Dhaka Mail Logo

সারাদেশ

দুই সপ্তাহের লোডশেডিংয়ে থমকে সৈয়দপুরের শিল্পকারখানা

জেলা প্রতিনিধি

১৬ আগস্ট ২০২৬, ০১:০৭ পিএম

বিদ্যুৎ সংকটে নীলফামারীর সৈয়দপুরে শিল্প ও ব্যবসা-বাণিজ্যে বড় ধরনের প্রভাব পড়েছে। গত প্রায় দুই সপ্তাহ ধরে দিনে-রাতে মিলিয়ে ৮ থেকে ১০ ঘণ্টা পর্যন্ত লোডশেডিংয়ে কারখানার উৎপাদন ব্যাহত হয়েছে, কমেছে শ্রমিকদের কর্মঘণ্টা। বেড়েছে বিকল্প জ্বালানি ও পরিচালন ব্যয়। তবে নর্দান ইলেকট্রিসিটি সাপ্লাই পিএলসি (নেসকো) বলছে, গত দুই দিন ধরে বিদ্যুৎ সরবরাহ পরিস্থিতির কিছুটা উন্নতি হয়েছে।

শিল্পনগরী হিসেবে পরিচিত সৈয়দপুরে এ সংকটের প্রভাব পড়েছে বিসিক শিল্পনগরীসহ শহরের বিভিন্ন এলাকার লাইট ইঞ্জিনিয়ারিং, যন্ত্রাংশ উৎপাদন, ক্ষুদ্র গার্মেন্টস, বেকারি, জুতা, পাটজাত পণ্য, ওয়ার্কশপ, প্রিন্টিং প্রেস, পলিথিন রিসাইক্লিং ও অটো রাইস মিলসহ বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানে।

76acbfd8-4453-400b-b046-0dc12b0fd0df

সরেজমিনে দেখা যায়, বিদ্যুৎ চলে যাওয়ার সঙ্গে সঙ্গে অধিকাংশ কারখানার বৈদ্যুতিক মেশিন বন্ধ হয়ে যাচ্ছে। কোনো কোনো প্রতিষ্ঠানে শ্রমিকদের কাজ বন্ধ রেখে অপেক্ষা করতে হচ্ছে। বিদ্যুৎ ফিরে এলেও সঙ্গে সঙ্গে উৎপাদন শুরু করা সম্ভব হচ্ছে না। মেশিন চালু করা, শ্রমিকদের কাজে ফেরানো এবং উৎপাদনের ধারাবাহিকতা ফিরিয়ে আনতে অতিরিক্ত সময় লাগছে।

নোয়াহ্ রয়েল রিল্যাক্স মেটাল ইন্ডাস্ট্রিজের ব্যবস্থাপনা পরিচালক রাজু পোদ্দার বলেন, ‘এক ঘণ্টা বিদ্যুৎ না থাকলে শুধু এক ঘণ্টার উৎপাদন বন্ধ হয় না। মেশিন চালু করতে, শ্রমিকদের কাজে ফেরাতে এবং উৎপাদনের ধারাবাহিকতা ফিরিয়ে আনতে আরও সময় লাগে। এতে প্রতিদিনই লোকসান গুনতে হচ্ছে।’

8015cd2f-6349-46a0-babb-f7696ff05207

লোডশেডিংয়ের সরাসরি প্রভাব পড়েছে শ্রমিকদের আয়েও। ওয়ার্কশপের শ্রমিক মঈন বলেন, ‘বিদ্যুৎ থাকলে সকাল থেকে সন্ধ্যা পর্যন্ত কাজ করে যে আয় হয়, বিদ্যুৎ না থাকলে সেটি আর হয় না। অনেক সময় কয়েক ঘণ্টা বসে থাকার পর কাজ না করেই বাড়ি ফিরতে হয়।’

সময় ধরে পণ্য সরবরাহ করতে হয়—এমন ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানগুলোতে চাপ আরও বেশি। বিশেষ করে প্রিন্টিং প্রেস, বেকারি ও ওয়ার্কশপের ব্যবসায়ীরা পড়েছেন বিপাকে।

c8ffb63e-e2c4-479e-a076-001f0e11f6b2

প্রিন্টিং ব্যবসায়ী মো. আমজাদ আলী বলেন, ‘গত দুই সপ্তাহ ধরে প্রতিদিন সকাল থেকে রাত পর্যন্ত প্রায় ৮ থেকে ১০ ঘণ্টা বিদ্যুৎ থাকত না। গ্রাহকেরা নির্দিষ্ট সময়ের মধ্যে কাজ চান। কিন্তু বিদ্যুৎ না থাকলে মেশিন চালানো যায় না। ফলে সময়মতো অর্ডার দিতে না পারলে ব্যবসায় নেতিবাচক প্রভাব পড়ে।’

আরও পড়ুন

গ্যাস সরবরাহ শুরু হওয়ায় কর্মব্যস্ত হবিগঞ্জের শিল্পাঞ্চল

শ্রমিক ময়নুল ইসলাম বলেন, ‘আমরা কাজ করলে টাকা পাই। বিদ্যুৎ না থাকলে কাজ বন্ধ থাকে। তখন মালিকও কাজ দিতে পারেন না, আমরাও ঠিকমতো মজুরি পাই না। সংসার চালাতে আমাদের সবচেয়ে বেশি সমস্যায় পড়তে হচ্ছে।’

c224e6e5-c118-4bdf-9dee-fac4f6c65ecb

সৈয়দপুর শিল্প মালিক সমিতির সাধারণ সম্পাদক আমিনুল ইসলাম বলেন, ‘একটি মেশিন চালু করতে অনেক সময় এক থেকে দেড় ঘণ্টা সময় লাগে। কিন্তু বিদ্যুৎ স্থায়ী না থাকায় উৎপাদনের জন্য পর্যাপ্ত সময় পাওয়া যায় না। এতে দৈনিক উৎপাদন উল্লেখযোগ্যভাবে কমে গেছে। বর্তমান পরিস্থিতি অব্যাহত থাকলে অনেক কারখানা বন্ধ হয়ে যাওয়ার ঝুঁকিতে পড়বে।’

শিল্প উদ্যোক্তারা বলছেন, বিদ্যুৎ সরবরাহের অনিয়মিততা অব্যাহত থাকলে উৎপাদন খরচ বাড়বে, পণ্যের দাম বাড়তে পারে। একই সঙ্গে সময়মতো অর্ডার সরবরাহ করতে না পারায় বাজার হারানোর আশঙ্কাও রয়েছে।

d20dc5c5-07e1-481b-82b6-bbca4c93d5ac

সৈয়দপুর বিসিক শিল্পনগরীর উপব্যবস্থাপক মো. নুরেল হক বলেন, ‘সৈয়দপুর বিসিক শিল্পনগরীতে বর্তমানে প্রায় ৫০টি কলকারখানা রয়েছে। এসব কারখানা পুরোপুরি বিদ্যুতের ওপর নির্ভরশীল। শিল্পনগরী হওয়ায় অন্যান্য এলাকার তুলনায় এখানে তুলনামূলকভাবে লোডশেডিং কম হচ্ছে। তারপরও বিদ্যুৎ সরবরাহে ঘাটতির কারণে স্বাভাবিক উৎপাদন ক্ষমতা কমে যাচ্ছে।’

বিদ্যুৎ সংকটের কারণ হিসেবে জাতীয় গ্রিডে উৎপাদন ঘাটতির কথা জানিয়েছে নেসকো।

নেসকো সৈয়দপুর বিক্রয় ও বিতরণ বিভাগের নির্বাহী প্রকৌশলী আলিমুল ইসলাম সেলিম বলেন, ‘জাতীয় গ্রিডে বিদ্যুৎ উৎপাদন ঘাটতির কারণে কিছু এলাকায় লোডশেডিং করতে হয়েছে। চাহিদা ও সরবরাহের মধ্যে ভারসাম্য আনতে নির্ধারিত সূচি অনুযায়ী বিদ্যুৎ বিতরণের চেষ্টা চলছে।’

def28a03-5f96-499f-b0c8-4a78b7b345b5

তিনি জানান, গত প্রায় দুই সপ্তাহ ধরে সৈয়দপুরে প্রতিদিন বিদ্যুতের চাহিদা ছিল ৩৬ মেগাওয়াট। এর বিপরীতে সরবরাহ পাওয়া গেছে ২৩ দশমিক ৫ মেগাওয়াট। ফলে প্রতিদিন ঘাটতি ছিল ১২ দশমিক ৫ মেগাওয়াট। চলতি মাসের ১ তারিখ থেকে এ ঘাটতি দেখা দেয়।

তবে গত দুই দিনে পরিস্থিতির উন্নতি হয়েছে জানিয়ে আলিমুল ইসলাম সেলিম বলেন, ‘গত দুই দিন ধরে আমরা প্রায় ৩১ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ পাচ্ছি, যা প্রায় চাহিদার কাছাকাছি। ফলে আগের তুলনায় পরিস্থিতি এখন অনেকটাই স্বাভাবিক হয়েছে।’

5da3be18-6fe5-4528-8d26-be9455c3b550

তিনি আরও বলেন, ‘শিল্প এলাকায় যাতে উৎপাদন কার্যক্রম ব্যাহত না হয়, সে বিষয়টি বিবেচনায় রেখে বিদ্যুৎ সরবরাহ স্বাভাবিক করতে ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের সঙ্গে সমন্বয় করে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে।’

গত দুই সপ্তাহের বিদ্যুৎ সংকট সৈয়দপুরের শিল্প ও স্থানীয় অর্থনীতিতে বিদ্যুৎ সরবরাহের গুরুত্ব আবারও সামনে এনেছে। একটি কারখানায় বিদ্যুৎ না থাকলে শুধু মেশিন বন্ধ থাকে না, কমে শ্রমিকের কর্মঘণ্টা, ব্যাহত হয় উৎপাদন, বিলম্বিত হয় অর্ডার সরবরাহ এবং বাড়ে ব্যবসায়িক ব্যয়।

তবে গত দুই দিনে সরবরাহ পরিস্থিতির উন্নতিতে কিছুটা স্বস্তি ফিরেছে উদ্যোক্তা ও ব্যবসায়ীদের মধ্যে। তাঁদের প্রত্যাশা, এই উন্নতি সাময়িক না হয়ে স্থায়ী হবে এবং শিল্পপ্রতিষ্ঠানগুলোতে নিরবচ্ছিন্ন ও নির্ভরযোগ্য বিদ্যুৎ সরবরাহ নিশ্চিত করা হবে।

প্রতিনিধি/এসএস