জেলা প্রতিনিধি
২১ আগস্ট ২০২৬, ১২:৪৬ পিএম
দ্রুত নগরায়ণ ও শিল্পায়নের চাপে গত এক দশকে ময়মনসিংহে কমেছে ২০ হাজার ৪১৪ হেক্টর আবাদি জমি। সবচেয়ে বেশি কৃষিজমি হারিয়েছে শিল্পনগরী ভালুকা। কৃষিজমি কমে যাওয়ায় খাদ্য উৎপাদন, কৃষকের জীবিকা ও পরিবেশ নিয়ে শঙ্কা তৈরি হয়েছে। কৃষিজমি রক্ষায় কৃষি বিভাগের উদ্বেগের পাশাপাশি চাপের মুখে জমিকে অকৃষি দেখিয়ে প্রত্যয়ন দেওয়ার অভিযোগও উঠেছে।
ভালুকা উপজেলা শহরসংলগ্ন ঢাকা-ময়মনসিংহ মহাসড়কের পাশের বাঘসাতরা এলাকায় প্রায় ৬৫ বিঘা জলাশয় বালু দিয়ে ভরাট করা হচ্ছে। স্থানীয়দের ধারণা, আগামী কয়েক মাসের মধ্যে সেখানে একটি বড় কারখানা গড়ে উঠবে। কয়েক বছর আগেও ওই জমিতে ধান চাষ হতো।

স্থানীয় চা দোকানি জামাল উদ্দিন বলেন, ‘আমার জন্ম ও বেড়ে ওঠা এই এলাকাতেই। এখন যে জায়গাটি বালু দিয়ে ভরাট করা হচ্ছে, সেখানে ১০ বছর আগেও ধান চাষ হয়েছে। পরে মাছ চাষ করা হয়েছে। ধানি জমি কমলেও কারখানা হওয়ায় এলাকার মানুষের কর্মসংস্থান হচ্ছে, এটাও মানতে হবে।’
ইনোফলো বিডি কোম্পানির নিরাপত্তা ইনচার্জ সাদ্দাম হোসেন বলেন, ‘কয়েক দিন হলো এখানে ইনচার্জ হিসেবে যোগ দিয়েছি। এখন শুধু বালু ভরাটের কাজ চলছে। পরিত্যক্ত জলাশয় ভরাট করতে অনেক বালু লাগছে। পরে এখানে কী কোম্পানি হবে, তা আমার জানা নেই।’
ভালুকার ভরাডোবায় চলছে নাসির ফুটওয়্যার কোম্পানির নির্মাণকাজ। স্থানীয়দের অভিযোগ, বিশাল এলাকাজুড়ে গড়ে ওঠা প্রতিষ্ঠানটির জায়গায় একসময় ধান, পাট ও মাছ চাষের পাশাপাশি গরুর খামারও ছিল। জমির শ্রেণি পরিবর্তন করে সেখানে শিল্পপ্রতিষ্ঠান গড়ে তোলা হয়েছে।

স্থানীয় বাসিন্দা তাজ উদ্দিন বলেন, ‘নাসির ফুটওয়্যার প্রায় ২০০ একর জমির ওপর হচ্ছে। আমার এক একর ৭০ শতাংশ জমি স্থানীয় একজনের মাধ্যমে কোম্পানিকে দিয়েছি। কিন্তু এখনো পুরো টাকা পাইনি। টাকা দেওয়ার কথা বলছে, কিন্তু কবে পাব, তা বুঝতে পারছি না।’
তিনি বলেন, ‘একসময় এই জমিতে ধান, পাট ও মাছ চাষ করা হতো। পরে কোম্পানি মানুষের কাছ থেকে জমি কিনে নেয়।’
আরেক বাসিন্দা রফিকুল ইসলাম বলেন, ‘কর্মসংস্থান ও লাভের আশায় দালালদের চাপের মুখে কৃষকেরা কলকারখানায় জমি দিতে বাধ্য হচ্ছেন। এতে জেলার একের পর এক কৃষিজমি অকৃষি ব্যবহারে চলে যাচ্ছে। আবার কোম্পানির ময়লা-আবর্জনায়ও ফসলের ক্ষতি হচ্ছে।’
ফুলবাড়ীয়া উপজেলায় দেশের অন্যতম বৃহৎ বদ্ধ জলাভূমি বড়বিলা বিলের পাড়ে কৃষিজমি ভরাট করে একটি কোম্পানি গড়ে তোলার কাজ চলছে। এ নিয়ে স্থানীয়দের মধ্যে ক্ষোভ থাকলেও প্রশাসনের কার্যকর উদ্যোগ নেই বলে অভিযোগ তাদের।
স্থানীয় বাসিন্দা সেলিম হোসাইন বলেন, ‘বড়বিলার মাঝখান দিয়ে ৩৩ হাজার ভোল্টের বিদ্যুৎ লাইন নির্মাণের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছিল। স্থানীয়দের বাধার মুখে আপাতত কাজ বন্ধ রয়েছে। বিলের মাঝখান দিয়ে বিদ্যুতের লাইন নির্মাণ করা হলে সেখানে আসা শত শত পর্যটকের জীবন ঝুঁকির মুখে পড়বে।’

১০ বছরে কমেছে ২০ হাজার হেক্টর জমি
কৃষি বিভাগের তথ্য অনুযায়ী, ২০১৬-১৭ অর্থবছরে ময়মনসিংহ জেলায় আবাদি জমির পরিমাণ ছিল ৩ লাখ ৩১ হাজার ৮২৩ হেক্টর। এরপর প্রতিবছরই কমেছে আবাদি জমি। ২০১৭-১৮ অর্থবছরে ৬৪৯ হেক্টর, ২০১৮-১৯ অর্থবছরে ১ হাজার ৪১৬ হেক্টর, ২০১৯-২০ অর্থবছরে ১ হাজার ৪২৫ হেক্টর, ২০২০-২১ অর্থবছরে ১ হাজার ৪৩২ হেক্টর, ২০২১-২২ অর্থবছরে ১ হাজার ৬৯৮ হেক্টর, ২০২২-২৩ অর্থবছরে ২ হাজার ২৩ হেক্টর, ২০২৩-২৪ অর্থবছরে ২ হাজার ৬২৮ হেক্টর, ২০২৪-২৫ অর্থবছরে ৪ হাজার ৫৭১ হেক্টর এবং ২০২৫-২৬ অর্থবছরে ৪ হাজার ৫৭২ হেক্টর আবাদি জমি কমেছে।
কৃষি বিভাগের হিসাব অনুযায়ী, ১০ বছরে জেলায় মোট ২০ হাজার ৪১৪ হেক্টর আবাদি জমি কমেছে।
ভালুকায়ও কৃষিজমি কমার চিত্র উদ্বেগজনক। ২০২০ সালে উপজেলায় আবাদি জমির পরিমাণ ছিল ২৭ হাজার ৮৬৯ হেক্টর। ২০২১ থেকে ২০২৬—এই ছয় বছরে তা কমেছে ৪ হাজার ৬০৭ হেক্টর।
ভালুকা উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা নুসরাত জামান বলেন, ‘ভালুকায় প্রতিনিয়ত কলকারখানা হচ্ছে। এতে কৃষিজমি কমছে। অনেক সময় চাপের মুখে কৃষিজমিকে অকৃষি দেখিয়ে আমাদের প্রত্যয়ন দিতে হচ্ছে।’

ময়মনসিংহ কৃষি সম্প্রসারণ অধিদফতরের উপপরিচালক মো. এনামুল হক বলেন, ‘জেলার কোনো জমিকেই অকৃষি বলা যাবে না। এসব জমিতে কোনো না কোনোভাবে ফসল কিংবা মাছ চাষ হয়ে থাকে। জমি রক্ষায় আইনও মানা হচ্ছে না। চাপের মুখে অনেক সময় কৃষিজমিকে অকৃষি দেখিয়ে প্রত্যয়ন দিতে হচ্ছে। এর ফলে প্রতিনিয়ত কমছে কৃষিজমির পরিমাণ।’
একের পর এক শিল্পকারখানা গড়ে ওঠায় কৃষিজমি কমার পাশাপাশি পরিবেশও হুমকির মুখে পড়ছে বলে মনে করছেন পরিবেশকর্মীরা।
বাংলাদেশ পরিবেশ আন্দোলনের (বাপা) ভালুকা শাখার সদস্যসচিব কামরুল হাসান পাঠান কামাল বলেন, ‘বর্তমান ও ভবিষ্যৎ প্রজন্মকে পরিবেশ বিপর্যয়ের হাত থেকে রক্ষা করতে সরকারকে এখনই কার্যকর উদ্যোগ নিতে হবে। ভালুকায় ছোট-বড় মিলিয়ে প্রায় ১৪৫টি কলকারখানা রয়েছে। গত ২০ বছর ধরে কৃষিজমিকে অকৃষি দেখিয়ে শিল্পকারখানা গড়ে তোলার কর্মযজ্ঞ চলছে।’
_20260821_124541251.jpg)
তিনি আরও বলেন, ‘ময়মনসিংহের ১৩ উপজেলার মধ্যে ভালুকার পাশাপাশি ত্রিশাল, ফুলবাড়ীয়া ও সদর উপজেলাতেও শিল্পকারখানা বাড়ছে। পরিকল্পনাহীন শিল্পায়ন ও অপরিকল্পিত নগরায়ণ অব্যাহত থাকলে ভবিষ্যতে কৃষিজমির সংকট আরও তীব্র হবে। তাই সরকারকে এখনই তৎপর হতে হবে।’