Dhaka Mail Logo

সারাদেশ

রাতে ‘জীবন বাজি রেখে’ চলা নওগাঁর সেই ভয়ংকর সড়ক এখন ‘ডাকাতমুক্ত’

২৫ আগস্ট ২০২৬, ০৮:২২ এএম

নওগাঁর সাপাহার-চাঁপাইনবাবগঞ্জ আঞ্চলিক সড়কের ২২ কিলোমিটার অংশ কিছুদিন আগেও ছিল আতঙ্কের নাম। সন্ধ্যা নামলেই নেমে আসত শুনশান নীরবতা। সড়কের বাঁকে বাঁকে ও নির্জন স্থানে ঘাপটি মেরে থাকত ডাকাত ও ছিনতাইকারী চক্র। চালক ও যাত্রীদের কাছে রাতের এই পথ পাড়ি দেওয়া ছিল অনেকটা জীবন বাজি রাখার মতো।

তবে গত সাত মাসে বদলে গেছে সেই চিত্র। পুলিশের সাঁড়াশি অভিযান, চেকপোস্ট, নিয়মিত টহল ও নজরদারিতে সড়ক ডাকাতি এখন প্রায় শূন্যের কোঠায়। দীর্ঘদিনের আতঙ্ক কাটিয়ে রাতেও স্বাভাবিকভাবে চলাচল করছেন দূরপাল্লার যানবাহনের চালক ও যাত্রীরা। ব্যবসা-বাণিজ্যেও ফিরেছে স্বস্তি।

স্থানীয় বাসিন্দাদের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, গত বছরের ডিসেম্বরেও পোরশা উপজেলার বেজোড়া বাজারে একসঙ্গে ২০টি দোকানে ডাকাতি ও ভাঙচুরের ঘটনা ঘটে। ওই ঘটনার পর সন্ধ্যা পেরোলেই দোকান খোলা রাখাও ঝুঁকিপূর্ণ হয়ে পড়ে। তবে বর্তমানে পরিস্থিতি অনেকটাই বদলে গেছে।

পুলিশের তথ্যানুযায়ী, ২০২৫ সালে নওগাঁর এসব সড়কে ডাকাতির ঘটনায় ১৬টি মামলা নথিভুক্ত হয়। ২০২৬ সালের প্রথম আট মাসে আগস্ট পর্যন্ত মামলা হয়েছে মাত্র চারটি। এর মধ্যে ফেব্রুয়ারির পর থেকে এখন পর্যন্ত ৭ মাসে নতুন করে কোনো সড়ক ডাকাতির ঘটনা ঘটেনি। একই সময়ে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর অভিযানে অন্তত ৪৬ জন পেশাদার ডাকাত ও অপরাধী গ্রেফতার হয়েছেন।

সম্প্রতি রাতে সড়কটি ঘুরে দেখা যায়, সাপাহার-চাঁপাইনবাবগঞ্জ আঞ্চলিক সড়কের দুই পাশে রয়েছে ঝোপঝাড়, জঙ্গল ও আমবাগান। আগে এসব নির্জন স্থানেই ডাকাতরা ঘাপটি মেরে থাকত। বর্তমানে ঝুঁকিপূর্ণ এসব এলাকায় বসানো হয়েছে পুলিশি চেকপোস্ট। গুরুত্বপূর্ণ ছয়টি পয়েন্টে সোলার লাইটের আলোয় চলছে সন্দেহভাজন যানবাহন ও ব্যক্তিদের তল্লাশি।

রাতে দূরপাল্লার ও যাত্রীবাহী গাড়িগুলোকে নির্দিষ্ট স্থানে একত্র করা হয়। এরপর পুলিশের টহল দল স্কট দিয়ে গাড়িগুলোকে নিরাপদে গন্তব্যে পৌঁছে দেয়। পাশাপাশি একটি স্থানে পুলিশ ফাঁড়ি স্থাপন করা হয়েছে। এসব উদ্যোগে অপরাধীদের চলাচল অনেকটাই নিয়ন্ত্রণে এসেছে।

চাঁপাইনবাবগঞ্জের রহনপুর থেকে পণ্য নিয়ে সৈয়দপুরগামী পিকআপচালক দেলোয়ার হোসেন বলেন, ‘সাত-আট মাস আগেও সন্ধ্যার পর এ রাস্তায় গাড়ি চালাতে হাত-পা কাঁপত। এখন পুলিশ স্কট দিয়ে পার করে দেয়। কোনো ভয় কাজ করে না।’

একই অনুভূতির কথা জানান সিএনজি চালক মোহাম্মদ মাহমুদ হোসেনও। তিনি বলেন, ‘গভীর রাতে রাজশাহী থেকে মুমূর্ষু রোগী নিয়ে যাতায়াতের সময় আগে চরম নিরাপত্তাহীনতায় ভুগতাম। এখন পুলিশ চেকপোস্টে কয়েকটি গাড়ি একসঙ্গে করে নিরাপদে পার করে দেয়। তাই মাঝরাতেও স্বাচ্ছন্দ্যে গাড়ি চালাতে পারি।’

noagon-2
পুলিশের টহল জোরদারের কারণে স্বস্তি ফিরেছে জনমনে।

বেজোড়া বাজারের ইলেকট্রিক ব্যবসায়ী বুলবুল ইসলাম বলেন, ‘আগে ডাকাতদের আতঙ্কে সন্ধ্যা ৭টার মধ্যেই দোকানপাট বন্ধ করতে হতো। এখন পুলিশ নিয়মিত ডিউটি করায় রাত ১০-১১টা পর্যন্ত নির্ভয়ে ব্যবসা করছি।’

একই বাজারের সেলুন ব্যবসায়ী মোহাম্মদ লালন বলেন, ‘ক্যাশ বাক্সের নিরাপত্তাহীনতা কেটে যাওয়ায় এখন আর রাতে দোকান চুরি বা ডাকাতির চিন্তায় ঘুম নষ্ট হয় না।’

পোরশা থানা পুলিশের উপ-পরিদর্শক (এসআই) অমিত কুমার দাস জানান, ‘ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের নির্দেশে সীমানার ঝুঁকিপূর্ণ অংশে ছয়টি চেকপোস্টের মাধ্যমে যানবাহন পারাপার নিশ্চিত করা হচ্ছে, যা অপরাধপ্রবণতা কমিয়ে নিয়ে এনেছে।’

নওগাঁর পুলিশ সুপার মোহাম্মদ তারিকুল ইসলাম জানান, ‘দায়িত্ব নেওয়ার পরই এই রোডের অপরাধের ধরণ স্টাডি করে ধাপে ধাপে পদক্ষেপ নেওয়া হয়। পোরশা থানায় জনবল, লজিস্টিক ও গাড়ি বাড়ানোর পাশাপাশি পূর্বের ডাকাতদের চিহ্নিত করে গ্রেফতারে বিশেষ দল গঠন করা হয়। কয়েকটি ধাপে কাজ করার পর দেখা গেছে গত ৬-৭ মাসে এই সড়কে আর কোনো ডাকাতি হয়নি।’

পুলিশ সুপার আরো বলেন, ‘জনগণের নিরাপত্তা নিশ্চিত করাই আমাদের প্রথম অগ্রাধিকার। অপরাধীদের শেকড় উপড়ে ফেলতে আমরা প্রতিটি কৌশলগত পয়েন্টে নজরদারি জোরদার করেছি। এই ধারাবাহিক অভিযান এবং টহল ব্যবস্থা ভবিষ্যতেও অব্যাহত থাকবে, যেন কোনো অপরাধী চক্র মাথা চাড়া দিয়ে উঠতে না পারে। আমরা এই সড়কে ডাকাতির অধ্যায় স্থায়ীভাবে বন্ধ করতে বদ্ধপরিকর।’

প্রতিনিধি/এমআর