Dhaka Mail Logo

সারাদেশ

গাজীপুর সিটির মশক নিধনে ১০ কোটি, সুফল পাচ্ছে না এলাকাবাসী

জেলা প্রতিনিধি

২৫ আগস্ট ২০২৬, ০২:১২ পিএম

গাজীপুরে প্রতিদিনই বাড়ছে ডেঙ্গু রোগীর সংখ্যা। ডেঙ্গু মশক নিধনে গাজীপুর সিটি করপোরেশনের বরাদ্দ ১০ কোটি টাকা হলেও সুফল পাচ্ছে না এলাকাবাসী। গত ২৪ ঘণ্টায় শহীদ তাজউদ্দীন আহমদ মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে ডেঙ্গু আক্রান্ত হয়ে চিকিৎসাধীন আছেন ১২৭ জন। প্রতিদিনই হাসপাতালে ভর্তি হচ্ছেন নতুন নতুন রোগী। তবে হাসপাতালে বেড সংকটের কারনে চিকিৎসা পেতে ভোগান্তির শিকার হচ্ছেন রোগীরা।

এছাড়া মশক নিধনে গাজীপুর সিটি করপোরেশনে ১০ কোটি টাকা বরাদ্দ থাকলেও ডেঙ্গু প্রতিরোধে তাদের কোনো বিশেষ পদক্ষেপ নেই। মশা নিধনে নিয়মিত কাজের অংশ হিসেবে কিছু নালা নর্দমা পরিষ্কার ও নামমাত্র সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে প্রচারণাতেই সীমাবদ্ধ তারা। এ নিয়ে ক্ষোভ জানিয়েছেন নগরবাসী।

গাজীপুর সিভিল সার্জন অফিসের তথ্যানুযায়ী, গাজীপুরের ডেঙ্গু আক্রান্তের সংখ্যা সবচেয়ে বেশি মহানগরীর টঙ্গী এলাকায়। এছাড়া কড্ডা, কোনাবাড়ী, গাজীপুর সদর এবং শ্রীপুর উপজেলায় রয়েছে ডেঙ্গুর প্রাদুর্ভাব।

তাদের দেওয়া তথ্য মতে, গত শনিবার পর্যন্ত গাজীপুরের সরকারি ও বেসরকারি হাসপাতালগুলিতে ৫২২ জন লোক ডেঙ্গু রোগের লক্ষণ নিয়ে পরীক্ষা-নিরীক্ষা করে। এর মধ্যে ডেঙ্গু পজেটিভ রোগীর সংখ্যা হচ্ছে ৮৪ জন।

এছাড়া শহীদ তাজউদ্দীন আহমদ মেডিকেল কলেজ হাসপাতালেও বেড়েছে ডেঙ্গু আক্রান্ত রোগীর চাপ। নারী, শিশুসহ বিভিন্ন বয়সী মানুষ ডেঙ্গু আক্রান্ত হচ্ছেন। প্রতিদিনিই গাজীপুরে ডেঙ্গু রোগীর সংখ্যা বৃদ্ধি পাওয়ায় উদ্বেগ দেখা দিয়েছে সাধারণ মানুষের মধ্যে।

শহীদ তাজউদ্দীন আহমদ মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল সূত্রে জানা গেছে, চলতি বছর এ হাসপাতালে ডেঙ্গু আক্রান্ত হয়ে ভর্তি হন ৯৩৯ জন। উন্নত চিকিৎসার জন্য স্থানান্তর করা হয় ৮২ জনকে। মারা গেছেন একজন রোগী, হাসপাতাল থেকে ছাড়া পেয়েছেন ৭৭৫ জন।

গত ২৪ ঘণ্টায় নতুন ডেঙ্গু আক্রান্ত রোগী ভর্তি হন ৩৫ জন। মোট ভর্তি রোগী ১২৭ জন। চিকিৎসা নিয়ে বাসায় ফিরে গেছেন ২৭ জন এবং উন্নত চিকিৎসার জন্য ৩ জনকে রেফার্ড করা হয়েছে।

এদিকে, ডেঙ্গু রোগীর সংখ্যা প্রতিদিন বাড়তে থাকলেও হাসপাতালে বেডের সংখ্যা সে অনুযায়ী বাড়েনি। ফলে বেডের সংকট থাকায় অনেক রোগীকেই থাকতে হচ্ছে ওয়ার্ডের মেঝেতে। হাসপাতালের মেডিসিন বিভাগে ডেঙ্গু রোগীর জন্য ৪৮টি বেড বরাদ্দ আছে। আর শিশু বিভাগে আছে মাত্র ৮টি বেড। তবে হাসপাতালে বেডের সংখ্যা কম থাকায় ডেঙ্গু ওয়ার্ডের বেড ছাড়িয়ে মেঝেতেও চিকিৎসা নিতে হচ্ছে রোগীদের। ডেঙ্গু ওয়ার্ডে বেড পাওয়া নিয়েও উঠেছে গুরুতর অভিযোগ।

রোগী ও স্বজনদের দাবি, দালালদের ও হাসপাতালের স্টাফদের মাধ্যমে টাকা দিলেই মিলছে কাঙ্ক্ষিত বেড। এছাড়া হাসপাতালে ভর্তি থেকেও ডেঙ্গু সচেতনতার নিয়ম মানছেন না অনেক রোগী। মশারি ছাড়াই থাকছেন আক্রান্তরা। অথচ ডেঙ্গু আক্রান্ত রোগীদের জন্য সবচেয়ে জরুরি মশারির ব্যবহার ও মশার সংস্পর্শ এড়িয়ে চলা। কিন্তু বাস্তব চিত্র যেন একেবারেই ভিন্ন। ডেঙ্গু আক্রান্ত হয়েও মশারি ছাড়াই হাসপাতালের বিছানায় থাকছেন অনেক রোগী।

শহীদ তাজউদ্দীন আহমদ মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের আবাসিক চিকিৎসক (মেডিসিন) ডা. শেখ কামরুল করিম জানান, বর্ষাকালে সাধারণত ডেঙ্গু রোগীর সংখ্যা বাড়ে। অন্যান্য বছর জুন, ‍জুলাই এ ডেঙ্গুর রোগী বেশি থাকলেও এবার ডেঙ্গুর প্রাদুর্ভাব আগস্ট মাস থেকে বেড়ে গেছে। ডেঙ্গু রোগীর ক্ষেত্রে স্পেসিফিক কোনো ম্যানেজমেন্ট নেই, সিমটোমেটিক চিকিৎসা করা হয়। যেটা সমস্যা সেটার সমাধান করা। পারটিকুলারলি আমরা ফ্লুইড দিয়ে থাকি। নরমাল স্যালাইন, খাবার স্যালাইন ও জ্বরের জন্য প্যারাসিটামল দেওয়া হয়। ডেঙ্গুর চিকিৎসার চেয়ে বড় কথা হল ডেঙ্গু প্রতিরোধ করা। যে রোগীর ডেঙ্গু হয়েছে, তার থেকে যেন আর কারো ডেঙ্গু না হয়। সেই জন্য আমরা সব ডেঙ্গু রোগীকে মশারির নিচে থাকতে বলি। যাতে তাকে কামড়িয়ে অন্য সাধারণ রোগীকে কামড়াতে না পারে।

তিনি বলেন, ডেঙ্গু রোগীর চিকিৎসার জন্য যেসব সরঞ্জাম দরকার যেমন পর্যাপ্ত মশারি ও স্যালাইনের সাপ্লাই আছে। প্যারাসিটামল আছে। অধিকাংশ ওষুধ আমাদের এখান থেকেই পেয়ে থাকে।

ডেঙ্গু প্রতিরোধে সিটি করপোরেশনের কার্যক্রম নিয়েও রয়েছে নানা প্রশ্ন। চলতি বাজেটে মশক নিধনের জন্য ১০ কোটি টাকা বরাদ্দ থাকলেও শুধুমাত্র ডেঙ্গু প্রতিরোধে সুনির্দিষ্ট কোনো পদক্ষেপ নিচ্ছে না সিটি কর্তৃপক্ষ।

ডেঙ্গু রোগী ও স্বজনদের অভিযোগ, নামমাত্র ফগিং করেই দায় সারছে সংশ্লিষ্টরা। নগরীর বিভিন্ন স্থানে জমে থাকা পানি, অপরিচ্ছন্ন ড্রেন ও ময়লা-আবর্জনা যেন বাড়িয়ে দিচ্ছে এডিস মশার প্রজননের সুযোগ। ডেঙ্গু আক্রান্তের সংখ্যা বাড়লেও রোগীদের সচেতনতা এবং মশক নিধন কার্যক্রম নিয়ে রয়েছে নানা প্রশ্ন।

ডেঙ্গু প্রতিরোধে সিটি করপোরেশন কর্তৃপক্ষ কোনো কার্যকর পদক্ষেপ এখনো পর্যন্ত নেয়নি।

 

সিটি করপোরেশনের অতিরিক্ত প্রধান প্রকৌশলী সুদীপ বসাক জানান, চলতি অর্থবছরে মশক নিধনের জন্য কর্তৃপক্ষ ১০ কোটি টাকার বাজেট বরাদ্দ রেখেছেন। মশক নিধনের জন্য সবসময়ই নানা ধরনের কাজ চলমান রয়েছে। এর মধ্যে নালা পরিষ্কার, সচেতনতা বৃদ্ধির জন্য ফেসবুকসহ সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে প্রচারণা ও পেস্টিসাইড ছিটানো অন্যতম।

তবে সিটি করপোরেশনের এসব কাজে নগরবাসী অসন্তোষ প্রকাশ করেছেন। রাস্তাঘাটে ময়লা পানি জমে থাকে। ওই পানিতে এডিস মশার লার্ভা উৎপন্ন হয় এবং মানুষ ডেঙ্গুতে আক্রান্ত হয়।

নাওজোড় এলাকার বাসিন্দা খোরশেদ জানান, এ বছর এলাকায় মশক নিধনের জন্য কোনো ওষুধ ছিটানো হয়নি। এ কারণে মশার উপদ্রব বেড়ে গিয়ে ডেঙ্গু রোগীর সংখ্যা বাড়ছে।

মহানগরীর কড্ডা থেকে হাসপাতালে ভর্তি নাসিমা বেগম নামের এক গৃহবধূ জানান, ডেঙ্গু আক্রান্ত হয়ে হাসপাতালে ভর্তি আছেন তিনি। সিটি করপোরেশন তার এলাকায় কোনো ধরনের ওষুধ দেয়নি। ফলে ছেলেমেয়ে নিয়ে শঙ্কায় আছেন।

গাজীপুর সিটি করপোরেশনের প্রশাসক শওকত হোসেন সরকার জানান, দেশের বিভিন্ন জায়গায় মশাবাহিত রোগ হচ্ছে। শুধু গাজীপুর বা ঢাকায় হচ্ছে তেমন না। কোনো অঞ্চলে একটু বেড়ে যাচ্ছে, আবার নিয়ন্ত্রণে আছে। আমরা এটাকে নিয়ন্ত্রণে রাখার জন্য চেষ্টা করতেছি।

প্রতিনিধি/টিবি