Dhaka Mail Logo

সারাদেশ

১৩ বছরে ৬৯০ মানবপাচার মামলা, ৪০০ ভুয়া; দৃশ্যমান বিচার নেই

জেলা প্রতিনিধি

২৮ আগস্ট ২০২৬, ১২:০৮ পিএম

নিশ্চিত বিপদের ঝুঁকি জেনেও অবৈধভাবে সমুদ্রপথে ইতালি যাওয়ার প্রবণতা কমছে না। বাড়ছে প্রাণহানি ও নিখোঁজের ঘটনাও। লিবিয়ায় নিয়ে জিম্মি করে মাফিয়াচক্রের মুক্তিপণ আদায়ের অভিযোগও রয়েছে। সন্তানদের প্রাণ বাঁচাতে নিঃস্ব হচ্ছেন অনেক পরিবার।

মাদারীপুরে গত ১৩ বছরে মানবপাচার প্রতিরোধ আইনে প্রায় ৭০০ মামলা হয়েছে। এসব মামলায় আসামিদের পাশাপাশি ভুক্তভোগীদের চাপে ফেলতে দালালচক্রের পক্ষ থেকে পাল্টা বা মিথ্যা মামলা করার অভিযোগও রয়েছে। মানবপাচার প্রতিরোধে জেলা পুলিশ একটি মনিটরিং সেল গঠন করেছে।

স্বজনেরা জানান, মাদারীপুর সদর উপজেলার পাঁচখোলা ইউনিয়নের জাজিরা গ্রামের মৃত বদর মাতুব্বরের ছেলে আবুলকে সরাসরি ইতালি নেওয়ার প্রলোভন দেখান একই গ্রামের মানবপাচারকারী চক্রের সক্রিয় সদস্য সোনা মিয়া ঘরামী। ২০২৫ সালের ১৭ জুলাই চুক্তি অনুযায়ী ২০ লাখ টাকা দেওয়ার পর আবুলকে ইতালির পরিবর্তে লিবিয়ায় নিয়ে নির্যাতন চালায় মাফিয়াচক্র। পরে পরিবারের কাছ থেকে আরও ২০ লাখ টাকা মুক্তিপণ আদায় করা হয়। গত ২২ দিন ধরে আবুলের কোনো খোঁজ নেই।

fb7f0723-ac34-4e88-ae95-de7ffd91a034

এ ঘটনায় সোনা মিয়া ঘরামীসহ চারজনের বিরুদ্ধে মামলা হলেও এখন পর্যন্ত কোনো আসামি গ্রেফতার হয়নি বলে পরিবারের অভিযোগ।

অন্যদিকে, গোপালগঞ্জের মুকসুদপুর উপজেলার রাঘদী ইউনিয়নের বড়দিয়া গ্রামের আক্কাস ফকিরের ছেলে ইলিয়াস ফকিরের মাধ্যমে লিবিয়ায় গিয়ে জিম্মি হয়েছেন মাদারীপুরের কয়েকজন যুবক। তাদের মধ্যে রয়েছেন বোয়ালিয়া গ্রামের মোক্তার হোসেন ব্যাপারীর ছেলে সামি ব্যাপারী, দক্ষিণ দুধখালীর সুক্কুর আলী ফকিরের ছেলে কামরুজ্জামান ফকির এবং ছোট দুধখালী গ্রামের করিম হাওলাদারের ছেলে ইব্রাহীম হাওলাদার। তারা তিন মাসের বেশি সময় ধরে নিখোঁজ রয়েছেন বলে স্বজনেরা জানান।

dalalal
ব্লেজার পরা ইলিয়াস ফকির ও সোনা মিয়া ঘরামী।

ভুক্তভোগীদের স্বজনেরা ইলিয়াস ফকিরের বিরুদ্ধে মামলা করলেও তিনি এখনো ধরাছোঁয়ার বাইরে বলে অভিযোগ রয়েছে। এদিকে লিবিয়ায় থাকা মাফিয়াচক্রের কাছ থেকে দফায় দফায় হুমকি পাওয়ায় আতঙ্কে রয়েছেন পরিবারের সদস্যরা।

জেলা পুলিশের তথ্য অনুযায়ী, ২০১৩ সাল থেকে এ পর্যন্ত মানবপাচার প্রতিরোধ আইনে ৬৯০টি মামলা হয়েছে। এসব মামলায় ১ হাজার ৩০০ জনকে আসামি করা হয়েছে এবং গ্রেফতার হয়েছেন ৬৫০ জন। জেলা পুলিশের মানবপাচার প্রতিরোধ ও মনিটরিং সেলে বর্তমানে ২৯০টি মামলা তদন্তাধীন রয়েছে। এ ছাড়া সিআইডিতে রয়েছে আরও আটটি মামলা।

f2fd2698-6e74-4a4b-a6ff-eba113d41632

পুলিশের দাবি, দায়ের হওয়া মামলাগুলোর মধ্যে প্রায় ৪০০টি ভুয়া বলে প্রমাণিত হয়েছে। এসব মামলায় আদালতে চূড়ান্ত প্রতিবেদন দিয়ে আসামিদের অব্যাহতির সুপারিশ করা হয়েছে।

নিখোঁজ আবুল হোসেনের মা আনোয়ারা বেগম বলেন, ‘আমার ছেলেকে ইতালি নেওয়ার কথা বলে লিবিয়ায় নিয়ে নির্যাতন চালায় দালালচক্র। আমি আমার আদরের সন্তানকে ফেরত চাই। পাশাপাশি দালালচক্রের কঠিন বিচার চাই।’

ইব্রাহীম হাওলাদারের স্ত্রী শারমিন বেগম বলেন, ‘মাফিয়া ডন ইলিয়াস ফকিরের বিরুদ্ধে মামলা করলেও কোনো প্রতিকার পাচ্ছি না। পুলিশ আসামিদের গ্রেফতার করছে না। উল্টো আসামিরা আমাদের হুমকি দিচ্ছে। আমরা ভয় আর আতঙ্কে আছি।’

ef397c2c-7e2c-4946-a504-28ce6130cbd4

নিখোঁজ কামরুজ্জামান ফকিরের স্ত্রী হ্যাপি আক্তার বলেন, ‘কত স্বপ্ন ছিল ইতালি গিয়ে টাকা রোজগার করে পরিবারের স্বচ্ছলতা ফেরাবে। কিন্তু সেই স্বপ্ন দালালচক্র শেষ করে দিয়েছে। আমরা দালালচক্রের কঠিন বিচার চাই। আর আমার স্বামীকে দেশে ফেরত চাই।’

মাদারীপুরের মানবপাচার প্রতিরোধ ও মনিটরিং সেলের প্রধান ও সহকারী পুলিশ সুপার বিমল চন্দ্র বর্মণ বলেন, ‘প্রতিটি মানবপাচার মামলা গুরুত্ব সহকারে দেখছে পুলিশ। মানবপাচারকারীদের বিরুদ্ধে মামলা হলে মাফিয়াচক্র উল্টো বাদীকে চাপে ফেলতে পাল্টা মামলা করে। সবকিছু বিবেচনা করেই জেলা পুলিশ কাজ করে যাচ্ছে।’

তিনি বলেন, ‘অপরাধীদের আইনের আওতায় আনতে মানবপাচার প্রতিরোধ ও মনিটরিং সেল গঠন করা হয়েছে। এই সেলের কাজ শুরু হয়েছে এ ধরনের অপরাধ কমিয়ে আনা।’

প্রতিনিধি/এসএস