Dhaka Mail Logo

সারাদেশ

মসজিদে তালার হুমকি, সংবাদ প্রকাশের পর সাংবাদিকের ওপর হামলার অভিযোগ

জেলা প্রতিনিধি

২২ আগস্ট ২০২৬, ০১:২০ পিএম

গাজীপুরের টঙ্গীর গুটিয়া গ্রামের কেন্দ্রীয় জামে মসজিদ কমিটিতে জায়গা না পেয়ে মসজিদে তালা দেওয়ার হুমকি দেওয়ার অভিযোগ উঠেছে জালাল নামের এক ব্যক্তির বিরুদ্ধে। এ ঘটনায় এলাকাবাসীর পক্ষ থেকে থানায় সাধারণ ডায়েরি (জিডি) ও সংবাদ প্রকাশের পর সাংবাদিক শরীফুল ইসলাম ও তার বাবার ওপর হামলার অভিযোগ উঠেছে জালাল ও তার সহযোগীদের বিরুদ্ধে।

বুধবার (১৯ আগস্ট) সন্ধ্যায় এ হামলার ঘটনা ঘটে। এতে শরীফুলের বাম চোখে আঘাত লাগে। তিনি ঝাপসা দেখছেন বলে জানিয়েছেন। এ ঘটনায় তিনি টঙ্গী পশ্চিম থানায় লিখিত অভিযোগ দিয়েছেন।

শরীফুল ইসলাম বলেন, ৫ আগস্টের পর থেকে জালাল এলাকায় দখল ও চাঁদাবাজি করছেন এবং সাধারণ মানুষকে আওয়ামী লীগের নাম দিয়ে হয়রানি করছেন। সম্প্রতি মসজিদ কমিটির সভাপতি পদ না পেলে মসজিদে তালা দেওয়ার হুমকি দেন তিনি। এ ঘটনায় শরীফুল থানায় জিডি করেন এবং বিভিন্ন গণমাধ্যমে প্রতিবেদন প্রকাশের ব্যবস্থা করেন।

শরীফুলের দাবি, জিডি ও সংবাদ প্রকাশের কারণে তাকে ১০ লাখ টাকা খরচ হলেও মেরে ফেলার হুমকি দেওয়া হয়। কিছুদিন পর বুধবার জালাল, তার ভাই ইব্রাহিম ও খোকন তার ও তার বাবার ওপর হামলা করেন।

শরীফুল বলেন, হামলায় তাঁর বাম চোখে আঘাত লাগে এবং শরীরের বিভিন্ন স্থানে জখম হয়। তিনি ঘটনার সুষ্ঠু বিচার দাবি করেন।

টঙ্গী পশ্চিম থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) আরিফুর রহমান বলেন, হামলার ঘটনায় লিখিত অভিযোগ পাওয়া গেছে। তদন্ত করে আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হবে।

মসজিদ কমিটি নিয়ে বিরোধ

স্থানীয় বাসিন্দাদের ভাষ্য, গত ২৫ বছর ধরে গুটিয়া কেন্দ্রীয় জামে মসজিদের কমিটি নিয়ে কোনো অভিযোগ ছিল না। তবে ৫ আগস্টের পর থেকে জালাল কমিটিতে জায়গা পাওয়ার চেষ্টা করছেন। এ নিয়ে মুসল্লিদের সঙ্গে তার বিরোধ তৈরি হয়েছে।

গত ৩ জুলাই মসজিদে আহ্বায়ক কমিটির সভা চলাকালে জালাল সেখানে প্রবেশ করেন। কমিটিতে তার নাম না থাকায় তিনি মুসল্লিদের গালিগালাজ ও নথিপত্র ছুড়ে ফেলেন বলে অভিযোগ। এ সময় মসজিদে তালা দেওয়ার হুমকিও দেন তিনি। এ ঘটনায় ১১ জুলাই এলাকাবাসীর পক্ষ থেকে টঙ্গী পশ্চিম থানায় জিডি করা হয়।

জাতীয়তাবাদী আইনজীবী ফোরামের গাজীপুর জেলার সাবেক সহসভাপতি ও গুটিয়ার বাসিন্দা সোলায়মান স্বপন বলেন, ৫ আগস্টের পর জালালের উচ্ছৃঙ্খল আচরণে গ্রামের মানুষ অতিষ্ঠ। আইনজীবী পরিচয় ও দলের নাম ব্যবহার করে এলাকার মানুষকে হয়রানি করা কাম্য নয়। এতে বিএনপির বদনাম হচ্ছে।

জালালের বিরুদ্ধে গুটিয়া সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের অভিভাবক কমিটির সভাপতি পদ নিয়ে বিরোধ তৈরির অভিযোগও রয়েছে। বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষিকা মোছা. খায়রুন্নেছা বলেন, সভাপতি হওয়ার প্রয়োজনীয় যোগ্যতা জালালের ছিল না। এরপরও তিনি জোর করে সভাপতি হওয়ার চেষ্টা করেন। এর প্রতিবাদ করায় তাকে ‘স্বৈরাচারের দোসর’ বলে অপবাদ দেওয়া হয়।

পরিবারের সদস্যকে ঘিরে পুরোনো অভিযোগ

গুটিয়া গ্রামের বাসিন্দাদের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, জালালের পরিবারের এক সদস্যকে ঘিরে দীর্ঘদিন ধরে এলাকায় নানা অভিযোগ রয়েছে। স্থানীয়দের দাবি, কয়েক দশক ধরে পরিবারটির বিরুদ্ধে জমি দখল, সহিংসতা, রাজনৈতিক প্রভাব বিস্তার ও অপরাধমূলক কর্মকাণ্ডের অভিযোগ ছিল। এতে এলাকায় ভয়ের পরিবেশ তৈরি হয়েছিল।

স্থানীয়দের ভাষ্য অনুযায়ী, পরিবারের প্রয়াত সদস্য আইয়ুবের প্রভাব বাড়তে শুরু করে নব্বইয়ের দশকে। তার বিরুদ্ধে ডাকাতি, মাদক ও অস্ত্র ব্যবসা, ভাড়াটে সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ড ও জমি দখলের অভিযোগ ছিল।

স্থানীয়দের অভিযোগ, নরসিংদী থেকে গুটিয়ায় এসে বসতি গড়ার পর আইয়ুব মাছ ধরে জীবিকা নির্বাহের পাশাপাশি রাতে ডাকাতি করতেন। পরে মাদক ও অস্ত্র ব্যবসা, ভাড়ায় মানুষ খুন এবং জমি দখলের মতো অপরাধে জড়িয়ে পড়েন বলে অভিযোগ রয়েছে। একপর্যায়ে তিনি টঙ্গীর শীর্ষ সন্ত্রাসী হিসেবে পরিচিতি পান বলেও দাবি স্থানীয়দের।

তার প্রভাব বাড়ার পর পরিবারের অন্য সদস্যরাও বেপরোয়া হয়ে ওঠেন বলে অভিযোগ রয়েছে। অন্যের জমি থেকে মাটি কেটে বিক্রি, মানুষকে ধরে নিয়ে মারধর ও হত্যার হুমকির মতো ঘটনা ঘটত বলে স্থানীয়দের দাবি।

স্থানীয়দের অভিযোগ, স্থানীয় ও সরকারি খাসজমি দখল করে প্রায় অর্ধশত বিঘা জমির ওপর একটি দিঘি তৈরি করা হয়। দিঘির জমি দখলের পর কাউকে নামমাত্র মূল্য দেওয়া হলেও অনেকে কোনো টাকা পাননি বলেও অভিযোগ তাদের।

আধিপত্য বিস্তারকে কেন্দ্র করে ২০০৪ সালে সন্ত্রাসীদের হাতে আইয়ুব নিহত হন বলে স্থানীয় সূত্রে জানা যায়। পরে দখল করা দিঘির পাশে তার লাশ পাওয়া যায়। এ ঘটনায় তার পরিবার মামলা করে। প্রত্যক্ষদর্শী না থাকলেও এলাকার নিরীহ লোকজনকে আসামি করা হয়েছিল এবং জমি দখলের শিকার ব্যক্তিদেরও হয়রানি করা হয়েছিল বলে স্থানীয়দের দাবি।

মামলা থেকে অব্যাহতি দেওয়ার কথা বলে আইয়ুবের পরিবার মোটা অঙ্কের টাকা দাবি করেছিল বলেও অভিযোগ রয়েছে। হয়রানি থেকে বাঁচতে অনেকে জমি বিক্রি করে টাকা দেন বলে স্থানীয়দের ভাষ্য। পরে আপসের মাধ্যমে মামলা নিষ্পত্তি হয় বলে তারা জানান।

স্থানীয়দের অভিযোগ, আইয়ুব নিহত হওয়ার দুই বছর পর গভীর রাতে হামলা চালিয়ে গ্রামের দেলোয়ার, নজীব আলী ও তার ছেলেকে হত্যা করা হয়। এ ঘটনায় মামলা হলেও আওয়ামী লীগের প্রভাব খাটিয়ে ২০০৯ সালে প্রশাসনকে ‘ম্যানেজ’ করে মামলাটির চূড়ান্ত প্রতিবেদন দেওয়া হয় বলে অভিযোগ তাদের।

দীর্ঘদিন আওয়ামী লীগ ক্ষমতায় থাকায় তিন হত্যাকাণ্ডে নিহত ব্যক্তিদের পরিবারের সদস্যরা কোনো পদক্ষেপ নিতে পারেননি বলে স্থানীয়দের দাবি। ২০২৪ সালের ৫ আগস্টের পর বিষয়টি আবার আলোচনায় এলেও গ্রামের দীর্ঘদিনের সহাবস্থানের কথা বিবেচনা করে এখনো কোনো পদক্ষেপ নেওয়া হয়নি বলে তারা জানান। নিহত ব্যক্তিদের পরিবারের সদস্যরা ন্যায়বিচার ও উপযুক্ত ক্ষতিপূরণ চান।

জালালের বিরুদ্ধে আরও অভিযোগ

এদিকে আইয়ুবের ভাতিজা জালালকে ঘিরে এলাকায় নতুন করে উত্তেজনা তৈরি হয়েছে। স্থানীয় বাসিন্দারা তার বিরুদ্ধে ইয়াবা ব্যবসা, চাঁদাবাজি, জমি দখল ও গুলি করে হত্যার হুমকি দেওয়ার অভিযোগ করেছেন।

তাদের দাবি, কারও সঙ্গে সামান্য কথা-কাটাকাটি হলেও জালাল গুলি করার হুমকি দেন। স্থানীয়দের আরও দাবি, আইয়ুবের পরিবার আওয়ামী লীগের সঙ্গে যুক্ত থাকলেও ৫ আগস্টের পর থেকে জালাল বিএনপি নেতাদের সঙ্গে ছবি তুলে তা প্রচার করছেন।

তবে তার বিরুদ্ধে ওঠা সব অভিযোগ অস্বীকার করেছেন জালাল। তিনি বলেন, এসব অভিযোগ মিথ্যা।

প্রতিনিধি/এসএস