Dhaka Mail Logo

সারাদেশ

সাংবাদিকদের ওপর হামলার পর চাঁদাবাজির অভিযোগ তুললেন বিএনপি নেতা

জেলা প্রতিনিধি

২৮ আগস্ট ২০২৬, ০১:০৩ এএম

শরীয়তপুরে তিন সাংবাদিককে মারধর ও কয়েকজন সাংবাদিককে হুমকি দেওয়ার অভিযোগের মধ্যে এবার সাংবাদিকদের বিরুদ্ধে চাঁদাবাজির অভিযোগ করেছেন জেলা বিএনপির যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক আরিফুজ্জামান মোল্লা। বুধবার রাতে পালং মডেল থানায় কয়েকজন সাংবাদিকের বিরুদ্ধে লিখিত অভিযোগ দেন তিনি।

অন্যদিকে হামলার শিকার সাংবাদিকদের পক্ষ থেকেও থানায় লিখিত অভিযোগ দেওয়া হয়েছে। তবে অভিযোগ দেওয়ার প্রায় ২৪ ঘণ্টা পার হলেও তা মামলা বা সাধারণ ডায়েরি (জিডি) হিসেবে নথিভুক্ত হয়নি বলে অভিযোগ করেছেন সাংবাদিকেরা। এ ঘটনায় জেলার সাংবাদিকদের মধ্যে উদ্বেগ ও নিরাপত্তাহীনতা তৈরি হয়েছে।

পালং মডেল থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) শাহ আলম বলেন, তিন সাংবাদিককে মারধরের ঘটনায় সাংবাদিক বরকত মোল্লা তাঁর অনুপস্থিতিতে থানায় লিখিত অভিযোগ দিয়েছেন। পরে বিএনপি নেতা আরিফুজ্জামান মোল্লাও কয়েকজন সাংবাদিকের বিরুদ্ধে চাঁদাবাজির অভিযোগ এনে লিখিত অভিযোগ দেন। দুটি অভিযোগই খতিয়ে দেখা হচ্ছে। অভিযোগের সত্যতা পাওয়া গেলে মামলা নথিভুক্ত করা হবে।

যেভাবে বিরোধের সূত্রপাত

গত শনিবার রাতে কোনো লিখিত নোটিশ না দিয়ে শরীয়তপুর প্রেসক্লাবের সীমানাপ্রাচীর ভেঙে ফেলার ঘটনা নিয়ে সাংবাদিকদের সঙ্গে জেলা প্রশাসনের বিরোধের সূত্রপাত হয়।

এ ঘটনার প্রতিবাদে সময় টেলিভিশনের সাংবাদিক বিএম ইসরাফিল ফেসবুকে প্রেসক্লাবের সভাপতি আবুল হোসেন ও জেলা প্রশাসক তাহসিনা বেগমের ছবি ব্যবহার করে প্রতিবাদ জানান। এর পরদিন রোববার সকালে তাঁর ওপর হামলার ঘটনা ঘটে। এতে তাঁর ডান হাতের কবজি ভেঙে যায় বলে অভিযোগ করা হয়েছে।

হামলার প্রতিবাদ এবং প্রেসক্লাবের সীমানাপ্রাচীর ভেঙে ফেলার ঘটনায় রোববার বিকেলে জেলা প্রশাসকের কার্যালয়ের সামনে বিক্ষোভ মিছিল ও মানববন্ধন করেন সাংবাদিকেরা। কর্মসূচি চলাকালে জেলা প্রশাসক ওই স্থান দিয়ে যাওয়ার সময় সাংবাদিকেরা তাঁকে ঘিরে ধরে তাঁর প্রত্যাহারের দাবিতে বিক্ষোভ করেন।

সাংবাদিকদের এই কর্মসূচির পর বিএনপির একটি পক্ষ তাঁদের ওপর ক্ষুব্ধ হয় বলে সাংবাদিকদের অভিযোগ। এরপর সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে প্রেসক্লাব ও কয়েকজন সাংবাদিককে নিয়ে সমালোচনা শুরু হয়।

তিন সাংবাদিককে মারধরের অভিযোগ

এর ধারাবাহিকতায় মঙ্গলবার শরীয়তপুর জেলার সর্বস্তরের জনগণের ব্যানারে জেলা প্রশাসকের কার্যালয়ের সামনে সাংবাদিকদের বিরুদ্ধে বিক্ষোভ মিছিল ও সমাবেশ অনুষ্ঠিত হয়। এতে বিএনপির জেলা পর্যায়ের কয়েকজন নেতা উপস্থিত ছিলেন।

সাংবাদিকদের অভিযোগ, ওই কর্মসূচিতে পেশাগত দায়িত্ব পালন করতে গেলে নিউজ টুয়েন্টিফোর টেলিভিশন, জাগো নিউজ ও খবরের কাগজের প্রতিনিধি বিধান মজুমদার অনি, দ্য ডেইলি স্টারের শরীয়তপুর ও মাদারীপুর জেলা প্রতিনিধি জাহিদ হাসান রনি এবং দৈনিক এদিন ও মানবকণ্ঠের প্রতিনিধি বরকত উল্লাহকে মারধর করা হয়।

ভুক্তভোগীদের অভিযোগ, জেলা বিএনপির যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক ও যুবদলের সাবেক সভাপতি আরিফুজ্জামান মোল্লা, জেলা স্বেচ্ছাসেবক দলের সভাপতি আমিনুর রহমান ওরফে আমানসহ কয়েকজন তাঁদের ওপর হামলা করেন।

মারধরের পর ওই দিন বিকেলে আরিফুজ্জামান মোল্লা আরও কয়েকজন সাংবাদিককে মুঠোফোনে হুমকি দেন বলেও অভিযোগ রয়েছে।

জাজিরা উপজেলা প্রেসক্লাবের সভাপতি ও সোনালী নিউজের শরীয়তপুর প্রতিনিধি পলাশ খানের দাবি, তাঁকে মুঠোফোনে দেওয়া হুমকির একটি অডিও রেকর্ড সাংবাদিকদের কাছে রয়েছে। ওই অডিওতে সাংবাদিকদের মারধরের হুমকি এবং তাঁদের তালিকায় থাকার কথা বলতে শোনা যায় বলে সাংবাদিকেরা দাবি করেছেন।

পাল্টাপাল্টি অভিযোগ

রোববার সকালে হামলার শিকার সময় টেলিভিশনের সাংবাদিক বিএম ইসরাফিল পালং মডেল থানায় মামলা করেন। ওই মামলার আসামি পলাশ সরদার পরে ইসরাফিলের বিরুদ্ধে পাল্টা মামলা করেন। দুটি মামলায় এখন পর্যন্ত কাউকে গ্রেপ্তার করা হয়নি।

বুধবার সন্ধ্যায় মানবকণ্ঠ ও দৈনিক এদিনের প্রতিনিধি বরকত মোল্লা থানায় লিখিত অভিযোগ দেন। এতে আরিফুজ্জামান মোল্লা, জেলা স্বেচ্ছাসেবক দলের সভাপতি আমিনুর রহমান ওরফে আমান এবং যুবলীগের কর্মী রুবেল মাদবরের নাম উল্লেখ করা হয়েছে।

এ ছাড়া আরও দুজন সাংবাদিক সাধারণ ডায়েরির জন্য থানায় লিখিত আবেদন করেছেন বলে জানা গেছে।

ভুক্তভোগী সাংবাদিক বরকত মোল্লার অভিযোগ, মামলা করার জন্য থানায় গেলে ওসি তাঁদের এড়িয়ে থানা থেকে বের হয়ে যান। পরে ফোন করেও তাঁর সঙ্গে যোগাযোগ করা সম্ভব হয়নি। পুলিশ সুপারকেও ফোনে পাওয়া যায়নি বলে দাবি করেন তিনি।

বরকত মোল্লা বলেন, দীর্ঘ সময় থানায় অপেক্ষা করে দায়িত্বপ্রাপ্ত কর্মকর্তার কাছে লিখিত অভিযোগ দিয়ে আসতে হয়েছে। পুলিশ কোনো সহযোগিতা করছে না। অন্যদিকে বিএনপির নেতা-কর্মীরা তাঁকেসহ অন্য সাংবাদিকদের ভয় দেখাচ্ছেন।

নিরাপত্তাহীনতায় সাংবাদিকেরা

এখন টিভির শরীয়তপুর প্রতিনিধি কাজী মনিরুজ্জামান বলেন, বিনা নোটিশে প্রেসক্লাবের সীমানাপ্রাচীর ভেঙে ফেলার ঘটনাকে কেন্দ্র করে জেলা প্রশাসনের সঙ্গে সাংবাদিকদের বিরোধের সৃষ্টি হয়। পরে সাংবাদিকদের ওপর হামলা এবং তাঁদের বিরুদ্ধে বিএনপির একটি পক্ষের বিক্ষোভের ঘটনা ঘটে।

তিনি বলেন, তিন সাংবাদিককে মারধর করা হয়েছে। এরপর অব্যাহতভাবে সাংবাদিকদের হুমকি দেওয়া হচ্ছে। শরীয়তপুরে কর্মরত সাংবাদিকেরা এখন নিরাপত্তাহীনতায় ভুগছেন।

শরীয়তপুর প্রেসক্লাবের সাধারণ সম্পাদক নুরুল আমিন বলেন, সাংবাদিকদের ওপর হামলা, হুমকি এবং প্রেসক্লাবের সীমানাপ্রাচীর ভেঙে ফেলার ঘটনাগুলো অত্যন্ত উদ্বেগজনক। পেশাগত দায়িত্ব পালন করতে গিয়ে সাংবাদিকেরা কোনোভাবেই হামলা, হুমকি বা হয়রানির শিকার হতে পারেন না।

তিনি বলেন, সাংবাদিকদের ওপর হামলার ঘটনায় থানায় লিখিত অভিযোগ দেওয়ার পরও মামলা না হওয়ায় সাংবাদিকদের মধ্যে উদ্বেগ তৈরি হয়েছে।

বিএনপির বক্তব্য

শরীয়তপুর জেলা বিএনপির সহসভাপতি সিরাজুল হক মোল্লা বলেন, ফ্যাসিস্টদের কিছু দোসর সাংবাদিকতার আড়ালে মব সৃষ্টি করে জেলা প্রশাসকের সঙ্গে অশোভন আচরণ করেছেন। রাষ্ট্রের একজন গুরুত্বপূর্ণ প্রতিনিধির সঙ্গে এমন আচরণের প্রতিবাদ সাধারণ মানুষের সঙ্গে বিএনপিও করেছে।

তবে বিএনপির কোনো নেতা সাংবাদিকদের মারধর করেছেন, এমন তথ্য তাঁদের কাছে নেই বলে দাবি করেন তিনি।

সিরাজুল হক মোল্লার ভাষ্য, একজন নেতা রাগের মাথায় একজন সাংবাদিককে কিছু উল্টাপাল্টা কথা বলেছেন, যা অনাকাঙ্ক্ষিত ও দুঃখজনক। এ ঘটনার তদন্ত করে তাঁর বিরুদ্ধে সাংগঠনিক ব্যবস্থা নেওয়া হবে।

এদিকে সাংবাদিকদের বিরুদ্ধে করা চাঁদাবাজির অভিযোগ এবং সাংবাদিকদের পক্ষ থেকে করা হামলা-হুমকির অভিযোগ—দুটিই তদন্ত করে পরবর্তী আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হবে বলে জানিয়েছে পুলিশ।

প্রতিনিধি/এআর