Dhaka Mail Logo

সারাদেশ

রংপুরে একই পরিবারের চারজনকে হত্যা, যেভাবে ধরা পড়ল দুই ‘খুনি’

জেলা প্রতিনিধি

২৩ আগস্ট ২০২৬, ০৬:৫১ পিএম

বাড়ির ছাদে ইয়াবা সেবন দেখে ফেলায় ও সেবনে বাধা দেওয়ায় রংপুর জিলা স্কুলের সাবেক শিক্ষক গণপতি চক্রবর্তীসহ একই পরিবারের চারজনকে ‘হত্যা করেছে’ একই এলাকার সিদ্ধার্থ ও মুগ্ধ নামে দুই যুবক। হত্যার পর ‘খুনিরা’ সব সময় চেষ্টা করে যাতে কোনো ক্লু না থাকে এবং ধরা না পড়ে।

এই হত্যার পরও ‘খুনিরা’ তাই চেষ্টা করেছে। সেই চেষ্টা থেকে ওই বাড়িতে ব্যবহৃত দুটি মোবাইল ফোন ডিটারজেন্ট পাউডারের পানিতে ভিজিয়ে রাখেন, যাতে মোবাইলে কোন আঙুলের ছাপ না থাকে। কিন্তু প্রতিটি হত্যার ঘটনায় খুনিরা নিজের অজান্তে ক্লু রেখে যায়। 

গণপতি চক্রবর্তীসহ পরিবারের চারজনকে হত্যার সময় সিদ্ধার্থ ও মুগ্ধ নিজেদের অজান্তেই ক্লু রেখে যান সেখানে। সেই ক্লু থেকেই ধরা পড়েন পুলিশের হাতে।

রোববার (২৩ আগস্ট) দুপুরে এক প্রেস ব্রিফিংয়ে মহানগর পুলিশ কমিশনার মোহাম্মদ আবদুল মাবুদ দুই খুনিকে কীভাবে ধরা হয়েছে, সেই বর্ণনা দেন।

পুলিশ জানায়, গণপতি চক্রবর্তীসহ পরিবারের চারজনকে একে একে হত্যার পর তারা দুইজনই গোসল করেন। পরে তারা ডাইনিং টেবিলে বসে শশা, খেজুর খান। ইয়াবাও সেবন করেন। ঘটনাটি ভিন্ন খাতে প্রবাহিত করতে তারা বাড়ির আসবাবপত্র ছড়িয়ে ছিটিয়ে ফেলেন। বাড়ির আসবাবপত্র তছনছের সময় তারা স্বর্ণের চুড়ি পান। সেই চুড়ি আগুন দিয়ে পরীক্ষা করেন, সেটি আসল না নকল। 

পুলিশ আরও জানায়, খুনিরা ইয়াবা সেবনের আলামত এবং স্বর্ণের চুড়ি আগুন দিয়ে পরীক্ষার আলামত রেখে যান সেখানে। পুলিশের কাছে খুনিকে ধরার জন্য এই দুটি আলামতই ক্লু হিসেবে চিহ্নিত হয়। 

পুলিশ এলাকায় খোঁজ নেন কারা কারা ইয়াবা সেবন করেন এবং ওই রাতে কারা ইয়াবা সেবন করেছেন। হত্যাকারীদের মধ্যে অবশ্যই কেউ ইয়াবা সেবন করেছেন বলে ধারণা করে পুলিশ। একই সঙ্গে স্বর্ণের চুরি আসল না নকল পরীক্ষার করার বিষয়টি স্বর্ণের কারিগর কিংবা স্বর্ণের দোকানের সঙ্গে জড়িত কেউ এই হত্যায় জড়িত থাকতে পারে বলে ধারণা করে। দুটি ধারণা থেকেই এলাকায় অভিযান চালানো হয়। এই দুটি ক্লু দিয়েই শেষ পর্যন্ত খুনি সিদ্ধার্থ ও মুগ্ধকে গ্রেফতার করে পুলিশ।

জানা গেছে, সিদ্ধার্থ স্বর্ণের দোকানে এবং মুগ্ধ মাছের দোকানে কাজ করতেন। তারা দুজনই ইয়াবা সেবন করতেন। 

পুলিশ জানায়, ঘটনার দিন বৃহস্পতিবার রাতে সিদ্ধার্ত ও মুগ্ধ রংপুর জিলা স্কুলের সাবেক শিক্ষক গণপতি চক্রবর্তীর বাড়ির ছাদে বসে ইয়াবা সেবন করছিলেন। ইয়াবা সেবন দেখে ফেলেন ওই শিক্ষক। সমাজে ইয়াবা সেবনের কথা প্রকাশের ভয়ে তারা গণপতি চক্রবর্তীকে মেরে ফেলার সিদ্ধান্ত নেন। পরে গামছা প্যাঁচিয়ে তাকে হত্যা করা হয়। হত্যার সময় গোঙানির শব্দ শুনে তার স্ত্রী প্রীতিলতা চক্রবর্তী ছাদে উঠার চেষ্টা করেন। এমন সময় সিঁড়িতেই প্রীতিলতা চক্রবর্তীকেও গলায় রশি প্যাঁচিয়ে হত্যা করেন তারা। 

মা-কে বাঁচাতে এগিয়ে আসেন মেয়ে আগামী চক্রবর্তী পার্থী। তারা তাকেও রশি প্যাঁচিয়ে হত্যা করেন। ‘খুনি’ দুজনই একই এলাকার হওয়ায় পঞ্চম শ্রেণির শিক্ষার্থী আয়ুস চক্রবর্তী প্রিয়ম তাদের আগে থেকেই চেনেন এবং জানেন। খুনের বিষয় যাতে কেউ টের না পায়, এ জন্য ১২ বছরের আয়ুস চক্রবর্তী প্রিয়মকে প্রথমে রশি প্যাঁচিয়ে এবং পরে বালিশ চাপা দিয়ে হত্যা করে তারা।

মহানগর পুলিশ কমিশনার মোহাম্মদ আবদুল মাবুদ জানান, এই হত্যাকাণ্ডে মামলা হয়েছে। গ্রেফতাররা হত্যার কথা স্বীকার করেছেন।

শনিবার (২২ আগস্ট) রাতে নিজ বাড়ি থেকে রংপুর জিলা স্কুলের সাবেক শিক্ষক গণপতি চক্রবর্তীসহ একই পরিবারের চারজনের মরদেহ উদ্ধার করে পুলিশ। গত তিন দিন ধরে বাড়িতে তালাবদ্ধ দেখতে পায় এলাকাবাসী। 

কয়েক দিন ধরে কোনো রকম যোগাযোগ করতে না পেরে ওই শিক্ষকের আত্মীয়-স্বজন এসে বাড়িতে তালাবদ্ধ দেখে পুলিশে খবর দেন। খবর পেয়ে পুলিশ এসে ফায়ার সার্ভিসের মাধ্যমে তালা ভেঙে বাড়িতে প্রবেশ করে। 

এসময় বাড়ির ছাদে গণপতি চক্রবর্তী, সিঁড়ির কাছে স্ত্রী প্রীতিলতা চক্রবর্তী ও মেয়ে আগামী চক্রবর্তীর লাশ পাওয়া যায় এবং একটি কক্ষে খাটের নিচ থেকে তাদের ছোট ছেলে আয়ুস চক্রবর্তীর লাশ উদ্ধার করা হয়। এসময় বাড়ির বৈদ্যুতিক লাইন বিচ্ছিন্ন এবং বাড়ির জিনিসপত্র ছড়ানো ছিটানো ছিল।

রংপুর জিলা স্কুল থেকে শিক্ষকতা পেশা থেকে ২ জানুয়ারি অবসরে যান গণপতি চক্রবর্তী। তিনি নগরীর সমবায় মার্কেটে একটি হোমিওপ্যাথি চেম্বারে নিয়মিত চিকিৎসাসেবা দিতেন। হত্যার শিকার মেয়ে আগামী চক্রবর্তী রংপুর কারমাইকেল কলেজ থেকে মাস্টার্স পাস করেছেন এবং ছেলে আয়ুস চক্রবর্তী রংপুর জিলা স্কুলের পঞ্চম শ্রেণির শিক্ষার্থী ছিল।

প্রতিনিধি/এলএ