Dhaka Mail Logo

সারাদেশ

ভারতে জাহাজডুবি, নিখোঁজ সাতক্ষীরার মেরিন ইঞ্জিনিয়ার মামুন

জেলা প্রতিনিধি

২৪ আগস্ট ২০২৬, ০২:২৬ পিএম

ভারতের ওডিশা উপকূলের কাছে বঙ্গোপসাগরে পানামার পতাকাবাহী পণ্যবাহী জাহাজ এমভি ওশান উইনার ডুবে যাওয়ার পর থেকে নিখোঁজ রয়েছেন বাংলাদেশি মেরিন ইঞ্জিনিয়ার মো. আবদুল্লাহ আল মামুন। জাহাজডুবির পর তার সঙ্গে আর যোগাযোগ করতে পারেনি পরিবার। ভারতীয় কোস্টগার্ড ও নৌবাহিনীর উদ্ধার অভিযানের দিকে তাকিয়ে উৎকণ্ঠায় দিন কাটছে স্বজনদের।

ভারতীয় কোস্টগার্ড ও আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যমের তথ্য অনুযায়ী, ২২ আগস্ট বঙ্গোপসাগরে জাহাজটির সঙ্গে যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন হয়। পরে জাহাজটি ডুবে যায়। এতে ২৪ জন ক্রু ছিলেন। তাদের মধ্যে ২০ জন চীনের, ৩ জন মিয়ানমারের ও একজন বাংলাদেশের নাগরিক। জাহাজডুবির পর এখন পর্যন্ত দুজনকে জীবিত উদ্ধার করা হয়েছে। বাকি ২২ জনের সন্ধানে অভিযান চলছে।

86c54461-4023-4e7c-bdf8-8be0e5b03c76

মামুনের বাড়ি সাতক্ষীরা সদর উপজেলার শহরের গণমুখী মাঠসংলগ্ন এলাকায়। সোমবার দুপুরে তার বাড়িতে গিয়ে স্বজনদের উৎকণ্ঠিত দেখা যায়। কেউ মুঠোফোনে যোগাযোগের চেষ্টা করছেন, কেউ আবার নিয়োগকারী প্রতিষ্ঠান ও সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের কাছ থেকে নতুন তথ্যের অপেক্ষায় রয়েছেন।

মামুনের বড় ভাই আব্দুল্লাহ আল বাকি বলেন, তার ছোট ভাইয়ের ডাকনাম মানিক। তিনি মেরিন ইঞ্জিনিয়ার হিসেবে জাহাজে কর্মরত। প্রায় চার মাস সমুদ্রে দায়িত্ব পালনের পর ভারতের ওডিশা থেকে সিঙ্গাপুরগামী এমভি ওশান উইনার-এ ছিলেন তিনি।

আব্দুল্লাহ আল বাকি বলেন, ‘গত বুধবার আমার ভাইয়ের সঙ্গে অনলাইনে সর্বশেষ কথা হয়েছে। তার স্ত্রীর সঙ্গে বৃহস্পতিবার কথা হয়েছিল। এরপর শুক্রবার জাহাজটি লৌহ আকরিক নিয়ে সিঙ্গাপুরের উদ্দেশে রওনা হয়। পরে জাহাজটি দুর্ঘটনার শিকার হওয়ার খবর পাই।’

36bfe78c-7748-41fe-a561-49810559e8be

জাহাজটির ২৪ জন ক্রুর মধ্যে মামুনই একমাত্র বাংলাদেশি। দুর্ঘটনার পর দুজনকে জীবিত উদ্ধারের খবর পাওয়া গেলেও তাদের কেউ বাংলাদেশি নন। ভারতীয় কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে, উদ্ধার হওয়া দুজন চীনের নাগরিক।

আব্দুল্লাহ আল বাকি বলেন, নিয়োগকারী প্রতিষ্ঠান ও সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের সঙ্গে তারা নিয়মিত যোগাযোগ করছেন। তবে এখন পর্যন্ত মামুনের অবস্থান সম্পর্কে নিশ্চিত কোনো তথ্য পাননি তারা।

0cbf550a-2ed9-4a21-ad21-c2f444ec5066

তিনি বলেন, ‘আমরা সরকারের কাছে অনুরোধ করছি, ভারতীয় কোস্টগার্ড ও নৌবাহিনীর সঙ্গে সমন্বয় করে যেন আমার ভাইয়ের বিষয়ে দ্রুত সঠিক তথ্য জানানো হয় এবং উদ্ধার অভিযান আরও জোরদার করা হয়।’

পরিবারের সদস্যরা জানান, মামুনের মা দীর্ঘদিন ধরে হৃদ্‌রোগে ভুগছেন। ছেলের নিখোঁজ হওয়ার খবর পাওয়ার পর তিনি অসুস্থ হয়ে পড়েছেন। তার স্ত্রী ও সন্তানদের মধ্যেও উৎকণ্ঠা বিরাজ করছে।

মামুনের বোন কান্নাজড়িত কণ্ঠে বলেন, ‘তিন দিন ধরে আমরা ভাইয়ার সঙ্গে কোনো যোগাযোগ করতে পারছি না। তিনি কোথায় আছেন, কেমন আছেন—কিছুই জানি না। আমরা দ্রুত তার একটি খবর চাই।’

মামুনের মেজ ভাই আব্দুল্লাহ আল মাহমুদ বলেন, ‘আমরা আমার ভাইকে সুস্থ অবস্থায় ফিরে পেতে চাই। সরকারের কাছে আমরা সঠিক তথ্য চাই। আল্লাহ যেন তাকে সুস্থভাবে আমাদের মাঝে ফিরিয়ে দেন।’

আরও পড়ুন

ছুটিতে বাড়ি গিয়ে সড়কে প্রাণ হারালেন আনসার সদস্য

মামুনের চাচাও উদ্ধার অভিযান জোরদারের দাবি জানিয়েছেন। তিনি বলেন, জাহাজডুবির খবর পাওয়ার পর থেকেই পরিবার ও স্বজনেরা উৎকণ্ঠায় রয়েছেন। জীবিত কারও সন্ধান পাওয়া গেলে দ্রুত সেই তথ্য পরিবারকে জানানোর অনুরোধ করেন তিনি।

ভারতীয় সংবাদমাধ্যমের তথ্য অনুযায়ী, এমভি ওশান উইনার ওডিশার পারাদ্বীপ বন্দর থেকে লৌহ আকরিক নিয়ে সিঙ্গাপুরের উদ্দেশে রওনা হয়েছিল। জাহাজটি প্রায় ২২৫ মিটার দীর্ঘ এবং এতে প্রায় ৭২ হাজার ১০০ মেট্রিক টন লৌহ আকরিক ছিল।

২২ আগস্ট বেলা ১১টা ৪৮ মিনিটের দিকে সামুদ্রিক উদ্ধার সমন্বয় কেন্দ্র জাহাজটির সঙ্গে যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন হওয়ার তথ্য পায়। এরপর কাছাকাছি থাকা বাণিজ্যিক জাহাজ এমটি আইসোপোসকে উদ্ধার অভিযানে যুক্ত করা হয়। পরে ভারতীয় কোস্টগার্ডের বরদ, আনমোল ও বিজিত জাহাজও অভিযানে নামে।

রাতে একটি লাইফ র‍্যাফট থেকে দুজনকে জীবিত উদ্ধার করা হয়। ভারতীয় নৌবাহিনী ও কোস্টগার্ড যৌথভাবে আকাশ ও সমুদ্রপথে নিখোঁজ ব্যক্তিদের সন্ধান চালাচ্ছে। সর্বশেষ পাওয়া তথ্য অনুযায়ী, বাকি ২২ জনের অবস্থান এখনো নিশ্চিত করা যায়নি। জাহাজটি ঠিক কী কারণে ডুবে গেল, সে বিষয়ে এখনো সুনির্দিষ্ট কোনো কারণ জানানো হয়নি।

মামুনের বাল্যবন্ধু সাদাত আল কাবিজু তার নিয়োগকারী প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে যোগাযোগ রাখছেন। তিনি জানান, গত এপ্রিলের শেষ দিকে মামুন এমভি ওশান উইনার-এ যোগ দেন। ওডিশা উপকূল থেকে জাহাজটি ছাড়ার রাতে তার সঙ্গে মামুনের সর্বশেষ কথা হয়। দুর্ঘটনার পর নিয়োগকারী প্রতিষ্ঠানটির কাছ থেকেও এখন পর্যন্ত নতুন কোনো নিশ্চিত তথ্য পাওয়া যায়নি।

সাতক্ষীরার এই পরিবার এখন অপেক্ষা করছে একটি ফোনকলের জন্য—যে ফোনকলে বলা হবে, মামুন বেঁচে আছেন।

আব্দুল্লাহ আল বাকি বলেন, ‘আমরা খুব ভেঙে পড়েছি। আমার মা অসুস্থ। সরকারের কাছে আমাদের একটাই অনুরোধ, আমার ভাইয়ের বিষয়ে যত দ্রুত সম্ভব একটি নিশ্চিত খবর আমাদের জানানো হোক।’

বঙ্গোপসাগরে চলছে উদ্ধার অভিযান। আর সাতক্ষীরার ওই বাড়িতে স্বজনদের চোখ আটকে আছে মুঠোফোনের পর্দায়—কখন আসে কাঙ্ক্ষিত সেই খবর।

প্রতিনিধি/এসএস