জেলা প্রতিনিধি
২২ আগস্ট ২০২৬, ১১:৫৭ এএম
ময়মনসিংহের ১৩ উপজেলায় ছয় বছরে সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে শিক্ষার্থী কমেছে ২ লাখ ৬৬ হাজার ২০২ জন। ২০২০ সালে জেলার সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়গুলোতে শিক্ষার্থী ছিল ৬ লাখ ৯২ হাজার ২৪ জন। ২০২৬ সালে তা কমে দাঁড়িয়েছে ৪ লাখ ২৫ হাজার ৮২২ জনে। অর্থাৎ ছয় বছরে শিক্ষার্থী কমেছে ৩৮ দশমিক ৪৭ শতাংশ।
ময়মনসিংহের ১৩ উপজেলার ২ হাজার ১৪০টি সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের তথ্য বিশ্লেষণ করে এ চিত্র পাওয়া গেছে। শুধু গত এক বছরেই শিক্ষার্থী কমেছে ১ লাখ ১২ হাজার ১৭৮ জন।
জেলা প্রাথমিক শিক্ষা অফিসের তথ্য অনুযায়ী, ২০২১ সালে সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে শিক্ষার্থী ছিল ৫ লাখ ৪৮ হাজার। ২০২২ সালে তা কমে দাঁড়ায় ৪ লাখ ২৭ হাজারে। ২০২৩ সালে কিছুটা বেড়ে হয় ৪ লাখ ৬৯ হাজার। ২০২৪ সালে ছিল ৪ লাখ ৬৬ হাজার এবং ২০২৫ সালে বেড়ে দাঁড়ায় ৫ লাখ ৩৮ হাজারে। তবে চলতি বছর আবার বড় ধরনের পতন হয়েছে।

শিক্ষার্থী কমার পাশাপাশি চলতি বছরের জরিপে জেলায় ৩ দশমিক ৪১ শতাংশ শিক্ষার্থী ঝরে পড়ার তথ্য পাওয়া গেছে।
উপজেলাগুলোর মধ্যে শিক্ষার্থী ঝরে পড়ার হার সবচেয়ে বেশি গফরগাঁওয়ে—প্রায় ৪ দশমিক ৬ শতাংশ। ২০২০ সালে সেখানে সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে শিক্ষার্থী ছিল ৬০ হাজার ৮১৫ জন। চলতি বছর তা কমে দাঁড়িয়েছে ৩৫ হাজার ২৭ জনে।
গফরগাঁও উপজেলা প্রাথমিক শিক্ষা কর্মকর্তা (ভারপ্রাপ্ত) মোহাম্মদ আবু সাঈদ বলেন, অভিভাবকদের অসচেতনতা, শিক্ষক সংকট ও প্রাতিষ্ঠানিক অবকাঠামোর সমস্যা এর অন্যতম কারণ।

শিক্ষার্থী ঝরে পড়ার হারে দ্বিতীয় অবস্থানে রয়েছে তারাকান্দা উপজেলা। সেখানে ঝরে পড়ার হার ৪ শতাংশ। ২০২০ সালে তারাকান্দায় শিক্ষার্থী ছিল ৬০ হাজার ৮২০ জন। চলতি বছর তা কমে দাঁড়িয়েছে ২৯ হাজার ৭২৩ জনে।
তারাকান্দা উপজেলা শিক্ষা কর্মকর্তা জীবন আরা বেগম বলেন, অভিভাবকদের বুঝিয়ে বিদ্যালয়ে শিক্ষার্থী বাড়ানোর চেষ্টা করা হচ্ছে। তবে এ উপজেলার বাস্তবতায় আরও কিছু কারণ রয়েছে।
তিনি বলেন, গ্রামের মানুষের মধ্যে ধর্মীয় শিক্ষার প্রতি আগ্রহ থাকায় অনেকে সন্তানদের মাদরাসায় ভর্তি করান। আবার অনেকে কিন্ডারগার্টেনেও সন্তানদের ভর্তি করছেন।
ময়মনসিংহের সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে শিক্ষার্থী কমার কারণ শুধু ঝরে পড়ার মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। একদিকে বিদ্যালয়ে ভর্তি হওয়া শিক্ষার্থীর সংখ্যা কমছে, অন্যদিকে অভিভাবকদের একটি অংশ সন্তানদের মাদরাসা ও কিন্ডারগার্টেনমুখী করছেন। এর সঙ্গে দারিদ্র্য, শিশুশ্রমসহ নানা সামাজিক ও অর্থনৈতিক কারণও রয়েছে।

ময়মনসিংহ জেলা প্রাথমিক শিক্ষা কর্মকর্তা মো. শফিকুল ইসলাম বলেন, করোনা-পরবর্তী সময়ে বেসরকারি বিদ্যালয় ও মাদরাসামুখী হওয়ার প্রবণতা শিক্ষার্থী কমে যাওয়ার অন্যতম কারণ। তবে শিক্ষার্থী ঝরে পড়ার জন্য শিক্ষক সংকটকে দায়ী করেননি তিনি। তার মতে, দারিদ্র্য, শিশুশ্রম এবং বিভিন্ন সামাজিক-অর্থনৈতিক কারণই শিক্ষার্থী ঝরে পড়ার ক্ষেত্রে বেশি ভূমিকা রাখছে।

২০২০ সালে জেলার সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়গুলোতে যেখানে প্রায় ৭ লাখ শিক্ষার্থী ছিল, ছয় বছর পর সেই সংখ্যা কমে সাড়ে ৪ লাখের নিচে নেমে এসেছে। ২০২২ সালে শিক্ষার্থী সংখ্যা ৪ লাখ ২৭ হাজারে নেমে যাওয়ার পর ২০২৩ ও ২০২৫ সালে কিছুটা বৃদ্ধি দেখা গেলেও তা স্থায়ী হয়নি। চলতি বছর আবার বড় ধরনের পতন ঘটেছে।
শিক্ষা কর্মকর্তারা বলছেন, অভিভাবকদের সচেতন করা, বিদ্যালয়ের প্রতি আগ্রহ বাড়ানো এবং সামাজিক-অর্থনৈতিক প্রতিবন্ধকতা মোকাবিলা করা না গেলে শিক্ষার্থী কমার এই প্রবণতা ঠেকানো কঠিন।
প্রতিনিধি/এসএস