জেলা প্রতিনিধি
১৯ আগস্ট ২০২৬, ০৬:২৪ পিএম
একজন প্রয়াত, অন্যজন জীবিত। দুজনের নামই নুরুল ইসলাম। তবে দুজনের ঠিকানা ভিন্ন।
অভিযোগ উঠেছে, একই গেজেট নম্বর ব্যবহার করে দুজনই বীর মুক্তিযোদ্ধার স্বীকৃতি ও ভাতা পেয়েছেন। এ নিয়ে বিরোধ গড়িয়েছে তদন্ত পর্যন্ত। কিন্তু তদন্তের দায়িত্ব দেওয়ার ১০ মাস পেরিয়ে গেলেও প্রতিবেদন জমা হয়নি।
ফলে প্রয়াত বীর মুক্তিযোদ্ধা নুরুল ইসলামের পরিবার যেমন হয়রানির শিকার হচ্ছে, তেমনি বিষয়টি নিয়ে তৈরি হয়েছে নানা প্রশ্ন।
বরিশালের গৌরনদী উপজেলার সরিকল গ্রামের প্রয়াত নুরুল ইসলাম পেশায় ছিলেন রিকশাচালক। একাত্তরের মুক্তিযুদ্ধে অংশ নিয়ে তিনি বীর মুক্তিযোদ্ধার স্বীকৃতি পান। জীবদ্দশায় সরকারি ভাতাসহ মুক্তিযোদ্ধা হিসেবে প্রাপ্য সব সুযোগ-সুবিধা ভোগ করেছেন। ২০২০ সালের ১৭ আগস্ট মৃত্যুর পর তাকে রাষ্ট্রীয় মর্যাদায় দাফন করা হয়।
অভিযোগকারী প্রয়াত নুরুল ইসলামের ছেলে মো. নাসির বলেন, তার বাবার গেজেট নম্বর ৩৪৯৩। মুক্তিযোদ্ধা হিসেবে গেজেটভুক্ত হওয়ার পর মৃত্যুর আগ পর্যন্ত নিয়মিত ভাতা পেয়েছেন তিনি। এমনকি মুক্তিযোদ্ধা অ্যাকাউন্টের বিপরীতে ঋণও নিয়েছিলেন।
নাসিরের ভাষ্য, তার বাবার বেসামরিক গেজেটে পিতার নাম আমজাদ আলী হাওলাদারের পরিবর্তে মোসলেম উদ্দিন মুন্সী লেখা হয়। এ ভুল সংশোধনের জন্য ২০০৫ সালের ৮ সেপ্টেম্বর মুক্তিযুদ্ধ বিষয়ক মন্ত্রণালয়ের সচিব বরাবর আবেদন করেন তার বাবা। পরে ২০১৮ সালের ২৯ মার্চও একই বিষয়ে আবেদন করা হয়। কিন্তু গেজেট সংশোধন হয়নি।
এরই মধ্যে মুক্তিযোদ্ধাদের এমআইএস (ম্যানেজমেন্ট ইনফরমেশন সিস্টেম) সৃজনের নির্দেশনা এলে ২০২০ সালের ১ আগস্ট নুরুল ইসলাম এমআইএস সৃজনের জন্য আবেদন করেন। এর ১৬ দিন পরই তিনি মারা যান। পরে তাকে গার্ড অব অনারসহ রাষ্ট্রীয় মর্যাদায় দাফন করা হয়।
নাসির বলেন, বাবার মৃত্যুর পর ২০২০ সালের ২৯ আগস্ট এমআইএস-সংক্রান্ত কাগজপত্র সংগ্রহ করে নিজের নামে সোনালী ব্যাংকে অ্যাকাউন্ট খোলেন। সেখান থেকে মুক্তিযোদ্ধা ভাতার টাকাও উত্তোলন করেন তিনি। ২০২১ সালে এমআইএস সংশোধনের জন্য আবেদন করতে গিয়ে বিষয়টি তার নজরে আসে।
তিনি বলেন, এমআইএসে গিয়ে দেখি, আমার বাবার ছবির জায়গায় অন্য একজনের ছবি। পরে জানতে পারি, ওই ব্যক্তির নামও নুরুল ইসলাম। তার বাড়ি মুলাদী উপজেলার গাছুয়া এলাকায়।
নাসিরের অভিযোগ, গৌরনদীর হোসনাবাদ এলাকার কয়েকজন ব্যক্তি ও সরকারি কিছু কর্মচারীর যোগসাজশে তার বাবার গেজেট নম্বর ব্যবহার করে মুলাদীর নুরুল ইসলামকে মুক্তিযোদ্ধা হিসেবে অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে। এ বিষয়ে তিনি মুক্তিযুদ্ধ বিষয়ক মন্ত্রণালয়ে লিখিত অভিযোগ করেন।
অভিযোগের পর তৎকালীন গৌরনদী উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) বিপিন চন্দ্র বিশ্বাসের কার্যালয়ে বিষয়টি নিয়ে তদন্ত হয় বলে জানান নাসির।
তার দাবি, ওই তদন্তে উপস্থিত মুক্তিযোদ্ধাদের সামনে মুলাদীর নুরুল ইসলাম মুচলেকা দিয়ে মুক্তিযোদ্ধা ভাতা ত্যাগ করেন এবং ভবিষ্যতে নিজেকে মুক্তিযোদ্ধা দাবি করবেন না বলে জানান।
তবে নাসিরের অভিযোগ, তদন্তের কয়েকদিন পরই আবার তিনি মুক্তিযোদ্ধা হিসেবে দাবি করে ভাতা নেওয়া শুরু করেন। বর্তমানে তার নামে মুক্তিযোদ্ধা ভাতাও চালু রয়েছে।
নাসির আরও বলেন, প্রথম দফার অভিযোগের পর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তার কার্যালয় থেকে প্রতিবেদন মন্ত্রণালয়ে পাঠানো হলেও বিষয়টির কোনো সুরাহা হয়নি। পরে মন্ত্রণালয়ে যোগাযোগ করলে তাকে পুনঃতদন্তের জন্য আবেদন করতে বলা হয়।
২০২৫ সালে পুনঃতদন্তের জন্য আবেদন করেন নাসির। ওই আবেদনের পরিপ্রেক্ষিতে গৌরনদী উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা এক চিঠিতে বিষয়টি তদন্তের জন্য উপজেলা সহকারী কমিশনার (ভূমি) মো. মেহেদী হাসান ও উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা মো. সেকেন্দার শেখকে দায়িত্ব দেন।
নাসিরের অভিযোগ, তদন্তের দায়িত্ব দেওয়ার পর ১০ মাস পেরিয়ে গেলেও তদন্ত শুরু হয়নি। এ বিষয়ে তিনি একাধিকবার এসিল্যান্ডের কাছে গেলেও তাকে আদালতে যাওয়ার পরামর্শ দেওয়া হয়েছে।
ক্ষোভ প্রকাশ করে নাসির বলেন, আমি ট্যানারিতে কাজ করে সামান্য আয় দিয়ে কোনোভাবে সংসার চালাই। আদালতে মামলা করতে টাকা লাগে। সেই টাকা আমি কোথায় পাব?
তার দাবি, তার বাবার মুক্তিযোদ্ধার স্বীকৃতি ও গেজেট নিয়ে তৈরি হওয়া জটিলতার দ্রুত নিষ্পত্তি করা হোক। একজন প্রকৃত বীর মুক্তিযোদ্ধার সম্মান রক্ষায় তথ্য ও সম্প্রচারমন্ত্রী এবং বরিশাল-১ আসনের সংসদ সদস্য এম জহির উদ্দিন স্বপনসহ মুক্তিযুদ্ধ বিষয়ক মন্ত্রণালয়ের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের হস্তক্ষেপও কামনা করেন তিনি।
নাসিরের অভিযোগের সত্যতা যাচাই করতে সরিকল এলাকার অন্তত পাঁচজন মুক্তিযোদ্ধার সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, তারা প্রয়াত নুরুল ইসলামকে রণাঙ্গনের মুক্তিযোদ্ধা হিসেবে চেনেন। তাদের দাবি, মুলাদীর নুরুল ইসলাম গৌরনদী এলাকায় যুদ্ধ করেছেন— এমন তথ্য তাদের জানা নেই।
বিষয়টি সঠিকভাবে তদন্ত করে প্রকৃত ঘটনা বের করার দাবি জানিয়েছেন তারা।
সরিকল ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান ফারুক হোসেন মোল্লা বলেন, সরিকল গ্রামের প্রয়াত নুরুল ইসলাম একজন প্রকৃত বীর মুক্তিযোদ্ধা ছিলেন। অপর নুরুল ইসলামের বাড়ি মুলাদীর গাছুয়া এলাকায়। তিনি এ এলাকায় যুদ্ধ করেছেন বলে কখনো শুনিনি। বিষয়টি সংশ্লিষ্ট দপ্তরের খতিয়ে দেখা উচিত।
তবে প্রয়াত নুরুল ইসলামের ছেলে নাসিরের সব অভিযোগ অস্বীকার করেছেন মুলাদীর গাছুয়া এলাকার নুরুল ইসলাম।
তিনি বলেন, আমি প্রকৃত বীর মুক্তিযোদ্ধা। অন্য কারও গেজেট ব্যবহার করে মুক্তিযোদ্ধা হইনি। বরং আমার গেজেট দিয়ে অন্য একজন ভাতা উত্তোলন করত।
তিনি জানান, হাইকোর্টে রিট করার পর বর্তমানে তিনি মুক্তিযোদ্ধা ভাতা উত্তোলন করছেন।
তৎকালীন ইউএনওর কার্যালয়ে মুচলেকা দিয়ে মুক্তিযোদ্ধা ভাতা ত্যাগ এবং ভবিষ্যতে নিজেকে মুক্তিযোদ্ধা দাবি না করার বিষয়ে জানতে চাইলে নুরুল ইসলাম কোনো জবাব দেননি। এ বিষয়ে প্রতিবেদকের সঙ্গে দেখা করে কথা বলবেন জানিয়ে ফোনের সংযোগ বিচ্ছিন্ন করে দেন।
১০ মাসেও তদন্ত প্রতিবেদন না দেওয়ার বিষয়ে জানতে উপজেলা সহকারী কমিশনার (ভূমি) মো. মেহেদী হাসানের মুঠোফোনে একাধিকবার কল করা হলেও তিনি ফোন ধরেননি। পরে হোয়াটসঅ্যাপে বার্তা পাঠানো হলেও কোনো জবাব পাওয়া যায়নি।
উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা মো. সেকেন্দার শেখের কাছে জানতে চাইলে তিনিও এ বিষয়ে কোনো মন্তব্য করতে রাজি হননি।
তবে উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা মো. ইব্রাহীম বলেন, এখন পর্যন্ত কেন তদন্ত প্রতিবেদন দেওয়া হয়নি, তা খতিয়ে দেখে পরবর্তী ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
এদিকে একই গেজেট নম্বর ঘিরে দুই ব্যক্তির মুক্তিযোদ্ধা দাবি এবং তদন্তে দীর্ঘসূত্রতা নিয়ে এলাকায় নানা প্রশ্ন দেখা দিয়েছে।
স্থানীয়দের দাবি, বিষয়টি আর ঝুলিয়ে না রেখে সংশ্লিষ্ট নথিপত্র যাচাই, প্রত্যক্ষদর্শীদের বক্তব্য এবং গেজেটের তথ্য পর্যালোচনা করে দ্রুত প্রকৃত ঘটনা প্রকাশ করা হোক।
প্রতিনিধি/এলএ