জেলা প্রতিনিধি
১৬ আগস্ট ২০২৬, ০৮:৫৭ এএম
বিএনপির রাজনৈতিক দুর্গ হিসেবে পরিচিত রাজশাহীতে আন্দোলন-সংগ্রামে বরাবরই গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছে ছাত্রদল। এ সংগঠন থেকে জাতীয় পর্যায়েও নেতৃত্ব তৈরি হয়েছে। আসন্ন ছাত্রদলের নতুন কেন্দ্রীয় সংসদ গঠনকে ঘিরে এরই মধ্যে শুরু হয়েছে আলোচনা। রাজশাহীর নেতাদের প্রত্যাশা, দুঃসময়ে মাঠে থাকা ত্যাগী নেতাদের এবার কেন্দ্রীয় কমিটিতে মূল্যায়ন করা হবে।
সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে, ছাত্রদলের নতুন কমিটি গঠনের লক্ষ্যে যাচাই-বাছাই শেষ হয়েছে। যেকোনো সময় নতুন কমিটি ঘোষণা হতে পারে। রাজশাহী থেকে কেন্দ্রীয় কমিটিতে কয়েকজন নেতার নাম আলোচনায় রয়েছে। তারা হলেন রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয় ছাত্রদলের সভাপতি সুলতান আহমেদ রাহি, সাধারণ সম্পাদক সরদার জহুরুল ইসলাম, রাজশাহী মহানগর ছাত্রদলের আহ্বায়ক রাকিন রায়হান রবিন ও জেলা ছাত্রদলের আহ্বায়ক সালাউদ্দিন সরকার শামীম।

সংশ্লিষ্ট সূত্র জানায়, গত ৩ মে রাজশাহী মহানগর ছাত্রদলের আংশিক কমিটি ঘোষণা করা হয়। মহানগরের সাবেক সাংগঠনিক সম্পাদক রাকিন রায়হান রবিনকে আহ্বায়ক, সিটি কলেজ ছাত্রদলের সদস্যসচিব এমদাদুল হক লিমনকে সদস্যসচিব এবং রাজশাহী কলেজের আহ্বায়ক খালিদ বিন ওয়ালিদ আবিরকে জ্যেষ্ঠ যুগ্ম আহ্বায়ক করা হয়।
কমিটি ঘোষণার পর শিক্ষার্থীদের বিভিন্ন সমস্যা নিয়ে কাজ করার পাশাপাশি শিক্ষার্থীবান্ধব নানা কার্যক্রমে জোর দেন নেতারা। শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে বৃক্ষরোপণ, শিক্ষার্থীদের আবাসন সমস্যা সমাধান, ছাত্রাবাসে খাবারের মান বৃদ্ধি ও ভর্তি-সংক্রান্ত জটিলতা নিরসনসহ বিভিন্ন কর্মসূচি পালন করে প্রশংসা কুড়িয়েছেন তারা। কলেজের অধ্যক্ষদের সঙ্গে মতবিনিময় করে শিক্ষার্থীদের জন্য আরও কার্যকর কর্মসূচি চালুর পরিকল্পনাও নেওয়া হয়েছে।
সংশ্লিষ্ট সূত্র আরও জানায়, জুলাইয়ের গণঅভ্যুত্থানেও রাজশাহীতে ছাত্রদলের নেতারা সম্মুখসারিতে ছিলেন। শেখ হাসিনা সরকারের পতনের আগে কয়েক দিনের ব্যবধানে তিনটি মামলায় আসামি করা হয় মহানগর ছাত্রদলের আহ্বায়ক রাকিন রায়হান রবিনকে। এর আগে মহানগর বিএনপির কার্যালয়ে তালা ঝুলিয়ে দলীয় নেতাকর্মীদের প্রবেশ বন্ধ করে দিয়েছিল পুলিশ ও আওয়ামী লীগ। পরে তালা ভেঙে কার্যালয় খুলে সাংগঠনিক কার্যক্রম শুরুর উদ্যোগ নেন রবিন।

রাকিন রায়হান রবিন বলেন, ‘শিক্ষার্থীদের ম্যান্ডেট নিয়ে আমরা কর্মসূচি করে আসছি। ২০২৪ সালের আন্দোলন, ২০২৩ সালের আন্দোলন, ২০১৭-১৮ এবং ২০১৩-১৪ সালের আন্দোলনে সব সময় রাজপথে সক্রিয় ছিলাম। ছাত্রদলকে শক্তিশালী করতে রাজশাহী মহানগরের ভূমিকা সব সময়ই গুরুত্বপূর্ণ ছিল। সর্বশেষ মহানগর কমিটি গঠনের পর বিএনপির দুর্গ রাজশাহীতে আমরা শিক্ষার্থীদের আরও কাছে গিয়েছি। গ্রহণযোগ্যতা অনেক বেড়েছে। আমরা মামলা-হামলায় কখনো পিছপা হইনি। কেন্দ্রীয় কমিটিতে অবশ্যই বিভাগীয় শহর রাজশাহীর ত্যাগী নেতাদের মূল্যায়ন করা উচিত। আমরা চাই, আমাদের ত্যাগের মূল্যায়ন হোক।’
এদিকে রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয় (রাবি) শাখা ছাত্রদলের কয়েকজন নেতাকেও কেন্দ্রীয় কমিটিতে মূল্যায়নের দাবি উঠেছে। সংগঠনটির সভাপতি সুলতান আহমেদ রাহি ও সাধারণ সম্পাদক সরদার জহুরুল ইসলামকে এগিয়ে রাখছেন স্থানীয় নেতারা। তাদের আক্ষেপ, অতীতে কেন্দ্রীয় নেতৃত্বে রাবি ছাত্রদলের নেতাদের যথাযথভাবে মূল্যায়ন করা হয়নি। এবার মাঠের রাজনীতিতে সক্রিয়তা, ত্যাগ ও দীর্ঘদিনের রাজনৈতিক ভূমিকা বিবেচনায় নেওয়া হবে বলে তারা আশা করছেন।

সরদার জহুরুল ইসলাম বলেন, ‘শেখ হাসিনার সরকারের সময় ২০১৫ সালে শহীদ জিয়াউর রহমান হল থেকে আমার আবাসিকতা বাতিল করে আমাকে বের করে দেওয়া হয়। স্বপ্ন ছিল, যতই কষ্ট, জেল-জুলুম ও অত্যাচার হোক, ছাত্রদলের পতাকা তুলে ধরে ক্যাম্পাসে সংগঠনকে প্রতিষ্ঠিত করব। দলের একজন কর্মী হিসেবে সব সময় চেষ্টা করেছি দলের নির্দেশনা মেনে সংগঠনকে বুকে ধারণ করে এগিয়ে নিতে।’
নিজের ওপর নির্যাতন, জেল-জুলুম, হামলা ও মামলাকে কঠিন সময় মনে করেন না উল্লেখ করে তিনি বলেন, ‘সংগঠন যখন বিপদে পড়ে, তখনই কঠিন সময় মনে হয়।’
২০২২ সালের ৭ ডিসেম্বর গ্রেফতারের স্মৃতিচারণ করে জহুরুল ইসলাম বলেন, ‘সেদিন আমাকে গ্রেফতার করে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী। আমার কপালে পিস্তল ধরে হুমকি দেওয়া হয়। আমাকে লাঠিপেটা করা হয়। পরিবারের সঙ্গে যোগাযোগ করতে দেওয়া হয়নি। কী ধরনের নির্যাতনের শিকার হয়েছি, তা বলে শেষ করা যাবে না।’
কারাগারের স্মৃতিচারণ করে তিনি বলেন, বিএনপির মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর, শ্রমিক দলের নেতা অ্যাডভোকেট শামছুর রহমান শিমুল বিশ্বাস ও ছাত্রদলের সভাপতি রাকিবুল ইসলাম রাকিবের সঙ্গে প্রথমে ঢাকার কেরানীগঞ্জ কারাগারে ছিলেন। কারাগারের ভেতরে স্লোগান দেওয়ার কারণে তাকে পরে কাশিমপুর কারাগারে পাঠানো হয়।

জহুরুল ইসলাম বলেন, ‘আমরা আন্দোলন-সংগ্রাম করেছি কোনো ক্রেডিট নেওয়ার জন্য নয়। দেশের স্বাধীনতা ও সার্বভৌমত্ব রক্ষা, গণতন্ত্র ফিরিয়ে আনা এবং জনগণের ভোটের অধিকার প্রতিষ্ঠাই ছিল মূল লক্ষ্য। আমাদের কাজ ও আন্দোলন চলমান থাকবে। ক্যাম্পাসের সৌহার্দ্যপূর্ণ পরিবেশ বজায় রেখে শিক্ষার্থীদের পাশে থাকব।’
তিনি আরও বলেন, ‘ঐতিহাসিক জুলাই-আগস্ট ২০২৪-এর গণঅভ্যুত্থানে ছাত্রসংগঠনগুলোর মধ্যে সবচেয়ে বেশি জীবন দিয়েছে ছাত্রদল। শহীদ হয়েছেন ছাত্রদলের ১৪২ জন নেতাকর্মী। ছাত্র-জনতার শহীদ ও গুরুতর আহতদের রক্তের প্রতিটি ফোঁটার মূল্য দেওয়ার প্রত্যয় নিয়ে আমরা এগিয়ে যাব।’
রাবি শাখা ছাত্রদলের সভাপতি সুলতান আহমেদ রাহি বলেন, ‘ছাত্রদলের নতুন কমিটিতে রাবি শাখা ছাত্রদলের নেতাদের সর্বোচ্চ মূল্যায়ন করা হবে বলে আমরা আশাবাদী।’
প্রতিনিধি/এসএস