Dhaka Mail Logo

সারাদেশ

দেশলাই কাঠি ও রেশমি সুতায় দুর্গা, সাতক্ষীরায় প্রতিমা তৈরিতে নতুন চমক

জেলা প্রতিনিধি

২৮ আগস্ট ২০২৬, ১২:৫৭ পিএম

মাটির প্রতিমা তো অনেকেই দেখেছেন। কিন্তু দেশলাই কাঠি ও রেশমি সুতায় তৈরি দেবী দুর্গার প্রতিমা কি কখনো দেখেছেন? শারদীয় দুর্গোৎসবকে সামনে রেখে এমনই এক ব্যতিক্রমী আয়োজন করেছে সাতক্ষীরার সদর উপজেলার ধুলিহর ইউনিয়নের ব্রহ্মরাজপুর সর্বজনীন শ্রীশ্রী দুর্গাপূজা মন্দির। প্রচলিত মাটি, খড় ও বাঁশের কাঠামোর বাইরে এবার প্রতিমার সৌন্দর্য ফুটিয়ে তোলা হচ্ছে দেড় লাখের বেশি দেশলাই কাঠি ও ১০ কেজির বেশি রেশমি সুতার নিখুঁত কারুকাজে।

পূজা শুরু হতে এখনো বেশ কিছুদিন বাকি। এরই মধ্যে ব্যতিক্রমী এই প্রতিমা দেখতে মন্দির প্রাঙ্গণে ভিড় করছেন স্থানীয় মানুষ। কেউ বিস্মিত হয়ে দেখছেন, কেউ মোবাইল ফোনে ছবি ও ভিডিও ধারণ করছেন। আয়োজকদের প্রত্যাশা, পূজার দিনগুলোতে সাতক্ষীরার পাশাপাশি দেশের বিভিন্ন প্রান্ত থেকেও দর্শনার্থীরা আসবেন এই প্রতিমা দেখতে।

মন্দির প্রাঙ্গণে গিয়ে দেখা যায়, প্রতিমাশিল্পীরা দিন-রাত কাজ করছেন। মাটির অবয়বের ওপর একে একে বসানো হচ্ছে দেশলাই কাঠি। এর সঙ্গে করা হচ্ছে রেশমি সুতার কারুকাজ। প্রতিটি অংশে নিখুঁতভাবে কাঠি বসাতে হচ্ছে শিল্পীদের। সামান্য ভুলেও নষ্ট হতে পারে নকশা। তাই প্রতিমাটি তৈরিতে সময় ও শ্রম দুটোই লাগছে বেশি।

c7a6762f-1078-4e8f-a5e5-46733aa42854

প্রতিমাশিল্পী নবদ্বীপ সরকার বলেন, ‘আমরা ২০২৩ সালে ভারতে গিয়ে এ ধরনের কাজ দেখেছিলাম। সেই অভিজ্ঞতা থেকেই এবার সাতক্ষীরায় দেশলাই কাঠি ও রেশমি সুতা দিয়ে ব্যতিক্রমী প্রতিমা তৈরির উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। চারজন শিল্পী দিন-রাত পরিশ্রম করে কাজ করছেন। কখনো কখনো রাত দুইটা-তিনটা পর্যন্ত কাজ করতে হচ্ছে।’

আয়োজকেরা জানান, প্রতিমা তৈরিতে ব্যবহার করা হচ্ছে দেড় লাখের বেশি দেশলাই কাঠি এবং ১০ কেজির বেশি রেশমি সুতা। শুধু প্রতিমা তৈরির কাজেই শিল্পীদের পারিশ্রমিক প্রায় এক লাখ ৩০ হাজার টাকা। সব মিলিয়ে এবারের পূজা আয়োজনে ব্যয় হবে প্রায় পাঁচ লাখ টাকা।

ব্রহ্মরাজপুর সর্বজনীন পূজা উদযাপন কমিটির সহকোষাধ্যক্ষ অমিত ঘোষ বলেন, ‘গত বছর আমরা ধানের প্রতিমা তৈরি করেছিলাম। তখন মোট খরচ হয়েছিল প্রায় তিন লাখ টাকা। এবার দেশলাই কাঠি ও রেশমি সুতা দিয়ে প্রতিমা তৈরি করায় খরচ কিছুটা বেড়েছে। প্রতিমাশিল্পীসহ সবকিছু মিলিয়ে প্রায় পাঁচ লাখ টাকা ব্যয় হবে।’

dfe1ac91-790e-4c89-a4f2-4ed3467bfeb6

ব্যতিক্রমী প্রতিমা তৈরির আয়োজন ব্রহ্মরাজপুরে অবশ্য নতুন নয়। গত বছর ১০০ কেজি চিনিগুঁড়া ধান দিয়ে তৈরি প্রতিমা দেখতে দূর-দূরান্ত থেকে দর্শনার্থীরা এসেছিলেন। সেই সাড়া থেকেই এবার আরও নতুন কিছু করার পরিকল্পনা নেয় পূজা উদযাপন কমিটি।

কমিটির উপদেষ্টা কানাইলাল শাকানু বলেন, ‘গত বছর ধানের প্রতিমা তৈরির পর থেকেই আমাদের চিন্তা ছিল আগামী বছর আরও আকর্ষণীয় কিছু করা হবে। সেই চিন্তা থেকেই এবার দেড় লাখের বেশি দেশলাই কাঠি দিয়ে প্রতিমা তৈরির উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। আমরা মনে করি, সাতক্ষীরায় এমন আয়োজন দর্শনার্থীদের মধ্যে নতুন আগ্রহ তৈরি করবে।’

তবে দেশলাই কাঠি দাহ্য হওয়ায় প্রতিমার নিরাপত্তা নিয়ে প্রশ্ন রয়েছে। আয়োজকেরা বলছেন, এ ঝুঁকি বিবেচনায় নিয়ে প্রতিমায় বিশেষ কেমিক্যাল ব্যবহার করা হচ্ছে। পরীক্ষামূলকভাবে সেটি প্রয়োগ করে দেখাও হয়েছে।

ব্রহ্মরাজপুর সর্বজনীন পূজা উদযাপন কমিটির সভাপতি গৌতম কুমার বিশ্বাস বলেন, ‘প্রতিমাটির দাহ্যতা নিয়ে যে প্রশ্ন উঠছে, সেটিকে আমরা গুরুত্বের সঙ্গে দেখছি। বিশেষ কেমিক্যাল ব্যবহার করে দাহ্যতা কমানোর ব্যবস্থা করা হয়েছে। ভাস্কর ও কমিটির সদস্যদের উপস্থিতিতে এর ট্রায়ালও করা হয়েছে।’

e21e32aa-0d7b-4cbe-9e78-ef559a96d80f

প্রতিমা তৈরির কাজ দেখতে আসা স্থানীয় বাসিন্দাদের মধ্যেও রয়েছে ব্যাপক আগ্রহ। স্থানীয় বাসিন্দা স্বপ্না রানী বলেন, ‘প্রতিবছরই এই মন্দিরে নতুন কিছু করার চেষ্টা থাকে। গত বছর ধানের প্রতিমা দর্শনার্থীদের আকর্ষণ করেছিল। এবার দেশলাই কাঠি ও রেশমি সুতার প্রতিমা আরও বেশি মানুষের আগ্রহ তৈরি করবে বলে আশা করছি।’

আরেক স্থানীয় নারী বলেন, ‘গত বছর ১০০ কেজি চিনিগুঁড়া ধানের প্রতিমা হয়েছিল। এবার দেশলাই কাঠি ও রেশমি সুতার প্রতিমা হচ্ছে। ধর্ম যার যার, উৎসব সবার। আমরা চাই সবাই এখানে আসুক, প্রতিমা দেখুক এবং আনন্দ করুক।’

প্রতিমাশিল্পী নবদ্বীপ সরকার জানান, ২০২৬ সালে তিনি চারটি দুর্গাপ্রতিমা তৈরির কাজ করছেন। এর মধ্যে ব্রহ্মরাজপুরের প্রতিমাটি সবচেয়ে ব্যতিক্রমী। সময়ের সঙ্গে পাল্লা দিয়ে দিন-রাত পরিশ্রম করছেন চার শিল্পী।

এদিকে সাতক্ষীরা জেলাজুড়েও দুর্গাপূজাকে ঘিরে চলছে প্রস্তুতি। বাংলাদেশ পূজা উদযাপন পরিষদ, সাতক্ষীরা জেলা শাখার সাধারণ সম্পাদক বিশ্বনাথ ঘোষ জানান, ২০২৫ সালে জেলায় ৫৮৭টি পূজা অনুষ্ঠিত হয়েছিল। এবারও এর কাছাকাছি বা তার চেয়ে বেশি পূজা হতে পারে বলে তারা ধারণা করছেন।

বিশ্বনাথ ঘোষ বলেন, ‘২০২৫ সালে ব্রহ্মরাজপুরে ধানের প্রতিমা তৈরি করা হয়েছিল। সেখানে ব্যাপক দর্শনার্থীর আগমন ঘটেছিল। এবার দেশলাই কাঠি দিয়ে প্রতিমা তৈরি হচ্ছে। যতটুকু কাজ হয়েছে, তাতে এটি অত্যন্ত দৃষ্টিনন্দন ও নান্দনিক হচ্ছে। আমরা আশা করছি, সাতক্ষীরা ছাড়াও দেশের বিভিন্ন জেলা থেকে এবার দর্শনার্থীরা এখানে আসবেন।’

আয়োজকদের প্রত্যাশা, শারদীয় দুর্গোৎসবের পাঁচ দিনজুড়ে ব্রহ্মরাজপুরের এই মন্দির দর্শনার্থীদের অন্যতম আকর্ষণ হয়ে উঠবে। সাধারণ দেশলাই কাঠি ও রেশমি সুতা দিয়ে তৈরি এই প্রতিমা তাই পূজার আয়োজনের পাশাপাশি স্থানীয় শিল্পভাবনারও একটি ব্যতিক্রমী প্রকাশ হয়ে উঠছে।

প্রতিনিধি/এসএস