জেলা প্রতিনিধি
২৪ আগস্ট ২০২৬, ০৬:৪৫ পিএম
ব্রাহ্মণবাড়িয়া শহরের মাদক নিরাময় কেন্দ্র ‘প্রয়াসে’ এক রোগীর মৃত্যু ঘটনায় নিরাময়কেন্দ্রের নির্বাহী পরিচালককে (ইডি) প্রধান করে সাতজনের নামে আদালতে হত্যা মামলা হয়েছে। মামলায় অজ্ঞাতনামা আরও ৪-৫ জনকে আসামি করা হয়েছে।
সোমবার (২৪ আগস্ট) নিহতের বাবা আব্দুর রশিদ ব্রাহ্মণবাড়িয়ার সিনিয়র জুডিশিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট আদালতে এই মামলা করেন।
সিনিয়র জুডিসিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট আফনান সুমী এ ঘটনায় অপমৃত্যুর মামলা ও সাধারণ ডায়েরি হয়েছে কিনা যাচাইসহ তদন্ত করে প্রতিবেদন দিতে সদর থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তাকে (ওসি) নির্দেশ দিয়েছেন।
মামলায় শহরের ফুলবাড়িয়া বাসস্ট্যান্ড সংলগ্ন এলাকার একটি তিন তলা ভবনে অবস্থিত 'প্রয়াস' নামে মাদকাসক্তদের চিকিৎসা ও পুনর্বাসন কেন্দ্রের প্রতিষ্ঠাতা ও নির্বাহী পরিচালক মো. ইকরামুল হক ওরফে রুবেলকে প্রধান আসামি করা হয়েছে।
মামলার অন্য আসামিরা হলেন- মাদক নিরাময় কেন্দ্রের পরিচালক নরসিংদীর প্রমোদ কুমার বর্মন, সহযোগী জেলা শহরের কান্দিপাড়ার রিয়াদ আহমদ ওরফে রকসি, সাথি, আরিফ, সাকিব ও শাহরিয়ার। মামলায় অজ্ঞাতনামা আরও ৪-৫ জনকে আসামি করা হয়েছে।
মারা যাওয়া ফোরকান জেলার নবীনগর উপজেলার নাটঘর ইউনিয়নের কুড়িঘর গ্রামের বাসিন্দা। তিনি কাতারপ্রবাসী ছিলেন। গত ছয় মাস আগে কাতার থেকে ছুটিতে দেশে আসেন। দেশে আসার দুই মাস পর তিনি মাদকাসক্ত হয়ে পড়েন।
গত ১৮ আগস্ট রাতে ওই মাদক নিরাময় কেন্দ্রের পরিচালকদের বিরুদ্ধে সেখানে চিকিৎসাধীন রোগী মো. ফোরকানকে পিটিয়ে হত্যার অভিযোগ ওঠে। পরদিন ১৯ আগস্ট দুপুরে এলাকার লোকজন সেখানে ভাঙচুর চালালে নিরাময় কেন্দ্রে থাকা ৪০ জন রোগী একসঙ্গে পালিয়ে যান। এ ঘটনায় সদর থানায় একটি অপমৃত্যুর মামলা হয়।
মামলার এজাহার সূত্রে জানা গেছে, মাদকাসক্ত হয়ে পড়লে গত ১২ আগস্ট মো. ফোরকান মিয়াকে চিকিৎসার জন্য 'প্রয়াস' মাদকাসক্তদের চিকিৎসা ও পুনর্বাসন কেন্দ্রে তিন মাসের জন্য ভর্তি করানো হয়। চিকিৎসার ৭০ হাজার টাকার মধ্যে মাদক নিরাময় কেন্দ্রের মালিক ইকরামুল হক ও পরিচালক প্রমোদ কুমার বর্মনকে ভর্তির সময় ২০ হাজার টাকা দেওয়া হয়। বাকি ৫০ হাজার টাকা এক মাসের মধ্যে পরিশোধের বিষয়ে আলোচনা হয়।
ভর্তির পরদিন ফোরকান বিভিন্ন লোকের মাধ্যমে তার বাবাকে জানান যে, নিরাময় কেন্দ্রের লোকজন তাকে মারাত্মকভাবে মারধর করে। ঘটনার সত্যতা যাচাইয়ে ফোরকানকে দেখতে ফলমূল নিয়ে গত ১৪ আগস্ট মাদক নিরাময় কেন্দ্রে যান ভাগিনা মো. আশ্রাফ। সেসময় অফিস কক্ষে ফোরকান দৌঁড়ে এসে চিৎকার দিয়ে মারধরের কথা ভাগিনাকে জানান। তাকে ভেতরে নিয়ে যেতে মামলার অন্যান্য আসামিদের নির্দেশ দেন ইকরামুল হক। অন্য আসামিরা এলোপাথারিভাবে মারধর করে ভেতরে নিয়ে তার ওপর অমানুষিক নির্যাতন করে। ফোরকানের চিৎকার শুনে ইকরামুলের কাছে নির্যাতনের কারণ জানতে চান ভাগিনা আশ্রাফ। শারীরিক নির্যাতন না করলে নেশা দূর হবে না বলে জানান ইকরামুল।
পরে মামলার বাদী জানতে পারেন যে, গত ১৮ আগস্ট রাত আটটা থেকে ১২টার মধ্যে ফোরকানকে আসামিরা পরিকল্পিতভাবে দফায় দফায় মারধর করে। এক পর্যায়ে নিরাময় কেন্দ্রের মেঝেতে শুয়াইয়ে দুই হাতে দুইজন চেপে ধরে এবং দুইজন দুই দুই পা দুই দিকে টেনে ধরে রাখে। সেসময় অন্য একজন আসামি ফোরকানের অণ্ডকোষে চাপ দিতে থাকে।
পরক্ষণে আরেক আসামি বেত দিয়ে তার গোপনাঙ্গে আঘাত করে এবং আরেকজন বুকের উপর উঠে ঝুঁকি দেয়। এক পর্যায়ে মুখ দিয়ে রক্ত বের হলে ফোরকান অচেতন হয়ে পড়েন। এতে ঘটনাস্থলেই তার মৃত্যু হয়।
জ্ঞান না ফেরায় নিরাময় কেন্দ্রের লোকজন ব্রাহ্মণবাড়িয়া জেনারেল হসপাতালে নিয়ে গেলে চিকিৎসক তাকে মৃত ঘোষণা করেন। নির্যাতন করার দৃশ্য দেখে এবং ফোরকানের মৃত্যুর সংবাদ শুনে অন্য চিকিৎসাধীন মাদকাসক্ত রোগীরা আতঙ্কিত হয়ে নিরাময় কেন্দ্রের জানালা ভেঙে পালিয়ে যান। ঘটনার পর থেকে আসামিরা পলাতক রয়েছে এবং মাদক নিরাময় কেন্দ্রটি বন্ধ আছে।
আসামিরা অত্যন্ত প্রভাবশালী হওয়ায় ফোরকান হত্যার বিষয়টি ধামাচাপা দেওয়ার জন্য চেষ্টা চলছে। নিহতের সুরতহাল প্রতিবেদন আসামিদের ইচ্ছা অনুযায়ী তৈরি করা হয়েছে বলে মামলার এজাহারে উল্লেখ করা হয়।
২০১৪ সালের ৯ আগস্ট শহরের কান্দিপাড়ার আতিকুল ইসলাম ওরফে শাকিল (৩০) নামে এক যুবককে হত্যার পর লাশ ব্রাহ্মণবাড়িয়া জেনারেল হাসপাতালের বারান্দায় রেখে যাওয়ার অভিযোগ আছে ওই নিরাময় কেন্দ্রের বিরুদ্ধে। এ ঘটনায় মামলাও হয়েছে।
প্রতিনিধি/এলএ