Dhaka Mail Logo

সারাদেশ

নওগাঁয় কোটি টাকার খাল খননে অনিয়মের অভিযোগ

জেলা প্রতিনিধি

২০ আগস্ট ২০২৬, ১১:৫৮ এএম

নওগাঁর মান্দা উপজেলায় কোটি টাকার দুটি খাল পুনঃখনন কাজে বড় অনিয়মের অভিযোগ উঠেছে। সরকারি নিয়ম অনুযায়ী তালিকাভুক্ত শ্রমিক দিয়ে খাল খননের কথা থাকলেও কোনো প্রকার শ্রমিকের উপস্থিতি ছাড়াই এস্কেভেটর (ভেকু) মেশিন দিয়ে কাজ শেষ করা হয়েছে। এছাড়া শ্রমিকদের তালিকায় রয়েছে ব্যবসায়ী, মুদি দোকানদার, সচ্ছল কৃষক এবং রাজনৈতিক কর্মীদের নাম। জমি অধিগ্রহণ না করে ব্যাক্তি মালিকানাধীন জমির ওপর দিয়ে জোরপূর্বক খাল খননের অভিযোগ উঠেছে।

এদিকে, জেলার ১০টি উপজেলায় ১৩টি খাল পুনঃখনন প্রকল্পের কাজ শেষে অব্যয়িত ১ কোটি ৩৯ লাখ ৫৪ হাজার ৯৮২ টাকা সরকারের কোষাগারে জমা দিয়েছে প্রশাসন। সরকারি অর্থের অপচয় রোধ এবং স্বচ্ছতার সঙ্গে প্রকল্প বাস্তবায়ন করায় এ অর্থ সাশ্রয় হয়েছে বলে জানিয়েছেন সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা।

জানা যায়, মান্দা উপজেলার কুসুম্বা ইউনিয়নের হারকিশোর মৌজার বিল উথরাইল ব্রিজ থেকে বাদলঘাটা ব্রিজ পর্যন্ত এবং ভারশোঁ ইউনিয়নের বাকাপুর মৌজার বাকাপুর দফাদার মোড় থেকে বিল উথরাইল পর্যন্ত ৩ দশমিক ৬ কিলোমিটার দুটি খাল খননে বরাদ্দ দেওয়া হয় ১ কোটি ৮ লাখ  টাকা। এই বরাদ্দের মধ্যে শ্রমিক বাবদ ধরা ছিল ৫০ লাখ টাকা। বাকি অর্থ বরাদ্দ ছিল ভেকু পরিচালনা, গাছ লাগানো ও সৌন্দর্যবর্ধনে। প্রকল্পে প্রতিদিন ১২৫ জন করে ২৫০ জন শ্রমিক নিয়োগের কথা থাকলেও পুরো কাজই এক্সকেভেটর (ভেকু) মেশিন দিয়ে করা হয়েছে। উপজেলা প্রকল্প বাস্তবায়ন কর্মকর্তাসহ প্রকল্প বাস্তবায়ন কমিটির সদস্যরা মোটা অংকের এই অর্থ হরিলুট করতে প্রতিদিন ১২৫ জন করে ২৫০ শ্রমিককে দেখানো হয়েছে। ৪০ দিনে ১০ হাজার শ্রমিকের মধ্যে ৬১ শ্রমিককে অনুপস্থিত দেখানো হয়েছে। ভুতুড়ে শ্রমিক দেখিয়ে তুলে নেওয়া হয়েছে শ্রমিক মজুরির প্রায় ৫০ লাখ টাকা। এছাড়া দুই খালের ওপর আলাদা বরাদ্দে দুটি ফুট ওভারব্রিজ নির্মাণের কথা থাকলেও তা করা হয়নি। এ দুটি ফুট ওভারব্রিজ নির্মাণের ব্যয় প্রায় ১৪ লাখ টাকা ধরা হয়েছে বলে একটি সূত্র জানিয়েছে।

ভারশোঁ ইউনিয়নের কামারপুর গ্রামের বাসিন্দা প্রীতি রানী বলেন, জমি অধিগ্রহণ না করে ব্যক্তি মালিকানাধীন জমির ওপর দিয়ে জোরপূর্বক খাল খনন শুরু করলে কয়েকটি গ্রামের লোকজন অভিযোগ দেয়।

প্রীতি রানী বলেন, এই খাল খননে তার ৫৩ শতক জমি খালের মধ্যে পড়েছে। তিনি অভিযোগ করেও কোনো সুরাহা পাননি।

ভারশোঁ গ্রামের বাসিন্দা মোখলেসুর রহমান বলেন, প্রকল্প এলাকা দিয়েই প্রতিদিন যাওয়া-আসা ছিলো। কাজ চলাকালীন এক মাসের অধিক সময়ে কোনো দিনমজুরকে প্রকল্পের কাজ করতে দেখেনি।

91a5c590-1b90-4f90-8ac2-1950a5797e5b

আনোয়ার হোসেন নামে এক কৃষক বলেন, ‘খাল পুনঃখননে বড় ধরনের চুরি হয়েছে। উপজেলা প্রকল্প বাস্তবায়ন কর্মকর্তার সহযোগিতায় কুসুম্বা ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান ও ভারশোঁ ইউনিয়নের পরিষদের চেয়ারম্যানসহ বিএনপি-আ.লীগের কিছু লোকজন মিলেমিশে প্রকল্প হরিলুট করেছে।

প্রকল্প বাস্তবায়ন কমিটির সভাপতি (পিআইসি) কুসুম্বা ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান নওফেল আলী মন্ডল বলেন, খনন কাজে মোট চারটি এস্কেভেটর (ভেকু) ব্যবহার করা হয়েছে। ২৫০ জন শ্রমিকের তালিকা সঠিক। প্রতিদিন দুই ইউনিয়নের ২/১ জন ছাড়া সব শ্রমিক কাজ করেছেন। কয়েকজন সচ্ছল ব্যক্তির নাম ভুলবশত তালিকায় চলে যেতে পারে। পিআইও যেভাবে নির্দেশনা দিয়েছেন সেভাবে আমরা কাজ করেছি।

মান্দা উপজেলা নির্বাহী অফিসার (ইউএনও) আখতার জাহান সাথী বলেন, আমাকে অনেক ধরনের কাজ করতে হয়। খাল পুনঃখননের সঠিক কোনো তথ্য আমার কাছে নেই। উপজেলা প্রকল্প বাস্তবায়ন কর্মকর্তার সঙ্গে কথা বলে তথ্য নেন।

মান্দা উপজেলা প্রকল্প বাস্তবায়ন কর্মকর্তা (পিআইও) আরিফুল ইসলাম বলেন, প্রকল্প বাস্তবায়ন কমিটির মাধ্যমে সঠিকভাবে কাজ করা হয়েছে। ৪০ দিনে দুই ইউনিয়নে ১২৫ জন করে মোট ২৫০ জন হতদরিদ্র শ্রমিক কাজ করেছে। তালিকায় কোনো অনিয়ম করা হয়নি। ৪০ দিন ৬১ জন শ্রমিক অনুপস্থিত ছিল। এই ৬১ জন শ্রমিকের প্রতিদিন ৫০০ টাকা হারে বেঁচে যাওয়া ৩০ হাজার ৫০০ টাকা সরকারি কোষাগারে জমা দেওয়া হয়েছে।

 

জেলা প্রশাসন সূত্রে জানা গেছে, জেলায় ১০টি উপজেলার ১৩টি খাল পুনঃখনন বাবদ মোট বরাদ্দ দেওয়া হয়েছিল ৮ কোটি ৭০ লাখ ৩৯ হাজার ৩৯৭ টাকা। যার মধ্যে প্রকৃত ব্যয় হয়েছে ৭ কোটি ৩০ লাখ ৮৪ হাজার ৪১৫ টাকা। খাল পুনঃখনন কাজ শেষে নওগাঁ সদর উপজেলা ৪১ লাখ ৫০ হাজার, বদলগাছি উপজেলা ৪০ লাখ ৫০ হাজার, পোরশা উপজেলা ১২ লাখ ৮৯ হাজার, মহাদেবপুর উপজেলা ১২ লাখ ৫০ হাজার, নিয়ামতপুর উপজেলা ৯ লাখ ৮৩ হাজার,  পত্নীতলা উপজেলা ৯ লাখ ১৭ হাজার, আত্রাই উপজেলা ৪ লাখ ৭৬ হাজার, রানীনগর ৪ লাখ ৬৭ হাজার, ধামইরহাট উপজেলা ৩ লাখ ৪৬ হাজার এবং মান্দা উপজেলা থেকে মাত্র ৩০ হাজার ৫০০ টাকা সরকারি কোষাগারে ফেরত দিয়েছেন প্রশাসন।

নওগাঁর জেলা প্রশাসক মোহাম্মদ সাইফুল ইসলাম বলেন, খাল পুনঃখনন প্রকল্পের কাজ শেষ হয়েছে। প্রকল্প শেষ হওয়ার পরপরই ওইসব এলাকার সাধারণ মানুষ এর সুফল পেতে শুরু করেছেন। প্রকল্পের অব্যয়িত ১ কোটি ৩৯ লাখ ৫৪ হাজার ৯৮২ টাকা সরকারি কোষাগারে ফেরত দেওয়া হয়েছে। খাল খননে নিজ নিজ উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তাদের তদারকির মাধ্যমে খনন কাজ শেষ হয়েছে। আর যেগুলোতে একটু সমস্যা দেখা গেছে সেগুলো পুনরায় সংস্কার করা হয়েছে।

প্রতিনিধি/টিবি