবাহী ও দর্শনীয় স্থানগুলো ঘুরিয়ে দেখানো হয়। ২১ কিলোমিটার দৌড়ে প্রথম হওয়া ওমর ফারুক বলেন, দৌড়ের পাশাপাশি জেলার ইতিহাস, ঐতিহ্য ও প্রাকৃতিক সৌন্দর্যের সঙ্গে পরিচিত হওয়ার সুযোগ পেয়েছেন তারা।
ওমর ফারুক আরও বলেন, ‘এই ধরনের আয়োজন তরুণদের মাদক, বিভিন্ন অপকর্ম ও মোবাইলের আসক্তি থেকে দূরে রাখতে পারে। প্রতিটি জেলায় এ ধরনের আয়োজন আরও বেশি করা উচিত।’

অনুষ্ঠানের প্রধান অতিথি ইএসডিওর প্রতিষ্ঠাতা ও নির্বাহী পরিচালক ড. মুহাম্মদ শহীদ উজ জামান নিজেও ম্যারাথনে অংশ নেন। তিনি বলেন, ‘তারুণ্যের উদ্দীপনার জন্য বর্তমান সময়ে এ ধরনের আয়োজন খুবই প্রয়োজন। ছেলে-মেয়েদের মাদক ও অসামাজিক কার্যকলাপ থেকে দূরে রাখতে এবং শারীরিক ও মানসিকভাবে সুস্থ রাখতে খেলাধুলার কোনো বিকল্প নেই।’
তিনি আরও বলেন, ম্যারাথনের মতো আয়োজন তরুণদের সুস্থ জীবনযাপনে উৎসাহিত করার পাশাপাশি দেশের বিভিন্ন এলাকার মানুষের মধ্যে যোগাযোগ ও বন্ধুত্ব বাড়াতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে।
দৌড় প্রতিযোগিতা শেষে অংশগ্রহণকারীদের হাতে পুরস্কার
তুলে দেন ড. মুহাম্মদ শহীদ উজ জামান, মো. নূর-এ-শাহাদৎ স্বজন ও ঠাকুরগাঁওয়ের ক্রীড়া সংগঠক মো. ফারুক হোসেন জুলু। এ সময় ঠাকুরগাঁও প্রেসক্লাবের সাধারণ সম্পাদক ও একাত্তর টেলিভিশনের স্টাফ রিপোর্টার তানভীর তানুসহ বিভিন্ন গণমাধ্যমের সাংবাদিকেরা উপস্থিত ছিলেন।
এর আগে বৃহস্পতিবার সন্ধ্যায় ঠাকুরগাঁও পৌর কমিউনিটি সেন্টারে হাফ ম্যারাথনের অফিসিয়াল কিট এক্সপো অনুষ্ঠিত হয়। এতে প্রধান অতিথি ছিলেন জেলা বিএনপির সভাপতি মির্জা ফয়সল আমিন।
পুরস্কার বিতরণের মধ্য দিয়ে শুক্রবার সকাল ১০টার দিকে শেষ হয় ‘ঠাকুরগাঁও হাফ ম্যারাথন ২০২৬’। অংশগ্রহণকারীদের কাছে এ আয়োজন হয়ে ওঠে সুস্থতা, সম্প্রীতি ও বন্ধুত্বের এক মিলনমেলা।
প্রতিনিধি/এসএস