জেলা প্রতিনিধি
২৫ আগস্ট ২০২৬, ০৬:১৯ পিএম
শরীয়তপুরে জেলা প্রশাসকের কার্যালয়ের সামনে পেশাগত দায়িত্ব পালনকালে তিন সাংবাদিকের ওপর হামলা, মারধর, মোবাইল ফোন ও পরিচয়পত্র ছিনিয়ে নেওয়ার অভিযোগ উঠেছে। পাশাপাশি লেখালেখি করলে পিটানোর হুমকিও দিয়েছেন স্থানীয় যুবদল নেতা।
মঙ্গলবার (২৫ আগস্ট) সকাল ১০টার দিকে জেলা প্রশাসকের কার্যালয়ের সামনে সাংবাদিকদের ওপর হামলার ঘটনা ঘটে। এ ঘটনায় সাংবাদিকদের মধ্যে ক্ষোভ ও উদ্বেগ দেখা দিয়েছে।
হামলার শিকার সাংবাদিকরা হলেন- নিউজ টুয়েন্টিফোর টেলিভিশন ও জাগো নিউজের বিধান মজুমদার অনি, দ্য ডেইলি স্টারের শরীয়তপুর ও মাদারীপুর প্রতিনিধি জাহিদ হাসান রনি এবং দৈনিক এদিনের জেলা প্রতিনিধি বরকত উল্লাহ।
ভুক্তভোগী সাংবাদিক ও প্রত্যক্ষদর্শীদের ভাষ্য, সম্প্রতি কোনো লিখিত নোটিশ না দিয়ে শরীয়তপুর প্রেসক্লাবের সীমানা প্রাচীর ভেঙে দেওয়ার অভিযোগ ওঠে জেলা প্রশাসনের বিরুদ্ধে। এর প্রতিবাদে রোববার প্রেসক্লাবের সাংবাদিকরা জেলা প্রশাসকের কার্যালয়ের সামনে মানববন্ধন ও বিক্ষোভ করেন।
এরই ধারাবাহিকতায় মঙ্গলবার সকালে জেলা প্রশাসকের বিরুদ্ধে ‘মব সৃষ্টিকারী’ অভিযোগ তুলে বিএনপি ও অঙ্গ-সহযোগী সংগঠনের নেতাকর্মীদের একটি অংশ জেলা প্রশাসকের কার্যালয়ের সামনে বিক্ষোভ মিছিল করে। ওই কর্মসূচির সংবাদ সংগ্রহ করতে গেলে প্রথমে বিধান মজুমদার অনির ওপর হামলা চালানো হয় বলে অভিযোগ।
এই সাংবাদিক বলেন, ‘পেশাগত দায়িত্ব পালনকালে আমার ওপর অতর্কিতভাবে হামলা চালানো হয়। কয়েকজনের সহযোগিতায় কোনোমতে ঘটনাস্থল থেকে সরে আসি। আমি এ ঘটনার বিচার চাই।’
এর কিছুক্ষণ পর সংবাদ সংগ্রহের সময় জাহিদ হাসান রনি ও বরকত উল্লাহর ওপরও হামলা চালানো হয় বলে অভিযোগ। তার মুঠোফোন ও পরিচয়পত্র ছিনিয়ে নিয়ে ধারণ করা ফুটেজ মুছে ফেলতে বাধ্য করা হয় বলেও তিনি অভিযোগ করেন।
জাহিদ হাসান রনি বলেন, ‘জেলা যুবদলের সাবেক সভাপতি আরিফুজ্জামান মোল্লাসহ বেশ কয়েকজন আমাকে মারধর করে। পরে আমার পরিচয়পত্র ও মোবাইল ফোন ছিনিয়ে নিয়ে ফুটেজ ডিলিট করতে বাধ্য করে।’
অন্যদিকে বরকত উল্লাহর অভিযোগ, জেলা যুবদলের সাবেক সভাপতি আরিফুজ্জামান মোল্লা তাকে উদ্দেশ করে বলেন, ‘ও সাংবাদিক, ওকে ধর।’ এরপর তার নেতৃত্বে স্বেচ্ছাসেবক দলের আমান মাদবরসহ কয়েকজন তার ওপর হামলা চালান।
বরকত উল্লাহ বলেন, ‘তারা আমাকে কিল, ঘুষি ও লাথি মারেন। একপর্যায়ে স্থানীয় লোকজন আমাকে উদ্ধার করে শরীয়তপুর সদর হাসপাতালে নিয়ে যান। হামলার সময় আমাকে মেরে ফেলার হুমকিও দেওয়া হয়। বর্তমানে আমি নিরাপত্তাহীনতা ও শঙ্কার মধ্যে রয়েছি।’
ঘটনার বিষয়ে জানতে যুবদলের সাবেক সভাপতি আরিফুজ্জামান মোল্লার সঙ্গে মুঠোফোনে যোগাযোগ করা হলে তিনি এক সংবাদকর্মীর সঙ্গে উত্তেজিত ও হুমকিমূলক আচরণ করেন।
তিনি বলেন, ‘অনেকেই লিস্টে আছে, সন্ধ্যার পর খবর পেয়ে যাবে। তুমি নিজেও তৈরি থাকো ইনশাআল্লাহ, তোমরা লেখবা আর আমরা তোমাদের পিটাবো।’
অভিযোগের বিষয়ে জেলা স্বেচ্ছাসেবক দলের সভাপতি আমিনুর রহমান আমান বলেন, ‘একজন ব্যক্তিকে দেখেছি কয়েকজনকে ধাক্কাধাক্কি করতে। আমরা জানতাম না তিনি সাংবাদিক।’ এর বেশি কিছু বলতে তিনি অপারগতা প্রকাশ করেন।
এ বিষয়ে শরীয়তপুর জেলা বিএনপির সহসভাপতি শাহ মোহাম্মদ আব্দুস সালাম বলেন, ‘সাংবাদিকেরা জেলা প্রশাসকের সঙ্গে অন্যায় আচরণ করেছেন। তারা এভাবে তার প্রত্যাহার চাইতে পারেন না।’
তিনি বলেন, সাংবাদিকতার আড়ালে কিছু সন্ত্রাসী ও ফ্যাসিবাদের দোসর বিএনপির সরকারের ভাবমূর্তি ক্ষুণ্ন করার জন্য এমন কাজ করেছেন বলে দাবি করেন তিনি। তবে সেখানে কোনো সাংবাদিক নিগৃহীত বা মারধরের শিকার হয়েছেন কি না, তা তার জানা নেই বলে জানান।
ঘটনার পর স্থানীয়রা আহত সাংবাদিকদের উদ্ধার করে শরীয়তপুর সদর হাসপাতালে নিয়ে যান। সেখানে তারা প্রাথমিক চিকিৎসা নেন।
শরীয়তপুর জেলা প্রেসক্লাবের সভাপতি আবুল হোসেন সরদার সাংবাদিকদের ওপর হামলার তীব্র নিন্দা ও প্রতিবাদ জানিয়েছেন।
তিনি বলেন, পেশাগত দায়িত্ব পালনকালে সাংবাদিকদের ওপর হামলা কোনোভাবেই গ্রহণযোগ্য নয়। ঘটনার সুষ্ঠু তদন্ত করে জড়িতদের আইনের আওতায় এনে বিচারের দাবি জানান তিনি।
শরীয়তপুরের অতিরিক্ত পুলিশ সুপার (ক্রাইম অ্যান্ড অপস) তানভীর হোসেন বলেন, গণমাধ্যমকর্মীদের মাধ্যমে বিষয়টি ইতোমধ্যে জানতে পেরেছেন তারা। এ ঘটনায় লিখিত অভিযোগ পেলে তদন্ত সাপেক্ষে আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
সাংবাদিকদের ওপর হামলার ঘটনায় স্থানীয় সাংবাদিকদের মধ্যে ক্ষোভ বিরাজ করছে। তারা পেশাগত দায়িত্ব পালনের সময় সাংবাদিকদের নিরাপত্তা নিশ্চিত এবং হামলার ঘটনায় জড়িতদের বিরুদ্ধে আইনানুগ ব্যবস্থা নেওয়ার দাবি জানিয়েছেন।
প্রতিনিধি/এএইচ