Dhaka Mail Logo

সারাদেশ

কৃষকের আগ্রহ কমছে ‘সোনালি আঁশ’ চাষে, বদলে যাচ্ছে নীলফামারীর কৃষিচিত্র

জেলা প্রতিনিধি

২১ আগস্ট ২০২৬, ০৮:৩৪ এএম

একসময় নীলফামারীর গ্রামীণ অর্থনীতির সঙ্গে গভীরভাবে জড়িয়ে ছিল পাট। ‘সোনালি আঁশ’ হিসেবে পরিচিত এই ফসল ছিল কৃষকের অন্যতম প্রধান অর্থকরী ফসল। পাট কাটা, জাগ দেওয়া, আঁশ ছাড়ানো, শুকানো ও বাজারজাতকরণ ঘিরে বর্ষাকালে গ্রামাঞ্চলে তৈরি হতো বাড়তি কর্মচাঞ্চল্য। তবে উৎপাদন খরচ বৃদ্ধি, শ্রমিক সংকট, জাগ দেওয়ার উপযোগী পানির অভাবসহ নানা অনিশ্চয়তায় পাট চাষ থেকে মুখ ফিরিয়ে নিচ্ছেন অনেক কৃষক।

অন্যদিকে তুলনামূলক কম সময়ে ঘরে তোলা, পরিচর্যার ঝামেলা কম এবং বাজারে চাহিদা থাকায় কৃষকের কাছে বাড়ছে ভুট্টার আকর্ষণ। ফলে নীলফামারীর বিভিন্ন এলাকায় পাটের জমিতে জায়গা করে নিচ্ছে ভুট্টা। কৃষকের এই ফসল পরিবর্তন শুধু একটি ফসলের জায়গায় আরেকটি ফসলের আবাদ নয়; বরং উত্তরাঞ্চলের কৃষিতে লাভ-ঝুঁকির বদলে যাওয়া হিসাবেরও ইঙ্গিত দিচ্ছে।

জেলার বিভিন্ন এলাকা ঘুরে দেখা গেছে, বিস্তীর্ণ কৃষিজমিতে আগের মতো পাট চাষ চোখে পড়ে না। অনেক জমিতে ভুট্টা চাষ করা হয়েছে। এরপর ওই জমিতে ধান চাষ করা হয়েছে।

কৃষকেরা বলছেন, ফসল নির্বাচন এখন আর শুধু অভ্যাসের ওপর নির্ভর করছে না। উৎপাদন খরচ, সময়, শ্রম, বাজারদর ও বিক্রির নিশ্চয়তা—সবকিছু হিসাব করেই জমিতে ফসল নির্বাচন করছেন তারা।

4ee635d8-9565-433a-bc6a-53fcbd283852

কৃষক জলিল মিয়া বলেন, পাট চাষ এখন আর আগের মতো করা হয় না। এর প্রধান কারণ জাগ দেওয়া। পাট কাটার পর আঁশ পচানোর জন্য দীর্ঘ সময় পানিতে জাগ দিতে হয়। কিন্তু অনেক এলাকায় প্রয়োজনীয় গভীর ও পরিষ্কার পানি পাওয়া যায় না। ফলে কখনো দূরের জলাশয়ে নিয়ে, আবার কখনো কৃত্রিমভাবে জাগ দেওয়ার ব্যবস্থা করতে হয়।

কৃষক অরবিন্দু রায় বলেন, পাট চাষে এখন অনেক সময় ক্ষতির আশঙ্কা থাকে। পাট চাষের পর অতিরিক্ত বৃষ্টিতে জমিতে পানি জমে গেলে ফলন ক্ষতিগ্রস্ত হয়। এ ছাড়া পাট কাটার পর আঁটি বাঁধা, বহন, জাগ দেওয়া, আঁশ ছাড়ানো, ধোয়া ও শুকানো—প্রতিটি ধাপেই শ্রমিকের প্রয়োজন হয়। শ্রমিকের মজুরি বাড়ায় উৎপাদন খরচও বেড়েছে।

কৃষকদের দাবি, পাটের দাম ভালো থাকলেও শ্রমিকের বাড়তি খরচ, বৈরী আবহাওয়া ও ফলন কমে যাওয়ার কারণে প্রত্যাশিত দাম না পেলে লোকসানের আশঙ্কা থাকে। এ কারণে অনেকেই তুলনামূলক কম ঝুঁকির ফসলের দিকে ঝুঁকছেন।

7e86616e-4d6d-41e1-97a2-af6de16e15ee

কৃষকদের মতে, ভুট্টার বড় সুবিধা হলো তুলনামূলক কম সময়ে ফসল ঘরে তোলা যায়। পাটের মতো জাগ দেওয়া, আঁশ ছাড়ানো কিংবা দীর্ঘ প্রক্রিয়াজাতকরণের প্রয়োজন হয় না। ভুট্টা শুকিয়ে সংরক্ষণ ও পরিবহনও তুলনামূলক সহজ। পশুখাদ্য ও পোলট্রি ফিড তৈরিতে ভুট্টার ব্যাপক চাহিদা থাকায় স্থানীয় বাজারেও এর ক্রেতা পাওয়া যায়।

কৃষকেরা জানান, ভালো ফলন ও বাজারদর থাকলে ভুট্টা থেকে দ্রুত অর্থ ফেরত পাওয়া যায়। একই জমিতে পরবর্তী ফসল আবাদ করার সুযোগও তৈরি হয়। এই বিষয়টিও ফসল নির্বাচনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছে।

4007b4a4-face-475d-8636-e0533831cf8c

নীলফামারীর ডোমার উপজেলার কয়েকজন কৃষকের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, তারা আগে নিয়মিত পাট চাষ করলেও এখন জমির বড় একটি অংশে ভুট্টা আবাদ করছেন।

কৃষক জামিয়ার রহমান বলেন, ‘পাট চাষ করলে সব সময় আতঙ্কের মধ্যে থাকতে হয়। প্রথমত নিড়ানি ও সারের খরচ, এরপর সবচেয়ে বড় সমস্যা কাটা ও জাগ দেওয়া। আর ভুট্টা লাগানোর পর নিড়ানি ও সার দেওয়ার কাজ নিজেই করা যায়। ফসল তোলার পর মাড়াইয়ের জন্যও এখন মেশিন পাওয়া যায়। তাই পাটের মতো ভুট্টা নিয়ে এত চিন্তায় থাকতে হয় না।’

68012f07-53d9-4c7e-9a29-2256a7539ae5

কৃষক লোকমান হোসেন বলেন, ‘কৃষক এখন লাভের হিসাব করে চাষ করেন। যে ফসলে সময় কম লাগে, খরচ নিয়ন্ত্রণে থাকে এবং বিক্রি করে দ্রুত টাকা পাওয়া যায়, স্বাভাবিকভাবেই সেদিকেই কৃষকের আগ্রহ বেশি।’

তবে পাট চাষে দীর্ঘদিনের অভিজ্ঞতা থাকা কৃষকদের কেউ কেউ বলছেন, পাটের বাজারদর ও আবহাওয়া অনুকূলে থাকলে এখনো এটি লাভজনক ফসল হতে পারে। কিন্তু ন্যায্যমূল্য ও বাজার ব্যবস্থাপনায় অনিশ্চয়তা থাকায় অনেকেই ঝুঁকি নিতে চাইছেন না।

ba7d02c2-0a25-40ba-9ce5-cd7af2794aac

ডোমার উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা রফিকুল ইসলাম বলেন, ‘ডোমার উপজেলায় ৯৫০ হেক্টর জমিতে পাট চাষ হয়েছে। এ বছর পাটের দাম মোটামুটি ভালো। তবে গত দুই-তিন বছর ধরে প্রায় সারা দেশে পাট জাগ দেওয়া নিয়ে সমস্যা দেখা দিচ্ছে। এ ছাড়া হঠাৎ বৃষ্টি, বীজ নষ্ট হওয়া ও শ্রমিক সংকটের মতো সমস্যার কারণেও কৃষকদের আগ্রহ কমছে।’

একসময় যে পাট ছিল নীলফামারীর কৃষকের অর্থনৈতিক স্বপ্নের অংশ, সেই জমিতেই এখন সারি সারি ভুট্টা। মাঠের এই পরিবর্তন তাই শুধু ফসলের পরিবর্তন নয়, এটি কৃষকের বদলে যাওয়া অর্থনৈতিক বাস্তবতারও প্রতিচ্ছবি। কৃষক এখন আবেগ নয়, হিসাবের ভিত্তিতে ফসল বেছে নিচ্ছেন। সেই হিসাব পাটের পক্ষে ফেরাতে হলে উৎপাদন থেকে বাজার পর্যন্ত প্রতিটি ধাপে কৃষকের ঝুঁকি কমানোই হবে বড় চ্যালেঞ্জ।

প্রতিনিধি/এসএস