Dhaka Mail Logo

শিক্ষা / সারাদেশ

ভ্যান বিক্রি, জমি বন্ধক, সহপাঠীদের সহায়তা—তবুও বাঁচানো গেল না হুসাইনকে

জেলা প্রতিনিধি

১৭ আগস্ট ২০২৬, ০৭:৪৪ পিএম

বিশ্ববিদ্যালয়ের পড়াশোনা শেষ করে ভালো চাকরি করবেন। পরিবারের অভাব দূর করবেন। ভ্যান চালিয়ে সংসার চালানো বাবার কষ্ট লাঘব করবেন—এমন স্বপ্ন ছিল বরিশাল বিশ্ববিদ্যালয়ের (ববি) বাংলা বিভাগের শিক্ষার্থী হুসাইন গোলদারের (২৪)। কিন্তু মরণব্যাধি থামিয়ে দিল তার সেই স্বপ্ন।

হুসাইনকে বাঁচাতে সহপাঠীরা অর্থ সংগ্রহ করেছেন। পাশে দাঁড়িয়েছেন শিক্ষক, বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন ও স্থানীয় লোকজন। ছেলের চিকিৎসার খরচ জোগাতে জমি বন্ধক রেখেছে পরিবার। ধার করেছে। এমনকি সংসার চালানোর একমাত্র অবলম্বন ভ্যানটিও বিক্রি করেছে। তবু শেষ পর্যন্ত বাঁচানো গেল না তাকে।

ভারতের ভেলোরে চিকিৎসাধীন হুসাইনকে উন্নত চিকিৎসার জন্য বাংলাদেশে ফিরিয়ে আনা হচ্ছিল। সোমবার (১৭ আগস্ট) বাংলাদেশ সময় দুপুর পৌনে একটার দিকে ভারতের অন্ধ্রপ্রদেশের একটি এলাকায় পৌঁছালে আইসিইউ অ্যাম্বুলেন্সেই তার মৃত্যু হয়। বিষয়টি নিশ্চিত করেছেন তার ছোট ভাই জাহিদুল গোলদার।

হুসাইন ববির বাংলা বিভাগের ২০২১-২২ শিক্ষাবর্ষের শিক্ষার্থী ছিলেন। তার বাড়ি খুলনার পাইকগাছা উপজেলার গদাইপুর ইউনিয়নের পুরাইকাটি গ্রামে। তিনি শহিদুল গোলদারের ছেলে। তিন ভাইয়ের মধ্যে হুসাইন ছিলেন মেঝো।

4465fc61-21ee-4b4e-ba5a-f3009bc80ac9

চিকিৎসায় খরচ সাড়ে ৭ লাখ টাকা

পরিবার ও সহপাঠীদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, প্রথমে হুসাইনের যক্ষ্মা (টিবি) ধরা পড়ে। পরে জটিলতা দেখা দিলে তার ফুসফুসে ক্যানসার শনাক্ত হয়। বরিশালে প্রাথমিক চিকিৎসার পর ঢাকায় চিকিৎসকের পরামর্শ নেন তিনি। প্রায় দেড় থেকে দুই মাস ওষুধ সেবন করেও অবস্থার উন্নতি হয়নি।

গত ১৪ জুলাই উন্নত চিকিৎসার জন্য তাকে ভারতের তামিলনাড়ুর ভেলোরের ক্রিশ্চিয়ান মেডিকেল কলেজ (সিএমসি) হাসপাতালে নেওয়া হয়। সেখানে চিকিৎসকেরা তার অবস্থা জটিল বলে জানান। একটি কেমোথেরাপি দেওয়ার পাশাপাশি ১০ থেকে ১৫ দিন আইসিইউতে চিকিৎসাধীন ছিলেন তিনি।

হুসাইনের চিকিৎসায় পরিবারের প্রায় ৭ থেকে সাড়ে ৭ লাখ টাকা খরচ হয়। অর্থের জোগানে এগিয়ে আসেন সহপাঠী, শিক্ষক, বিশ্ববিদ্যালয়ের বিভিন্ন পর্যায়ের ব্যক্তি ও স্থানীয় লোকজন। সহপাঠী ও বিভাগের উদ্যোগে প্রায় সাড়ে ৪ থেকে ৫ লাখ টাকা সংগ্রহ করা হয়। গ্রামের মানুষের সহযোগিতা ও পরিবারের প্রচেষ্টায় আরও প্রায় আড়াই লাখ টাকা জোগাড় করা হয়।

একপর্যায়ে হুসাইনের শারীরিক অবস্থার কিছুটা উন্নতিও হয়েছিল। চিকিৎসকেরা আরও পাঁচটি কেমোথেরাপি দেওয়ার পরামর্শ দেন। এর খরচ জোগাতে সহপাঠীরা আবারও অর্থ সংগ্রহ শুরু করেন। এর মধ্যেই হুসাইনের শারীরিক অবস্থার দ্রুত অবনতি ঘটে।

d29ea201-df63-4c20-8d38-0a8376c723b0

শেষ সম্বলও বিক্রি

একপর্যায়ে চিকিৎসকেরা হুসাইনের বেঁচে থাকার আশা ছেড়ে দেন। বাধ্য হয়ে তাকে দেশে ফিরিয়ে আনার সিদ্ধান্ত নেয় পরিবার।

দেশে ফেরার পথের খরচ ও প্রয়োজনীয় চিকিৎসার জন্য আরও ৪ লাখ ৭৩ হাজার টাকার প্রয়োজন হয়। এর মধ্যে পরিবার জমি বন্ধক রেখে, ধার করে এবং সংসারের আয়ের একমাত্র অবলম্বন ভ্যানটি বিক্রি করে ৩ লাখ টাকা জোগাড় করে। বাকি ১ লাখ ৭৩ হাজার টাকা সহপাঠী, বিভাগ ও অন্যদের সহযোগিতায় সংগ্রহ করা হয়।

পরিবারের শেষ আশা ছিল, মৃত্যু যদি আসেই, তবে যেন দেশের মাটিতে হয়। কিন্তু সেই আশাটুকুও পূরণ হয়নি। ভারতের অন্ধ্রপ্রদেশের একটি এলাকায় পৌঁছানোর পর অ্যাম্বুলেন্সেই মারা যান হুসাইন।

‘এখন ঋণ কীভাবে পরিশোধ করবে পরিবার’

হুসাইনের মৃত্যুর খবর ছড়িয়ে পড়লে বরিশাল বিশ্ববিদ্যালয়ের বাংলা বিভাগের শিক্ষক-শিক্ষার্থী ও সহপাঠীদের মধ্যে শোকের ছায়া নেমে আসে।

ববির বাংলা বিভাগের শিক্ষার্থী মৃত্যুঞ্জয় রায় বলেন, ‘হুসাইনকে বাঁচাতে আমরা ঐক্যবদ্ধ প্রচেষ্টা চালিয়েছিলাম। কিন্তু তাকে বাঁচাতে পারিনি। চিকিৎসার টাকা জোগাড় করতে পরিবার জমি বন্ধক রেখেছে, ঋণ করেছে এবং সংসারের আয়ের অবলম্বন ভ্যানটিও বিক্রি করেছে। এখন এসব ঋণ কীভাবে পরিশোধ করবে পরিবারটি, তার উত্তর আমাদের জানা নেই।’

বাংলা বিভাগের সভাপতি ড. শারমিন আক্তার বলেন, ‘হুসাইনের মৃত্যুর খবর শুনে আমরা গভীরভাবে শোকাহত। হুসাইন খুব ভালো ও লাজুক স্বভাবের ছেলে ছিল। এভাবে চলে যাবে, আমরা কখনো কল্পনা করিনি। একটি শোক কাটিয়ে উঠতে না উঠতেই আরও একটি শোক—এতে বাংলা বিভাগের শিক্ষক-শিক্ষার্থীরা অনেকটা ভেঙে পড়েছে।’

বাংলা বিভাগের সহকারী অধ্যাপক উন্মেষ রায় বলেন, ‘হুসাইনকে বাঁচাতে আমাদের ঐক্যবদ্ধ প্রচেষ্টা ছিল। তারপরও তাকে বাঁচাতে পারিনি। তার মৃত্যুর মধ্য দিয়ে একটি পরিবারের দীর্ঘদিনের স্বপ্ন দুঃস্বপ্নে পরিণত হয়েছে।’

প্রতিনিধি/এসএস