জেলা প্রতিনিধি
২৪ আগস্ট ২০২৬, ১০:১১ পিএম
নড়াইল সদর উপজেলার আর.বি.এফ.এম ভবানীপুর মাধ্যমিক বিদ্যালয়ের মুমিন হাওলাদার (১৩) নামে এক সপ্তম শ্রেণির শিক্ষার্থীকে শ্রেণীকক্ষে আটকে মারধরের অভিযোগ উঠেছে।
অভিযুক্তরা হলেন- বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক মো. শরিফুল ইসলাম, সহকারী শিক্ষক নুরুজ্জামান নান্নু ও ইসরাফিল হোসেন।
এ ঘটনায় রোববার (২৩ আগস্ট) নড়াইল সদর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) টি এম রাহসিন কবির স্বাক্ষরিত এক অফিস আদেশে ৫ সদস্যবিশিষ্ট তদন্ত কমিটি গঠন করা হয়েছে।
তদন্ত কমিটির সদস্যরা হলেন- নড়াইল সদর উপজেলা সহকারী কমিশনার (ভূমি), উপজেলা মাধ্যমিক শিক্ষা অফিসার নড়াইল সদর, উপজেলা একাডেমিক সুপারভাইজার উপজেলা মাধ্যমিক শিক্ষা অফিস নড়াইল সদর, নড়াইল সদর থানা পুলিশের ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তার (ওসি) প্রতিনিধি এবং সাধারণ সম্পাদক প্রেসক্লাব, নড়াইল।
উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তার স্বাক্ষরিত অফিস আদেশে গঠিত তদন্ত কমিটিকে সরেজমিনে তদন্ত করে আগামী ৩ কর্মদিবসের মধ্যে সুপারিশসহ প্রতিবেদন পাঠাতে বলা হয়েছে।
স্থানীয় ও পারিবারিক সূত্রে জানা গেছে, মুমিনের বাবা মারা গেছেন এবং তার মা অন্যত্র বিয়ে করায় ছোটবেলা থেকেই সে দাদির কাছে থাকছে। ছোটবেলায় একটি দুর্ঘটনায় তার মাথায় ৩২টি সেলাই দেওয়া হয়েছিল। এরপর থেকেই সে শারীরিকভাবে দুর্বল। মারধরের পর ওই শিক্ষার্থী অসুস্থ হয়ে পড়লে তাকে প্রথমে নড়াইল জেলা হাসপাতালে নেওয়া হয়। পরে চিকিৎসকের পরামর্শে যশোরে সিটি স্ক্যান করানো হয়। বর্তমানে সে খুলনায় চিকিৎসাধীন।
ভুক্তভোগী মুমিন হাওলাদার অভিযোগ করে জানায়, বুধবার (১৯ আগস্ট) সকাল ১০টার দিকে বিদ্যালয়ে ষষ্ঠ শ্রেণির কক্ষে কয়েকজন শিক্ষার্থীর মধ্যে মারামারি হচ্ছিল। সে বিষয়টি দেখতে সেখানে গেলে শিক্ষকরা তাকে ধরে ক্লাসরুমে নিয়ে যান। সেখানে প্রধান শিক্ষক শরিফুল ইসলাম, সহকারী শিক্ষক নুরুজ্জামান নান্নু ও ইসরাফিল হোসেন তাকে মারধর করেন। এ সময় স্যারেরা দেয়ালের সাথে মাথায় আঘাত করা, চুল ধরে টানা এবং বেত দিয়ে পেটান।
মুমিন আরও জানায়, মারধরের পর তার মাথায় তীব্র ব্যথা শুরু হয়। সে ঠিকমতো কথা বলতে পারছিল না, কিছুক্ষণ পরপর অচেতন হয়ে পড়েছিল এবং বমি করেছিল। পরে তাকে নড়াইল জেলা হাসপাতালে নেওয়া হলে চিকিৎসক দ্রুত সিটি স্ক্যান করানোর জন্য যশোরে পাঠান। সিটি স্ক্যান শেষে তাকে আবার নড়াইল জেলা হাসপাতালে ভর্তি করা হয়।
ওই দিন ঘটনার সময় মুমিনের সাথে থাকা সপ্তম শ্রেণির এক শিক্ষার্থী দাবি করে, মারামারির পর শিক্ষকরা তাদের ক্লাসরুমে ডেকে নিয়ে সবাইকে মারধর করেন। তবে মুমিনকে তুলনামূলক কম মারা হয় বলে জানায় সে।
ঘটনার বিষয়ে বিদ্যালয়ে সরেজমিনে গেলে অভিযুক্ত প্রধান শিক্ষক মো. শরিফুল ইসলামকে পাওয়া যায়নি।
তবে মারধরের অভিযোগ অস্বীকার করেছেন অভিযুক্ত দুই সহকারী শিক্ষক। সহকারী শিক্ষক নুরুজ্জামান নান্নু বলেন, সপ্তম শ্রেণির কয়েকজন শিক্ষার্থী ষষ্ঠ শ্রেণির এক শিক্ষার্থীকে মারধর করছে, এমন অভিযোগ পেয়ে তারা ঘটনাস্থলে যান। সেখানে মুমিনসহ ছয়-সাতজন শিক্ষার্থীকে দেখতে পান। পরে তাদের সরিয়ে এনে জিজ্ঞাসাবাদ করা হলেও কোনো শিক্ষার্থীকে মারধর করা হয়নি বলে দাবি করেন তিনি।
বিষয়টি বিদ্যালয় পরিচালনা কমিটি ও অভিভাবকদের জানিয়ে বৈঠকের মাধ্যমে সমাধান করা হয় বলেও জানান তিনি।
অভিযুক্ত সহকারী শিক্ষক ইসরাফিল হোসেনও মারধরের অভিযোগ অস্বীকার করে বলেন, মুমিনসহ কয়েকজন শিক্ষার্থী ষষ্ঠ শ্রেণির এক শিক্ষার্থীকে মারধর করেছিল। পরে তাদের প্রধান শিক্ষকের কক্ষে ডেকে অভিভাবকদের বিষয়টি জানানো হয়। অভিভাবকরা দুঃখ প্রকাশ করেন। তবে কোনো শিক্ষার্থীকে মারধর করা হয়নি।
এদিকে হাসপাতালে চিকিৎসাধীন মুমিন হাওলাদারকে দেখতে যান নড়াইলের অতিরিক্ত জেলা ম্যাজিস্ট্রেট লিংকন বিশ্বাস ও সদর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা টি এম রাহসিন কবির। তারা তার চিকিৎসার খোঁজ-খবর নেন এবং ঘটনার বিষয়ে তার কাছ থেকে বিস্তারিত শোনেন।
নড়াইলের অতিরিক্ত জেলা ম্যাজিস্ট্রেট লিংকন বিশ্বাস বলেন, খবর পেয়ে তারা হাসপাতালে গিয়ে ভুক্তভোগী শিক্ষার্থীর সাথে কথা বলেছেন। বিষয়টি তদন্তে একটি কমিটি গঠন করা হয়েছে। তদন্তে অভিযোগের সত্যতা পাওয়া গেলে আইন অনুযায়ী ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
প্রতিনিধি/এলএ