Dhaka Mail Logo

সারাদেশ

গ্যাস সংকটে হবিগঞ্জে ১৭১ শিল্পকারখানা বন্ধ

জেলা প্রতিনিধি

১৪ আগস্ট ২০২৬, ১০:২৯ এএম

গ্যাস সংকটে হবিগঞ্জে ১৭১টি শিল্পকারখানার উৎপাদন বন্ধ হয়ে গেছে। গত ২০ দিন ধরে গ্যাসের সরবরাহ ছিল অপ্রতুল। বুধবার (১২ আগস্ট) থেকে সরবরাহ পুরোপুরি বন্ধ হয়ে যাওয়ায় দেড় লাখের বেশি শ্রমিক-কর্মকর্তা-কর্মচারী কর্মহীন হয়ে পড়েছেন। শিল্পমালিকদের দাবি, এতে প্রতিদিন হাজার কোটি টাকার বেশি ক্ষতি হচ্ছে। সময়মতো পণ্য সরবরাহ করতে না পারায় একের পর এক রপ্তানি আদেশ বাতিল হওয়ার আশঙ্কাও তৈরি হয়েছে।

গ্যাস সরবরাহকারী প্রতিষ্ঠান জালালাবাদ গ্যাস টি অ্যান্ড ডি সিস্টেম লিমিটেড বলছে, বিদ্যুৎ উৎপাদন স্বাভাবিক রাখতে বিদ্যুৎকেন্দ্রগুলোতে গ্যাসের সরবরাহ বাড়ানো হয়েছে। এ কারণে শিল্পকারখানায় গ্যাস সরবরাহ বন্ধ রাখতে হয়েছে।

যমুনা ইন্ডাস্ট্রিয়াল পার্কের মহাব্যবস্থাপক (প্রকৌশল) আবুল হোসেন বলেন, তাদের পার্কে টায়ার, স্পিনিং, ফেব্রিক্স, পেপার, পলি সিল্ক ও পাওয়ার প্লান্টসহ ছয়টি কারখানা রয়েছে। টায়ার ও পাওয়ার প্লান্ট ছাড়া বাকি কারখানাগুলো শতভাগ রফতানিমুখী।

তিনি বলেন, এসব প্রতিষ্ঠানে শ্রমিক, কর্মকর্তা ও কর্মচারী মিলিয়ে প্রায় ১২ হাজার মানুষ কর্মরত। সব কারখানা বন্ধ থাকায় তারা কর্মহীন হয়ে পড়েছেন। এতে প্রতিদিন কোম্পানির প্রায় ১০০ কোটি টাকা ক্ষতি হচ্ছে।

আবুল হোসেন বলেন, ‘কারখানাগুলোর দৈনিক অনুমোদিত গ্যাসের চাহিদা ১৩ দশমিক ৬ স্ট্যান্ডার্ড মিলিয়ন ঘনফুট। কিন্তু জালালাবাদ গ্যাস কর্তৃপক্ষ বেশ কিছুদিন ধরে মাত্র ৩ স্ট্যান্ডার্ড মিলিয়ন ঘনফুট গ্যাস দিচ্ছিল। এত কম গ্যাসে উৎপাদন প্রায় অসম্ভব। এখন মেরামতকাজও চলছে। বুধবার রাত ১২টা থেকে পুরোপুরি গ্যাস সরবরাহ বন্ধ করে দেওয়া হয়েছে।’

বাদশা পাইওনিয়ারের মহাব্যবস্থাপক (প্রশাসন) মো. খায়রুল আলম বলেন, তাদের দৈনিক গ্যাসের চাহিদা ৩০ মেগাওয়াট। বেশ কিছুদিন ধরে চাহিদার এক-তৃতীয়াংশ বা এক-চতুর্থাংশ গ্যাস পাওয়া যাচ্ছিল। বুধবার দুপুর থেকে সরবরাহ পুরোপুরি বন্ধ হয়ে গেছে। এতে প্রতিষ্ঠানের ১৬ হাজার শ্রমিক, কর্মকর্তা ও কর্মচারী কর্মহীন হয়ে পড়েছেন। প্রতিদিন প্রায় ৫ কোটি টাকা ক্ষতি হচ্ছে।

আরও পড়ুন

ব্রাহ্মণবাড়িয়ায় গ্যাস সরবরাহ বন্ধ, মাটির চুলায় রান্না

তিনি বলেন, শতভাগ রফতানিমুখী এ প্রতিষ্ঠানে স্পিনিং, টেক্সটাইল ও গারমেন্টস কারখানা রয়েছে। কোটি কোটি টাকার বৈদেশিক ক্রয়াদেশ রয়েছে। সময়মতো পণ্য সরবরাহ করতে না পারলে এসব ক্রয়াদেশ বাতিল হয়ে যেতে পারে। দ্রুত গ্যাস সরবরাহ স্বাভাবিক করার দাবি জানান তিনি।

এসএম স্পিনিং কারখানায় শ্রমিক, কর্মকর্তা ও কর্মচারী মিলিয়ে প্রায় সাড়ে ১৩ হাজার মানুষ কর্মরত। প্রতিষ্ঠানটির মহাব্যবস্থাপক আবুল বাশার বলেন, বুধবার বিকেল পৌনে চারটা থেকে গ্যাস সরবরাহ বন্ধ রয়েছে। কারখানাটিতে দৈনিক প্রায় ৩৮ হাজার মেট্রিক টন সুতা উৎপাদন হতো। উৎপাদন বন্ধ থাকায় প্রতিদিন ১ লাখ ২১ হাজার ৬০০ ডলার, অর্থাৎ প্রায় দেড় কোটি টাকার ক্ষতি হচ্ছে।

আবুল বাশার বলেন, তাদের শতভাগ উৎপাদন রফতানিমুখী। উৎপাদন বন্ধ থাকায় সময়মতো পণ্য পাঠানো সম্ভব হচ্ছে না। এতে বিদ্যমান ক্রয়াদেশ বাতিল হচ্ছে এবং নতুন ক্রয়াদেশ নেওয়ারও সুযোগ থাকছে না।

সায়হাম গ্রুপের মহাব্যবস্থাপক প্রকৌশলী মো. রেজাউল হক বলেন, গত ২২ জুলাই থেকে গ্যাস অনিয়মিতভাবে সরবরাহ করা হচ্ছিল। কখনো চাহিদার এক-তৃতীয়াংশ, কখনো এক-চতুর্থাংশ গ্যাস পাওয়া গেছে। বুধবার বেলা সাড়ে ১১টা থেকে পুরোপুরি সরবরাহ বন্ধ রয়েছে।

তিনি বলেন, তাদের প্রতিষ্ঠান শতভাগ রফতানিমুখী। এখানে প্রায় ২৭ হাজার শ্রমিক, কর্মকর্তা ও কর্মচারী কাজ করেন। গ্যাসের অভাবে নিজস্ব বিদ্যুৎ উৎপাদনও বন্ধ হয়ে গেছে। ফলে কারখানার সব কার্যক্রম থেমে আছে।

হবিগঞ্জ ইন্ডাস্ট্রিয়াল পার্কের (প্রাণ-আরএফএল গ্রুপ) মহাব্যবস্থাপক দীপক কুমার দেব বলেন, তাদের প্রতিষ্ঠানে প্রায় ৩৫ হাজার শ্রমিক, কর্মকর্তা ও কর্মচারী রয়েছেন। কয়েক দিন ধরে গ্যাসের সংকট চললেও বুধবার সন্ধ্যা ছয়টা থেকে পুরোপুরি সরবরাহ বন্ধ রয়েছে। এতে সবাই কর্মহীন হয়ে পড়েছেন।

স্কয়ার ডেনিমের মহাব্যবস্থাপক আব্দুল মাজেদ বলেন, তাদের দৈনিক গ্যাসের চাহিদা ২০ মেগাওয়াট। বুধবার বিকেল তিনটা থেকে সরবরাহ বন্ধ রয়েছে। এতে প্রায় তিন হাজার শ্রমিক কর্মহীন হয়ে পড়েছেন। প্রতিষ্ঠানটি শতভাগ রফতানিমুখী।

আরও পড়ুন

ব্যাটারিচালিত ও ই-রিকশার ওপর বিদ্যুৎ বিভ্রাটের দায় চাপালেন মন্ত্রী

তিনি বলেন, ‘বায়ারদের কাছ থেকে ক্রয়াদেশ নিয়ে এখন উৎপাদন করতে পারছি না। সময়মতো পণ্য পাঠানো সম্ভব হচ্ছে না। একসময় বায়াররা আমাদের থেকে মুখ ফিরিয়ে নিতে পারেন। এতে দেশের বৈদেশিক মুদ্রা আয়ের অন্যতম বড় খাত ঝুঁকিতে পড়বে।’

সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, হবিগঞ্জের ১৭১টি শিল্পকারখানার মধ্যে অর্ধশতাধিক শতভাগ রফতানিমুখী। আরও কিছু প্রতিষ্ঠান আংশিক রফতানিমুখী। এসব প্রতিষ্ঠানের প্রায় সবই ক্যাপটিভ পাওয়ারের মাধ্যমে নিজস্ব বিদ্যুৎ উৎপাদন করে। পল্লী বিদ্যুৎ বা পিডিবির বিদ্যুৎ ব্যবহার না করায় গ্যাস সরবরাহ বন্ধ হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে তাদের নিজস্ব বিদ্যুৎ উৎপাদনও বন্ধ হয়ে গেছে। এর সরাসরি প্রভাব পড়েছে উৎপাদনে।

জালালাবাদ গ্যাস টি অ্যান্ড ডি সিস্টেম লিমিটেডের উপমহাব্যবস্থাপক মো. রুহুল করিম চৌধুরী বলেন, গ্যাস–সংকট জাতীয় সমস্যা। জুলাইয়ের শেষ সপ্তাহ থেকেই এ সমস্যা শুরু হয়েছে। এ বিষয়ে পত্রিকায় বিজ্ঞপ্তিও দেওয়া হয়েছে। বিদ্যুৎকেন্দ্রগুলোতে গ্যাসের সরবরাহ বাড়ানোর কারণে মূলত শিল্পকারখানায় এ সংকট তৈরি হয়েছে।

তিনি বলেন, আগামী তিন থেকে চার দিনের মধ্যে পরিস্থিতির সমাধান হতে পারে বলে তারা আশা করছেন।

প্রতিনিধি/এসএস