জেলা প্রতিনিধি
২৭ আগস্ট ২০২৬, ১০:৫১ এএম
একটি সময় ছিল, যখন চাষাবাদের জন্য গরু-লাঙ্গলের হাল ছাড়া জমি প্রস্তুতের কথা কল্পনাই করা যেত না। কিন্তু কালের আবর্তে সেই চিরচেনা চিত্র আজ হারাতে বসেছে। তা সত্ত্বেও বাংলার ঐতিহ্যবাহী এই চাষাবাদের কিছু অবশিষ্টাংশ এখনো টিকে আছে পটুয়াখালীর বিভিন্ন অঞ্চলে।
সেকালে সকাল হতেই গৃহবধূরা এক হাতে খাবারের গামলা আর অন্য হাতে পানির পাত্র নিয়ে মেঠোপথ ধরে ছুটে চলতেন হালচাষির কাছে। কৃষকরা কাকডাকা ভোর থেকেই মাঠের প্রান্তরে হালচাষ করতেন, কেউ বা ব্যস্ত থাকতেন বীজ বপনে। একজোড়া গরু বা মহিষ এবং একজন কৃষকের সমন্বয়ে লাঙ্গল ও মই দিয়ে জমি প্রস্তুতের সেই দৃশ্য এখন রূপকথার গল্পের মতো শোনায়।

বর্তমানে আধুনিকতার ছোঁয়া ও যান্ত্রিকীকরণের যুগে ট্রাক্টর বা পাওয়ার টিলারের মাধ্যমেই বেশির ভাগ জমি চাষ করা হয়। তবে ব্যতিক্রমও রয়েছে। নিচু ও নরম জমিতে ভারী ট্রাক্টর কাদায় দেবে যাওয়ার ভয়ে অনেক কৃষক আজও লাঙ্গল দিয়েই জমি চাষ করছেন। আধুনিক যন্ত্রের সঙ্গে পাল্লা দিয়ে টিকতে না পেরে গ্রামবাংলার এই ঐতিহ্য আজ হারিয়ে যাওয়ার উপক্রম। ট্রাক্টর ও পাওয়ার টিলারের আগমনে গরু দিয়ে হালচাষ প্রায় উঠেই গেছে, আর গ্রামীণ সমাজের অনেকেই ছেড়ে দিয়েছেন গরু পালন।
এরই মাঝেও বাপ-দাদার স্মৃতি আঁকড়ে ধরে পটুয়াখালীর গলাচিপা উপজেলার আমখোলা মাঠে দেখা মেলে ঐতিহ্যবাহী গরুর লাঙল দিয়ে জমি চাষের এক অন্যরকম দৃশ্য। সেখানকার বাউরিয়া গ্রামের পেশাদার হালচাষি মো. রফিক হাওলাদার এখনো ধরে রেখেছেন পূর্বপুরুষের এই পেশা।
তিনি জানান, হালচাষের জন্য এক জোড়া গরু, লাঙল-জোয়াল, মই, ছড়ি এবং গরুর মুখের টোনা প্রয়োজন হয়। গরুর লাঙল মাটির গভীরে গিয়ে মাটি উল্টে দেয়, ফলে ওপরের মাটি নিচে এবং নিচের মাটি ওপরে চলে আসে। এতে জমিতে ঘাস কম জন্মায়। এছাড়া চাষের সময় গরুর গোবর জমিতেই পড়ে, যা জৈব সারের চাহিদা পূরণের পাশাপাশি ফসলের ফলন ভালো করতে সাহায্য করে।

মো. রফিক আরও বলেন, এক জোড়া গরু দিয়ে প্রতিদিন প্রায় তিন থেকে চার বিঘা জমি চাষ করি। এলাকার ১৭-২০টি গ্রামের মধ্যে আমি একাই এখন পেশাদার হালচাষি। তবে ট্রাক্টর ও পাওয়ার টিলারের প্রচলন হওয়ায় গরু দিয়ে হালচাষের কদর কমেছে। কম সময়ে বেশি জমি চাষ করা যাওয়ায় জমির মালিকরা এখন যন্ত্রের দিকে ঝুঁকছেন। একসময় যারা গরু দিয়ে হালচাষ করে জীবিকা নির্বাহ করতেন, তারা পেশা বদল করেছেন। তবে বর্তমানে জ্বালানি তেলের দাম বৃদ্ধির কারণে কেউ কেউ আবার পুরোনো এই পদ্ধতিতে ফিরছেন।
একই এলাকার প্রবীণ কৃষক ফোরকান মিয়া বলেন, আমাদের এলাকায় অনেক নরম ভেজা কিংবা ছোট উঁচু-নিচু জমি রয়েছে, যেখানে ট্রাক্টর বা পাওয়ার টিলার চালানো সম্ভব হয় না। এসব জমিতে লাঙল-গরুর হালই একমাত্র ভরসা। তাছাড়া গরুর হাল জমির অনেক গভীরে যায়, যা উর্বরতার জন্য খুবই উপকারী।
আরও পড়ুন
স্মৃতিচারণ করে এই প্রবীণ কৃষক বলেন, এখনকার মতো সুযোগ-সুবিধা তখন ছিল না। আধুনিক সব মেশিনের ভিড়ে গরু-লাঙ্গলের হাল আজ বিলুপ্তির পথে। বাপ-দাদার ঐতিহ্য ও ভালোবাসার টানেই আমি এখনো এই পেশা ধরে রেখেছি। সেকালে গরু, মহিষ, লাঙ্গল ও জোয়াল ছিল কৃষকদের সবচেয়ে বড় আশীর্বাদ।
প্রতিনিধি/টিবি