জেলা প্রতিনিধি
১৪ আগস্ট ২০২৬, ০৭:১৩ পিএম
পঞ্চগড়ে নবনির্মিত সেপটিক ট্যাংকে জমে থাকা বিষাক্ত গ্যাসে বাবুরাম দেবসিংহ (৩১) নামে এক রাজমিস্ত্রির মৃত্যু হয়েছে। এ ঘটনায় অবহেলার অভিযোগে আটজনের বিরুদ্ধে মামলা করেছেন নিহতের চাচা বুদ্ধ চরণ দেবসিংহ।
বৃহস্পতিবার সন্ধ্যায় জেলার দেবীগঞ্জ উপজেলার শালডাঙ্গা ইউনিয়নের অমরখানা জামুড়ীতলী গ্রামে এ ঘটনা ঘটে।
শুক্রবার বিকেলে বিষয়টি নিশ্চিত করেন দেবীগঞ্জ থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মুসা মিয়া।
নিহত বাবুরাম দেবসিংহ চিলাহাটি ইউনিয়নের বলরামপুর নিজধাম গ্রামের মৃত আর্যমোহন দেবসিংহের ছেলে। তিনি পেশায় রাজমিস্ত্রি ছিলেন। একই ঘটনায় গৌতম চন্দ্র রায় নামে আরও এক শ্রমিক অসুস্থ হয়ে উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে চিকিৎসাধীন। অপর শ্রমিক ভাগ্য রায় চিকিৎসা শেষে বাড়ি ফিরেছেন।
মামলার এজাহারে শালডাঙ্গা ইউনিয়ন পরিষদের সদস্য রাব্বি হোসেন, বাবুল হোসেন, জুয়েল ইসলাম, উত্তম রায়, লাভলী বেগম, রানা সরকার, সাইফুল ইসলাম ও মজিবুল ইসলামের নাম উল্লেখ করা হয়েছে।
মামলার এজাহার সূত্রে জানা যায়, বৃহস্পতিবার সকাল ৯টার দিকে রাব্বি হোসেন ও উত্তম রায় বাবুরামকে তাদের নবনির্মিত সেপটিক ট্যাংকের সংস্কার কাজের জন্য ডেকে নেন। দীর্ঘদিন ঢাকনা দিয়ে বন্ধ থাকায় ট্যাংকের ভেতরে বিষাক্ত গ্যাস জমে ছিল বলে অভিযোগ করা হয়েছে। কোনো ধরনের নিরাপত্তাব্যবস্থা বা সতর্কতা ছাড়াই বাবুরামকে ট্যাংকের ভেতরে নামানো হয়।
ভেতরে নামার পরপরই বিষাক্ত গ্যাসে অসুস্থ হয়ে পড়েন বাবুরাম।
অভিযোগ রয়েছে, তাকে উদ্ধারে তাৎক্ষণিক কোনো কার্যকর ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি। একপর্যায়ে ট্যাংকের ভেতরেই শ্বাসরুদ্ধ হয়ে তার মৃত্যু হয়। পরে তার মরদেহ ট্যাংক থেকে বের করে অটোভ্যানে করে গ্রামের বাড়ির উঠানে রেখে সংশ্লিষ্টরা চলে যান বলে মামলার এজাহারে উল্লেখ করা হয়েছে।
খবর পেয়ে পুলিশ ঘটনাস্থলে গিয়ে মরদেহের সুরতহাল প্রতিবেদন তৈরি করে। পরে ময়নাতদন্তের জন্য মরদেহ পঞ্চগড় আধুনিক সদর হাসপাতালের মর্গে পাঠানো হয়।
নিহতের চাচা ও মামলার বাদী বুদ্ধ চরণ দেবসিংহ বলেন, বাড়ির মালিক ও সংশ্লিষ্টদের চরম অবহেলা এবং সময়মতো উদ্ধার না করার কারণেই বাবুরামের মৃত্যু হয়েছে। তিনি অভিযুক্তদের দ্রুত গ্রেপ্তার করে দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির দাবি জানান।
তবে মামলার প্রধান আসামি শালডাঙ্গা ইউনিয়ন পরিষদের সদস্য রাব্বি হোসেন অভিযোগ অস্বীকার করে বলেন, ঘটনার সময় তিনি সেখানে উপস্থিত ছিলেন না। তার বিরুদ্ধে মিথ্যা অভিযোগ আনা হয়েছে।
বাড়ির মালিক নবির হোসেনও জানান, তিনি ঢাকায় থাকেন। ঘটনার দিন শ্রমিকরা মূলত জানালার কাজ করতে এসেছিলেন। প্রায় দেড় মাস আগে ওই শ্রমিকরাই সেপটিক ট্যাংকটি নির্মাণ করেছিলেন। জানালার কাজ শেষে হেড মিস্ত্রি উত্তম রায়ের নির্দেশে শ্রমিকরা সেন্টারিং খুলতে ট্যাংকের ভেতরে ঢোকেন। পরিবারের কেউ তাদের সেখানে নামতে বাধ্য করেনি।
ঘটনার সময় বাড়িতে তার মা একা ছিলেন জানিয়ে নবির হোসেন বলেন, শ্রমিকদের ডাকাডাকি শুনে তার মা এগিয়ে গিয়ে তাদের অসুস্থ অবস্থায় দেখতে পান। পরে স্থানীয়রা তাদের উদ্ধার করেন।
এদিকে আরেক শ্রমিক ভাগ্য রায় জানান, হেড মিস্ত্রি বাবুরাম ও গৌতমকে সেপটিক ট্যাংকের সেন্টারিং খুলতে বলেন। প্রথমে বাবুরাম এবং পরে গৌতম ট্যাংকের ভেতরে ঢোকেন। তাদের বের করতে তিনি নিজেও ভেতরে প্রবেশ করলে শ্বাস নিতে না পেরে অজ্ঞান হয়ে যান। পরে জ্ঞান ফিরলে দেখতে পান, তাকে অটোতে করে হাসপাতালে নেওয়া হচ্ছে। এর আগে তারা কেউ সেপটিক ট্যাংকের ভেতরে সেন্টারিংয়ের কাজ করেননি বলেও জানান তিনি।
দেবীগঞ্জ থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মুসা মিয়া বলেন, নিহতের চাচা বৃহস্পতিবার গভীর রাতে অবহেলার অভিযোগে আটজনের বিরুদ্ধে মামলা করেছেন। এজাহার গ্রহণ করা হয়েছে। বিষয়টি তদন্ত করে প্রয়োজনীয় আইনানুগ ব্যবস্থা নেওয়া হবে। মরদেহ ময়নাতদন্তের জন্য মর্গে পাঠানো হয়েছে।
প্রতিনিধি/এলএ