জেলা প্রতিনিধি
২৬ আগস্ট ২০২৬, ১১:৪৬ এএম
অভাবের সংসারে সচ্ছলতা ফেরাতে প্রবাসে যাওয়ার স্বপ্ন দেখেছিলেন ঝিনাইদহের কালীগঞ্জের রাজন হোসেন (২২)। নির্মাণশ্রমিকের কাজের কথা বলে তাকে রাশিয়ায় পাঠানো হলেও শেষ পর্যন্ত যোগ দিতে হয় রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধে। যুদ্ধের প্রথম দিনেই ড্রোন হামলায় আহত হয়ে কোমরের নিচ থেকে শক্তি হারান তিনি। চার দিনে প্রায় চার কিলোমিটার পথ বুকের ওপর ভর দিয়ে পাড়ি দিয়ে রাশিয়ার নিয়ন্ত্রণাধীন ইউক্রেনের একটি হাসপাতালে আশ্রয় নেন। পরে চিকিৎসা ও দূতাবাসের সহায়তায় সম্প্রতি দেশে ফিরেছেন তিনি।
রাজন হোসেন কালীগঞ্জ উপজেলার গয়েশপুর গ্রামের আব্দুল কাদেরের ছেলে।
রাজন বলেন, গত ৭ মে বাংলাদেশ থেকে বিমানে মস্কো যান তিনি। সেখান থেকে আরও ২৯ বাংলাদেশির সঙ্গে বাসে করে তাদের ওরেনবার্গে নেওয়া হয়। সেখানে তিন-চার দিন একটি হোটেলে রাখা হয়। ব্যাংক কার্ড ও সিম কার্ড দেওয়ার কথা বলে তাদের দিয়ে বিভিন্ন কাগজে স্বাক্ষর করিয়ে নেওয়া হয়।
পরে কাজের কথা বলে তাদের একটি সেনা ক্যাম্পে নেওয়া হয়। সেখানে একদিন রাখার পর বিষয়টি বুঝতে পেরে তারা যুদ্ধে যেতে অস্বীকৃতি জানান। রাজনের ভাষ্য, ঈগর ও জুলিয়া নামের রাশিয়ার একটি কোম্পানির দুই কর্মকর্তার কাছে ৩০ জন কাকুতি-মিনতি করেও কোনো লাভ হয়নি। পরে তাদের সেনাবাহিনীর গাড়িতে করে একটি বাংকারে নেওয়া হয়। সেখানে প্রায় এক ঘণ্টা রাখার পর তাদের কয়েকটি দলে ভাগ করা হয়।

রাজন বলেন, তিনি ছয়জনের একটি দলে ছিলেন। তাদের রাশিয়ার সেনাবাহিনীর পোশাক, অস্ত্রসহ যুদ্ধের সরঞ্জাম দেওয়া হয়। ২১ দিনের প্রশিক্ষণ শেষে তাদের ফ্রন্টলাইনে পাঠানো হয়।
রাজনের ভাষ্য, যুদ্ধের প্রথম দিনেই ড্রোন হামলায় ১৭ জন বাংলাদেশি নিহত হন। সেদিন একটি ড্রোন তার কোমর বরাবর আঘাত করলে তিনি মাটিতে লুটিয়ে পড়েন। এরপর কোমরের নিচের অংশে আর শক্তি পাচ্ছিলেন না। দাঁড়ানোর ক্ষমতাও হারান।
তিনি বলেন, ‘চার দিনে চার কিলোমিটার পথ বুকের ওপর ভর দিয়ে অতিক্রম করে রাশিয়ার নিয়ন্ত্রণাধীন ইউক্রেনের একটি হাসপাতালে পৌঁছাই। এর মধ্যে দুই রুশ সেনার কাছে পানি চাইলেও তারা দেয়নি। পরে ফিরে আসায় ক্যাম্পের কমান্ডার আমাকে মারধর করেন।’
রাজন বলেন, ‘উপরে ড্রোন, নিচে মাইন আর সামনে ইউক্রেনের সেনা—কী যে ভয়াবহ অবস্থা, তা বোঝানো যাবে না।’
তিনি জানান, ওই হাসপাতালে চিকিৎসার ব্যবস্থা ভালো ছিল না। পরে তাকে রাশিয়ার একটি হাসপাতালে নেওয়া হয়। সেখানে চিকিৎসাধীন অবস্থায় ১৫ দিন পর একজন চিকিৎসক তাকে বাংলাদেশ দূতাবাসে নিয়ে যান। পরে ২১ আগস্ট ট্রাভেল পাস নিয়ে এবং পরিবারের পাঠানো ৬২ হাজার রুবল দিয়ে টিকিট কেটে ইথিওপিয়ান এয়ারলাইনসের একটি ফ্লাইটে দেশে ফেরেন তিনি।
রাজন আরও বলেন, বাংলাদেশের জাবাল-ই-নূর রিক্রুটিং এজেন্সির মাধ্যমে তাকে রাশিয়ায় পাঠানো হয়েছিল।

রাজনের বাবা আব্দুল কাদের বলেন, ‘ধারদেনা করে একতারপুর গ্রামের লেন্টু হোসেনকে ৮ লাখ ৩০ হাজার টাকা দিয়েছিলাম। তিন বছর ঘুরিয়ে গত মে মাসে শ্রমিকের কাজের কথা বলে আমার ছেলেকে প্রতারণা করে রাশিয়ায় যুদ্ধে পাঠানো হয়েছে। আমার ছেলে যুদ্ধে আহত হয়ে দেশে ফিরেছে। তাকে চিকিৎসা করানোর মতো অর্থ এখন আমার কাছে নেই। যারা আমার ছেলের সঙ্গে এমন করেছে, তাদের শাস্তি চাই।’
রাজনের মা মাহফুজ বেগম বলেন, ‘আমার দুই ছেলে ও এক মেয়ে। সংসারের অভাবের কারণে বড় ছেলেকে বিদেশে পাঠিয়েছিলাম। কিন্তু আমার সেই সুস্থ ছেলে এখন হাঁটতে পারে না। অন্যের কাছে সাহায্য চেয়ে দিন কাটছে। কীভাবে সংসার চালাব, সেই দুশ্চিন্তায় আছি।’
কলেজশিক্ষক মুসা করিম বলেন, ধারদেনা করে ছেলেকে বিদেশে পাঠিয়েছিলেন আব্দুল কাদের। কিন্তু দালালের খপ্পরে পড়ে পরিবারটি সর্বস্বান্ত হয়েছে। তারা খুব অসহায় হয়ে পড়েছেন। এসব দালালকে দ্রুত আইনের আওতায় আনার দাবি জানান তিনি।
অভিযোগের বিষয়ে লেন্টু হোসেন বলেন, তার ভাগ্নে সোহেলের মাধ্যমে রাজনকে পাঠানো হয়েছিল। তিনি কোনো প্রতারণা করেননি বলে দাবি করেন। রাজনকে সরকারিভাবে রাশিয়ায় পাঠানো হয়েছে বলেও দাবি করেন তিনি।
কালীগঞ্জ উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা রেজওয়ানা নাহিদ বলেন, দালালের খপ্পরে পড়ে যেন কেউ এমন প্রতারণার শিকার না হন, সে বিষয়ে সবাইকে সচেতন হতে হবে। রাশিয়া থেকে ফিরে আসা রাজনের পাশে উপজেলা প্রশাসন থাকবে বলেও জানান তিনি।
প্রতিনিধি/এসএস