Dhaka Mail Logo

সারাদেশ

বিয়ের পর ধর্ষণ মামলায় কারাগারে বর

জেলা প্রতিনিধি

১৬ আগস্ট ২০২৬, ১০:০৮ এএম

দুই পরিবারের সম্মতিতে ধর্মীয় ও সামাজিক রীতিতে বিয়ে হয়েছিল ফরিদপুরের নগরকান্দার রুমন খন্দকার (২০) ও মিলা আক্তারের (১৫)। বিয়ের প্রায় দেড় মাস পর কিশোরীকে অপহরণের পর ধর্ষণের অভিযোগে করা মামলায় কারাগারে যেতে হয়েছে রুমনকে। তবে রুমনের পরিবারের দাবি, সামাজিকভাবে বিয়ে হলেও পরে পারিবারিক বিরোধের জেরে তাকে ধর্ষণ মামলায় আসামি করা হয়েছে। তারা ঘটনার সুষ্ঠু তদন্ত দাবি করেছেন।

নগরকান্দা উপজেলার তালমা ইউনিয়নের মনোহরপুর গ্রামের কাঠমিস্ত্রি বিল্লাল খন্দকারের ছেলে রুমন। শনিবার (১৫ আগস্ট) নগরকান্দা থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) রাসুল সামদানি আজাদ মামলার বিষয়টি নিশ্চিত করেন।

রুমনের পরিবারের সদস্য ও স্থানীয় বাসিন্দাদের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, গত ২২ মে একই উপজেলার ডাঙ্গী ইউনিয়নের শংকরপাশা গ্রামের মিরাজ মাতুব্বরের মেয়ে মিলা আক্তারের সঙ্গে রুমনের বিয়ে হয়। দুই পরিবারের উদ্যোগে সামাজিক ও ধর্মীয় রীতিতে বিয়ের আয়োজন করা হয়। কনের বাড়িতে গায়ে হলুদের মতো অনুষ্ঠানও হয়। পরে প্রায় ৪০ জন বরযাত্রী নিয়ে রুমনের পরিবার কনের বাড়িতে যায়। দুই পরিবারের স্বজন ও স্থানীয় গণ্যমান্য ব্যক্তিদের উপস্থিতিতে বিয়ের আনুষ্ঠানিকতা সম্পন্ন হয়।

e882fe6a-ed6c-44b4-9a3b-3d0f59447d8b

কনের বয়স ১৮ বছরের কম হওয়ায় বিয়েটি নিবন্ধন করা হয়নি বলে রুমনের পরিবারের দাবি। প্রাপ্তবয়স্ক হলে নিবন্ধন করা হবে—এমন সিদ্ধান্ত দুই পরিবারের মধ্যে হয়েছিল বলেও তারা জানান। বিয়ের অনুষ্ঠান ও কনেকে বরের বাড়িতে নিয়ে যাওয়ার ছবি ও ভিডিও সাংবাদিকদের সরবরাহ করেছে রুমনের পরিবার।

রুমনের মামা হাফিজুর রহমান বলেন, বিয়ের পর থেকেই নবদম্পতির মধ্যে মনোমালিন্য চলছিল। সামাজিক রীতি অনুযায়ী কনের বাড়িতে নেওয়ার পর মিলা আর রুমনের বাড়িতে ফিরতে চাননি। পরে স্থানীয় গণ্যমান্য ব্যক্তিদের মধ্যস্থতায় তাকে ফিরিয়ে আনা হলেও কয়েক দিন পর আবার বাবার বাড়িতে চলে যান। এরপর কনের পরিবারের সঙ্গে তাদের যোগাযোগও বন্ধ হয়ে যায়।

আরও পড়ুন

শাহজালালের মাজারের ডেগে শেখ হাসিনার দীর্ঘায়ু কামনায় চিঠি

হাফিজুর রহমানের ভাষ্য, গত ২ জুলাই গভীর রাতে পুলিশ রুমনকে গ্রেফতার করে। পরদিন থানায় গিয়ে তারা জানতে পারেন, ধর্ষণের মামলায় তাকে গ্রেফতার করা হয়েছে।

পুলিশ সূত্রে জানা যায়, গত ২ জুলাই জহুরন খাতুন (৫২) নামের এক নারী রুমনের বিরুদ্ধে মামলা করেন। তিনি মিলা আক্তারের দাদি।

19f715d9-c7ba-4cf2-8ccb-1d9c06f776c9

মামলার এজাহারে বলা হয়েছে, গত ১৯ জুন বিকেল পাঁচটার দিকে বাড়ির পাশ থেকে মিলা আক্তারকে একটি মাইক্রোবাসে করে অপহরণ করে রুমনদের বাড়িতে নিয়ে যাওয়া হয়। সেখানে রাতভর তার ইচ্ছার বিরুদ্ধে ধর্ষণ করা হয় এবং শরীরের স্পর্শকাতর স্থানে আঘাত করা হয়। পরদিন সকালে কৌশলে ওই বাড়ি থেকে পালিয়ে মিলা পরিবারের সদস্যদের বিষয়টি জানান। পরে তাকে ফরিদপুর মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের ওয়ান-স্টপ ক্রাইসিস সেন্টারে চিকিৎসা দেওয়া হয়।

তবে মিলা ও মামলার বাদী জহুরন খাতুনের দাবি, তাদের মধ্যে কোনো বিয়ে হয়নি। তারা এজাহারে উল্লেখ করা ঘটনার কথা জানিয়ে ধর্ষণের বিচার দাবি করেন। বিয়ের ছবি ও ভিডিও সম্পর্কে জানতে চাইলে তারা এড়িয়ে যান।

নগরকান্দা থানার ওসি রাসুল সামদানি আজাদ বলেন, ‘গত ২ জুলাই জহুরন খাতুন তার নাতনিকে নিয়ে থানায় আসেন। তার কাছে ফরিদপুর মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের ওয়ান-স্টপ ক্রাইসিস সেন্টারের চিকিৎসার ছাড়পত্র ছিল, যেখানে ধর্ষণের বিষয় উল্লেখ করা হয়েছে। তার লিখিত অভিযোগের ভিত্তিতে নারী ও শিশু নির্যাতন দমন আইনে মামলা করা হয়।’

ওসি বলেন, ‘এজাহারে বিয়ের বিষয়টি উল্লেখ করা হয়নি এবং পুলিশকেও বিয়ের বিষয়ে জানানো হয়নি। মেয়েটির বয়স ১৮ বছরের কম হওয়ায় আইনগতভাবে এ ধরনের বিয়ের সুযোগ নেই। সামাজিকভাবে বিয়ে হলেও তা আইনগতভাবে স্বীকৃত নয়। চিকিৎসার কাগজপত্রসহ অভিযোগ পাওয়ায় গুরুত্ব দিয়ে মামলা নেওয়া হয়েছে।’

5ec419b3-ac8c-4312-8794-ff1fb3d4af44

তিনি আরও জানান, মামলাটির তদন্তের দায়িত্ব উপপরিদর্শক (এসআই) শহিদুল ইসলামকে দেওয়া হয়েছে। তদন্ত শেষে আদালতে পুলিশ প্রতিবেদন দাখিল করা হবে।

এদিকে প্রশাসনের কর্মকর্তারা বলছেন, বাল্যবিয়ের বিষয়টি গোপন রাখতে বিয়ে নিবন্ধন না করায় দুই পক্ষই আইনি জটিলতায় পড়েছে। নগরকান্দা উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা রেজওয়ানা আফরিন বলেন, বিয়ের সামাজিক ও আইনি সুরক্ষার জন্য নিবন্ধন বাধ্যতামূলক। বাল্যবিয়ে আইনত নিষিদ্ধ। বিয়ে নিবন্ধনের সঙ্গে কোনো কাজি জড়িত থাকলে তার বিরুদ্ধেও প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হবে।

ফরিদপুর জজ কোর্টের আইনজীবী মো. ফারুক হোসেন বলেন, ‘দুই পরিবারের সম্মতিতে বাল্যবিয়ে হলেও আইনের দৃষ্টিতে তা বৈধ নয়। পারিবারিক ও দাম্পত্য বিরোধের পর ধর্ষণের অভিযোগ ওঠায় বিষয়টি আইনগতভাবে জটিল হয়ে পড়েছে। তবে অভিযোগের সত্যতা তদন্তের মাধ্যমে নির্ধারণ করতে হবে।’

তিনি বলেন, ‘এ ধরনের মামলায় আইন তার নিজস্ব গতিতে চলবে। সত্যতা নির্ধারণের জন্য তদন্ত ও আদালতের বিচারিক প্রক্রিয়াই গুরুত্বপূর্ণ।’

প্রতিনিধি/এসএস