জেলা প্রতিনিধি
১২ আগস্ট ২০২৬, ০৫:০২ পিএম
১৯ জন শিক্ষক ৫ জন কর্মচারীসহ মোট ২৪ জন স্টাফে মাদরাসায় ১৬ জন পরীক্ষা দিলেও পাশ করেনি কোনো শিক্ষার্থী। ফলাফল বিপর্যয় হওয়া মাদরাসাটির নাম সুটুরিয়া ফজলুল হক খান দাখিল মাদরাসা। নরসিংদী জেলার বেলাবো উপজেলার পাটুলী ইউনিয়নের সুটুরিয়া গ্রামে মাদরাসার অবস্থান।
নানা অনিয়ম, দায়িত্ব পালনে শিক্ষকের অবহেলা, শ্রেণি কক্ষে যথাযথ পাঠদান না করা ফলাফল বিপর্যয়ের কারণ বলে মনে করেন এলাকাবাসী। তবে প্রতিষ্ঠানের ভৌত অবকাঠামো, পাঠদানের মত পর্যাপ্ত ব্যবস্থাপনা না থাকা ফলাফল বিপর্যয়ের কারণ বলে দায় এড়াতে চাচ্ছেন মাদরাসার সুপার সিদ্দুকুর রহমান।
জানা যায়, মাদরাসা শিক্ষা অধিদফতরের অধীনে এমপিওভুক্ত সুটুরিয়া ফজলুল হক খান দাখিল মাদরাসাটি ১৯৮৭ সালে প্রতিষ্ঠা হয়। বর্তমানে প্রতিষ্ঠানের এমপিও শিটে ১৯ জন শিক্ষক এবং ৫ জন কর্মচারী মিলে ২৫ জনের নাম রয়েছে। প্রত্যেক মাসে সরকার থেকে তারা ৫ লাখ ২০ হাজার ৫ শত ৮ টাকা বেতন পেয়ে থাকেন। সরকার থেকে মোটা অঙ্কের অনুদান প্রাপ্ত এ প্রতিষ্ঠানে ২০২৬ সালের দাখিল পরীক্ষায় অংশ নেওয়া ১৬ শিক্ষার্থীর। যার মধ্যে ৭ জন মেয়ে ও ৯ জন ছেলে। গত ১০ আগস্ট প্রকাশিত ফলাফলে কোনো শিক্ষার্থী পাস করতে পারেনি।
ফলাফল প্রকাশের পরে সরেজমিনে দেখা যায়, প্রতিষ্ঠানটিতে খাতা কলমে মোট ২০০ জন শিক্ষার্থীর তথ্য থাকলেও ইবতেদায়ি ১ম শ্রেণি থেকে দাখিল ১০ম শ্রেণি পর্যন্ত ২০ জনের মত শিক্ষার্থী উপস্থিত পাওয়া যায়। তবে প্রতিষ্ঠানটিতে মোট ১০টি শ্রেণিকক্ষ থাকলেও বেশ কয়েকটি কক্ষ জরাজীর্ণ। কোনো কোনো কক্ষে ভাঙাচোরা টিনের স্তূপ পড়েছিল।
অভিভাবকদের সাথে কথা বলে জানা যায়, শিক্ষকরা নিয়মিন ক্লাসে পাঠদান করে না। এমনকি যথা সময়ে মাদরাসায় উপস্থিতিও হয় না। নিজেদের ইচ্ছে মত শিক্ষকরা চলাফেরা করেন বলে শিক্ষার্থীরাও নিয়মিত আসে না মাদরাসায়। মাদরাসার শিক্ষকরা নিয়মিত পাঠদান না করায় শিক্ষার্থীদের পড়াশোনায় ঘাটতি তৈরি হয়েছে।
বাচ্চু মিয়া নামে এক অভিভাবক বলেন, এই মাদরাসায় কোনো শিক্ষক পড়ালেখা করায় না। শিক্ষকরা গল্প করে, যার যার মতো চলে যায়। গত বছর আমার ছেলেকে পরীক্ষা দেওয়াইছি, আমার ছেলে দুই বিষয়ে ফেল করছে। এ বছর আবার পরীক্ষা দিছে, এবারও ফেল। আমরা বারবার অভিযোগ করেছি, তারা আমাদের কথা গুরুত্ব দেন না।
মাদরাসার সাবেক শিক্ষার্থী তৌহিদ বলেন, মাদরাসা পরিচালনা এবং পরিচালনা কমিটির গাফলতির কারণে মাদরাসার ফলফল বিপর্যয়ের কারণ।
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক এলাকার একজন জানান, বিভিন্ন ভাবে জানতে পেরেছি মাদরাসার অনেক শিক্ষকের সনদ, নিয়োগ ভুয়া। ভুয়া সনদ নিয়ে চাকুরি করা শিক্ষকের কাছে ভালো ফলাফল আশা করা বোকামি ছাড়া আর কিছু নয়।
মাদরাসার শিক্ষার্থীর সংখ্যা নিয়ে ওই স্থানীয় বাসিন্দা জানান, বিভিন্ন প্রাইভেট মাদরাসার শিক্ষার্থীদের নাম উঠিয়ে মাদরাসার শিক্ষার্থী দেখানো হচ্ছে। এ বিষয়ে আগেও বিভিন্ন পত্রিকা এবং চ্যানেলে সংবাদ প্রকাশিত হয়েছে। মাদরাসার সুপারের নামেও অনেক অভিযোগ রয়েছে।
জানা যায়, মাদরাসার সুপার সিদ্দুকুর রহমান পার্শ্ববর্তী গাজীপুর জেলার কাপাসিয়া উপজেলার বাসিন্দা। তিনিও নিয়মিত মাদরাসায় অফিস করেন না।
মাদরাসার সুপার সিদ্দিকুর রহমান বলেন, ‘আমি এই ফলাফলে নিজেই হতভম্ব। আমার বলার মতো ভাষা নাই। আসন্ন যে পরীক্ষা ২০২৭ সালে, আমি একটা চমক সৃষ্টি করব চেষ্টা করছি। আর যারা ফেল করেছে, কী কারণে ফেল করেছে, তাদের খাতা মূল্যায়নের জন্য আবেদন করার প্রস্তুতি নিচ্ছি।
এ বিষয়ে জানতে চাইলে শিক্ষা কর্মকর্তা গোলাম ফারুক বলেন, শতভাগ ফেল করার বিষয় মানা যায় না। সবাই ফেল করায় প্রতিষ্ঠানটির শিক্ষা কার্যক্রম, পাঠদানের পরিবেশ এবং শিক্ষকদের দায়িত্বশীলতা নিয়ে নতুন করে প্রশ্ন উঠেছে। এ বিষয়ে আমি প্রতিষ্ঠান কর্তৃপক্ষের কাছে জবাব চাইব।
স্থানীয়দের প্রত্যাশা, কর্তৃপক্ষ বিষয়টি গুরুত্বের সঙ্গে তদন্ত করে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেবে এবং আগামী বছর প্রতিষ্ঠানটির ফলাফলে ভালো পরিবর্তন আসবে।
প্রতিনিধি/ এজে