জেলা প্রতিনিধি
২৩ আগস্ট ২০২৬, ০৮:৩০ পিএম
শরীয়তপুর প্রেস ক্লাবের সীমানাপ্রাচীর কোনো লিখিত নোটিশ ছাড়াই রাতের আঁধারে ভেঙে ফেলার অভিযোগ উঠেছে। পরদিন সকালে প্রেস ক্লাবের জায়গা পরিদর্শনে গেলে হামলার শিকার হন সময় টেলিভিশনের জেলা প্রতিনিধি ও প্রেস ক্লাবের সাংগঠনিক সম্পাদক ইস্রাফিল ব্যাপারী। হামলায় তার ডান হাতের কবজির কাছে ভেঙে গেছে বলে চিকিৎসকেরা জানিয়েছেন। তাকে শরীয়তপুর সদর হাসপাতালে ভর্তি করা হয়েছে।
এ ঘটনায় তাকে উদ্ধারে গিয়ে আরও তিন সাংবাদিক আহত হয়েছেন। রোববার (২৩ আগস্ট) দুপুরে ঘটনার প্রতিবাদে জেলা প্রশাসকের কার্যালয়ের সামনে মানববন্ধন ও বিক্ষোভ করেন প্রেস ক্লাবের সদস্য ও বিভিন্ন গণমাধ্যমে কর্মরত সাংবাদিকেরা। একপর্যায়ে তারা জেলা প্রশাসকের গাড়ির সামনে অবস্থান নিয়ে জেলা প্রশাসকের প্রত্যাহার ও হামলাকারীদের বিচারের দাবি জানান।
সাংবাদিকদের অভিযোগ, শনিবার (২২ আগস্ট) রাতে জেলা শিল্পকলা একাডেমি সংলগ্ন প্রেস ক্লাবের নির্ধারিত জায়গার তিনটি সীমানাপ্রাচীর কোনো লিখিত নোটিশ ছাড়াই ভেঙে ফেলা হয়। এ ঘটনায় প্রেস ক্লাবের সভাপতি ও জেলা প্রশাসনের সম্পৃক্ততার অভিযোগ তুলে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে প্রতিবাদ জানান ইস্রাফিল ব্যাপারী।
পরদিন সকালে প্রেস ক্লাবের জায়গা পরিদর্শনে গেলে কয়েকজন ব্যক্তি তার ওপর হামলা চালান বলে অভিযোগ করেন তিনি। তার দাবি, হামলাকারীরা ইট ও দেশীয় অস্ত্র দিয়ে তাকে আঘাত করেন।
ইস্রাফিল ব্যাপারী বলেন, ‘আমি প্রেস ক্লাবের জমি রক্ষায় সেখানে গিয়েছিলাম। পরিকল্পিতভাবে আমার ওপর হামলা করা হয়েছে। হামলাকারীরা হত্যার উদ্দেশে এলোপাতাড়ি ইট দিয়ে আঘাত করেছে। এতে আমার এক হাত ভেঙে গেছে। আমি হামলাকারীদের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি চাই।’
তাকে উদ্ধারে গেলে প্রেস ক্লাবের সাধারণ সম্পাদক ও চ্যানেল ২৪ এর সাংবাদিক নুরুল আমিন রবিন, ক্রীড়া ও সাংস্কৃতিক সম্পাদক এবং কালের কণ্ঠের প্রতিনিধি শরিফুল আলম ইমন ও সদস্য ইসহাক মাদবর আহত হন। শরিফুল আলম ইমন বলেন, হামলাকারীর সংখ্যা ছিল আট থেকে ১০ জন। তাকে বাঁচাতে গেলে তারাও হামলার শিকার হন। তার একটি আঙুল ভেঙে গেছে বলেও জানান তিনি।
চিকিৎসকেরা জানান, ইস্রাফিল ব্যাপারীর ডান হাতের কব্জির কাছে ভেঙে গেছে। তাকে হাসপাতালে ভর্তি রাখা হয়েছে। অন্য আহত সাংবাদিকেরা প্রাথমিক চিকিৎসা নিয়েছেন।
জানা গেছে, ১৯৯৮ সালে শরীয়তপুর পৌরসভার আমিনবাগ এলাকার তুলাসার মৌজায় প্রেস ক্লাবের জন্য ১৪ শতাংশ জমি বরাদ্দ দেওয়া হয়। তৎকালীন জেলা প্রশাসক সুভাষ চন্দ্র রায় ওই জমি বরাদ্দ দেন। জমিটি ডোবা থাকায় সাংবাদিকেরা নিজস্ব অর্থায়নে মাটি ভরাট করে সীমানাপ্রাচীর নির্মাণ করেন। পরে ২০২৩ সালে সেখানে একতলা প্রেস ক্লাব ভবন নির্মাণ করা হয়।
তবে জেলা প্রশাসনের দাবি, ওই জায়গায় শিশু পার্ক থাকায় প্রেস ক্লাবকে অন্যত্র স্থানান্তরের জন্য নতুন জমি বরাদ্দের প্রক্রিয়া চলছে। শিশুদের চলাচলের সুবিধার্থে প্রেস ক্লাবের সভাপতির মৌখিক অনুমতি নিয়ে সীমানাপ্রাচীর অপসারণ করা হয়েছে।
প্রেস ক্লাবের সভাপতি আবুল হোসেন সরদার বলেন, ফেসবুকে তাকে নিয়ে সমালোচনা করায় তার ছেলে পলাশ ও তার অনুসারীরা ক্ষুব্ধ ছিলেন। তবে সাংবাদিক ইস্রাফিলের ওপর হামলা হবে, তা তিনি জানতেন না। এ ঘটনায় তিনি বিব্রত এবং তার সন্তানকে বিচারের মুখোমুখি করার উদ্যোগ নেওয়ার কথা জানান।
বিক্ষোভ চলাকালে সাংবাদিকেরা জেলা প্রশাসকের গাড়ির সামনে অবস্থান নেন। একপর্যায়ে গাড়ি থেকে নেমে তাদের সঙ্গে কথা বলেন জেলা প্রশাসক তাহসিনা বেগম।
জেলা প্রশাসক বলেন, ‘ভিপি সম্পত্তিতে স্থাপনা তৈরি করা যায় না। প্রেস ক্লাবের জায়গার বিষয়ে সভাপতি ও সাধারণ সম্পাদকের লিখিত আবেদনের ভিত্তিতে সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। আগামী দু-এক দিনের মধ্যে বিষয়টি ভূমি মন্ত্রণালয়ে পাঠানো হবে।’

প্রাচীর অপসারণের বিষয়ে তিনি বলেন, এটি ভুল–বোঝাবুঝি। নির্বাচিত সভাপতির মৌখিক কথার ভিত্তিতে প্রাচীরটি অপসারণ করা হয়েছে। ভবন অপসারণ করা হয়নি। পার্কে শিশুদের চলাচলের সুবিধার জন্য পেছনের দেয়াল ভাঙা হয়েছে।
লিখিত নোটিশ ছাড়া প্রাচীর ভাঙার বিষয়ে জানতে চাইলে জেলা প্রশাসক বলেন, ‘মৌখিকভাবে আমি এটা করতে পারি না। আপনারা যদি সেখানে স্থাপনা তৈরি করে থাকেন, তাহলে কাগজপত্র নিয়ে আসেন। আমি দেখে প্রয়োজনে সেই স্থাপনা পুনরায় তৈরি করে দেব।’
প্রেস ক্লাবের সাধারণ সম্পাদক নুরুল আমিন রবিন বলেন, জেলা প্রশাসক আগামী ২৪ ঘণ্টার মধ্যে ভেঙে ফেলা দেয়াল পুনরায় ঠিক করে দেওয়ার আশ্বাস দিয়েছেন। প্রেস ক্লাবকে না জানিয়ে সভাপতি কীভাবে মৌখিকভাবে সীমানাপ্রাচীর অপসারণের অনুমতি দিলেন, সে বিষয়ে তাকে ব্যাখ্যা দিতে বলা হবে। সন্তোষজনক ব্যাখ্যা না পেলে কার্যকরী পরিষদ ব্যবস্থা নেবে।
এ ঘটনায় হামলাকারীদের আইনের আওতায় আনা, ঘটনার সুষ্ঠু তদন্ত, প্রেস ক্লাবের জমি নিয়ে জটিলতার দ্রুত সমাধান এবং সাংবাদিকদের নিরাপদ কর্মপরিবেশ নিশ্চিত করার দাবি জানিয়েছেন সাংবাদিকেরা।
শরীয়তপুরের অতিরিক্ত পুলিশ সুপার (ক্রাইম) তানভীর হোসেন বলেন, প্রেস ক্লাবের সীমানাপ্রাচীর ভাঙার বিষয়টি তার নজরে এসেছে। তবে সাংবাদিকের ওপর হামলার বিষয়ে তিনি অবগত নন। এ ঘটনায় এখনো কেউ লিখিত অভিযোগ করেননি। বিষয়টি খতিয়ে দেখা হচ্ছে। কেউ আইনি সহায়তা চাইলে পুলিশ পাশে থাকবে।
প্রতিনিধি/এসএস