Dhaka Mail Logo

সারাদেশ

হামে একই পরিবারের ৪ শিশুর মৃত্যু, সংকটাপন্ন আরও ২

জেলা প্রতিনিধি

০৭ আগস্ট ২০২৬, ০৭:২১ পিএম

হামে চার শিশুকে হারিয়েছে এক পরিবার। বেঁচে থাকার লড়াই চলছে আরও দুই শিশুকে নিয়ে। এদের একজন চিকিৎসাধীন আছেন চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ (চমেক) হাসপাতালে। অন্যজন চিকিৎসাধীন নগরীর ফৌজদারহাটের বাংলাদেশ ইনস্টিটিউট অব ট্রপিক্যাল অ্যান্ড ইনফেকশাস ডিজিজেস (বিআইটিআইডি) হাসপাতালে।

শুক্রবার (৭ আগস্ট) এমন তথ্য জানিয়েছেন চমেক শিশু স্বাস্থ্য বিভাগের বিভাগীয় প্রধান অধ্যাপক মোহাম্মদ মুছা মিয়া। তিনি জানান, বান্দরবানের রুমা উপজেলার দুর্গম লেংটং খুমিপাড়ার বাসিন্দা পঅ এং খুমি-বৈনাং খুমি দম্পতি দুদিনের ব্যবধানে হামে আক্রান্ত হয়ে হারিয়েছেন দুই ছেলে।

তারা হলো খ্রেতং খুমি (৭) ও প্রেলং খুমি (৪)। তাদের দুই মেয়েও এখন হামে আক্রান্ত। এর মধ্যে বড় মেয়ে কোনোরকমে সুস্থ হলেও ছোট্ট মেয়ে লিংথং এ্যা খুমি লড়ছে। এর কয়েক দিন আগে হামে আক্রান্ত হয়ে পঅ এং খুমির আপন বোন পলি এং খুমি (৬) এবং অন্য এক বোন নাংখৈ খুমির ছয় বছরের ছেলে খৈয়তা এং খুমিও মারা যায়।

এই চার শিশুর প্রাণহানিতে আতঙ্কিত হয়ে পড়েছে খুমি পরিবারটি। এমনকি শক্তি হারিয়ে ক্লান্ত-শ্রান্ত হয়ে পড়েছেন তারা। তবুও হামে আক্রান্ত আরও দুই শিশুর প্রাণ বাঁচাতে চমেক হাসপাতাল ও বিআইটিআইডি হাসপাতালে লড়ছেন পরিবারের সদস্যরা।

অধ্যাপক মোহাম্মদ মুছা মিয়া জানান, চট্টগ্রামে হাম কমেনি এখনো। প্রতিদিন গড়ে ২০-২৫ জন ভর্তি হচ্ছে। টিকা নেওয়ার পরও হাম হচ্ছে। বর্তমানে প্রায় দেড়শ হাম উপসর্গের রোগী চমেক হাসপাতালে চিকিৎসাধীন রয়েছেন। বান্দরবান, কক্সবাজারসহ বিভিন্ন জেলা থেকে হাম আক্রান্ত রোগী আসছেন।

সরেজমিনে দেখা যায়, চমেক হাসপাতালের শয্যায় সাত মাসের ছোট্ট মেয়ে লিংথং এ্যা খুমি বেহুঁশের মতো শুয়ে আছে। নাকে দেওয়া হয়েছে অক্সিজেন নল। মেয়ের পাশে আধশোয়া হয়ে পড়ে আছেন ক্লান্ত-শ্রান্ত মা। মা বৈনাংয়ের চোখেও যেন রাজ্যের ঘুম। পুত্রশোকে অনেক কেঁদেছেন, এখনো সময়-অসময়ে কেঁদে ওঠেন তিনি।

ছেলে হারানো এই দম্পতি এখন সব শক্তি হারিয়ে ফেলেছেন। তবু চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ (চমেক) হাসপাতালের শিশুস্বাস্থ্য বিভাগে চিকিৎসাধীন মেয়েকে নিয়ে লড়ছেন এ দম্পতি। পঅ এং খুমি-বৈনাং খুমি দম্পতির ভাষ্য, দুদিনের ব্যবধানে হামে আক্রান্ত দুই ছেলে খ্রেতং খুমি (৭) ও প্রেলং খুমি (৪)-কে হারিয়েছেন তারা। বাকি দুই মেয়েও অসুস্থ। এর মধ্যে বড় মেয়ে কোনোরকমে সুস্থ হলেও ছোট্ট মেয়ে লিংথং এ্যা খুমি লড়ছে।

এর ১০ দিন আগে হামে আক্রান্ত হয়ে পঅ এং খুমির আপন বোন পলি এং খুমি (৬) এবং অন্য এক বোন নাংখৈ খুমির ছয় বছরের ছেলে খৈয়তা এং খুমিও মারা যায় বলে জানান বৈনাং খুমি। শুধু চার শিশু নয়, বান্দরবানের রুমা উপজেলার দুর্গম লেংটং খুমিপাড়ায় গত ১০ দিনে আরও ৭ শিশু মারা যায় বলে জানান তিনি।

তিনি বলেন, হামে আমাদের এক পরিবারের চার সদস্যের মৃত্যু হয়েছে। আমরা সবাই যৌথ পরিবারের বাসিন্দা। বর্তমানে আরও দুজনকে নিয়ে পরিবারের সদস্যরা চট্টগ্রামের দুই হাসপাতালে দিন পার করছি। পঅ এংয়ের বোন নাংখৈ খুমির ছোট মেয়ে যতন এং (৩) চিকিৎসাধীন ফৌজদারহাটের বাংলাদেশ ইনস্টিটিউট অব ট্রপিক্যাল অ্যান্ড ইনফেকশাস ডিজিজেস (বিআইটিআইডি) হাসপাতালে। চার দিন আগে মেয়েটিকে ভর্তি করা হয়।

আর আমাদের মেয়ে লিংথংকে চমেক হাসপাতালে আনা হয় গত মঙ্গলবার। দুজনই বান্দরবান হাসপাতালে চিকিৎসাধীন ছিল। চমেক হাসপাতালে নাতনির সঙ্গে আছেন পাড়ার কারবারি শৈলুং খুমি। হাসপাতালে শৈলুং হামে আক্রান্ত পাড়াটির করুণ বর্ণনা দেন। গত এক সপ্তাহে আমার মেয়েসহ পরিবারের চার শিশু মারা গেছে। এ ছাড়া আমার ভাইয়ের এক মেয়ে এবং বড় ভাইয়ের নাতিও মারা যায়। অন্য পাড়াবাসীর এক শিশুসহ ১০ দিনে ৭ শিশু মারা গেছে।

তারা জানান, লেংটংপাড়াটিতে ২৬টি পরিবার। পেশা জুমচাষ। রুমা থেকে দূরত্ব প্রায় ১৬ কিলোমিটার। দুর্গম পাড়ায় যাওয়ার কোনো বাহন নেই। পাহাড় ডিঙিয়ে রুমা উপজেলা সদরে আসতে সময় লাগে তিন ঘণ্টা। এখানে স্বাস্থ্যকর্মীর পা পড়ে না। গত দুই সপ্তাহের বেশি সময় ধরে পাড়াটির শিশুদের মধ্যে হামের প্রাদুর্ভাব দেখা দিয়েছে।

শৈলং কারবারি জানিয়েছেন, হামে আক্রান্ত হওয়ার পর গত ২৪ জুলাই এক ঘণ্টার ব্যবধানে মারা যায় তার নিজের মেয়ে পলি এং ও মেয়ের ঘরের নাতি খৈয়তা এং খুমি। দুজনের বয়সই ছয় বছর। এ দুজনের মৃত্যুর পর পাড়ায় আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়ে। কারবারির ছেলে পঅ এংয়ের চার সন্তানের জ্বর তখন।

পরদিন ২৫ জুলাই অবস্থা খারাপ হলে পঅ এংয়ের বড় ছেলে খ্রেতং খুমিকে নিয়ে রুমা সদরের দিকে রওনা হন কয়েকজন। কিন্তু পথে তার মৃত্যু হয়। পরদিন বাকি তিন শিশুকে নিয়ে বান্দরবানের উদ্দেশে রওনা হন তারা। সেখান থেকে দ্বিতীয় ছেলে প্রেলং খুমিকে ২৭ জুলাই চমেক হাসপাতালে নিয়ে আসা হয়। কিন্তু ওই দিনই প্রেলং মারা যায়।

চমেকে মারা যাওয়া ছেলের মরদেহ নিয়ে দুর্গম লেংটংপাড়ায় ছুটে যান দম্পতি। তখনো তাদের দুই মেয়ে বান্দরবান হাসপাতালে চিকিৎসাধীন। পঅ এং খুমি বলছিলেন, আবার বান্দরবান হাসপাতালে যাই পরদিন। সেখান থেকে দুদিন আগে ছোট মেয়েকে নিয়ে চট্টগ্রাম মেডিকেলে আসি। বড় মেয়ে পথাং এউং খুমিকে (১১) গত বুধবার বান্দরবান হাসপাতাল থেকে ছেড়ে দেওয়া হয়। সে কিছুটা সুস্থ হয়েছে। এখন চিন্তা লিংথং খুমিকে নিয়ে। বোনের মেয়েটি আছে ফৌজদারহাট হাসপাতালে।

চমেক হাসপাতালের শিশুস্বাস্থ্য বিভাগের হাম ব্লকে তাকে রাখা হয়েছে। এখনো অক্সিজেন দিতে হচ্ছে। একই শয্যায় রয়েছে আরও এক রোগী। শয্যাসংকটে এক শয্যায় একাধিক রোগী রেখে চিকিৎসা দেওয়া হচ্ছে। বান্দরবানের রুমার ছোট্ট লিংথং এ্যা খুমির পাশে বাবা-মা এবং দাদু সারাক্ষণ পাহারা দিচ্ছেন। এ কদিনে তারা অনেক মৃত্যু দেখেছেন। পরিবারের সদস্যরা বলেন, আমরা আর মৃত্যু দেখতে চাই না।

প্রতিবেদক/এআর