জেলা প্রতিনিধি
০৬ আগস্ট ২০২৬, ১২:১০ পিএম
নেত্রকোনার মোহনগঞ্জের বকুল চন্দ্র সরকার (৪৫) মাদক মামলায় সম্প্রতি জামিনে কারামুক্ত হয়েই আবারও ভয়ংকর মাদক রেকটিফাইড স্পিরিটের কারবার শুরু করেছেন।
এবার তার নাম উঠে এসেছে পাশ্ববর্তী সুনামগঞ্জের ধর্মপাশা থানায় দায়ের করা একটি মাদক মামলায়। মামলায় গ্রেফতার দুই আসামি জিজ্ঞাসাবাদে বকুল সরকারকে রেকটিফাইড স্পিরিটের ‘মূল ডিলার’ বলে জানিয়েছেন। পরে ওই মামলায় বকুলকেও আসামি করা হয়।
তবে মামলায় বকুল পলাতক আসামি হলেও মোহনগঞ্জে প্রকাশ্যে ব্যবসা চালিয়ে যাচ্ছেন বলে জানিয়েছেন স্থানীয়রা।
বকুল চন্দ্র সরকার সুনামগঞ্জের জামালগঞ্জ উপজেলার বৃষ্ণপুর এলাকার মুকুল চন্দ্র সরকারের ছেলে। তিনি দীর্ঘদিন ধরে মোহনগঞ্জ পৌরশহরের দেওথান এলাকায় বসবাস করেন। শহরে রিপন হোমিও নামে একটি হোমিওপ্যাথি ওষুধের দোকান পরিচালনা করেন। ওষুধ বিক্রি বা চিকিৎসা দেওয়া সংক্রান্ত কোনো কাগজপত্র নেই তার। তবে বকুল হোমিওপ্যাথি চিকিৎসার আড়ালে ভয়ংকর মাদক রেকটিফাইড স্পিরিটের ব্যবসা করছিলেন দীর্ঘদিন ধরেই। এ কাজে তার সহযোগী স্থানীয় কিছু প্রভাবশালী।
পুলিশ ও মামলার এজহার সূত্রে জানা গেছে, গত ২৫ জুলাই সুনামগঞ্জের ধর্মপাশা উপজেলার কান্দাপাড়া এলাকায় অভিযান চালিয়ে মাদক কারবারি সজল মজুমদার (৩৪) ও তার স্ত্রী মর্জিনা আক্তারকে (৩৫) গ্রেফতার করে পুলিশ। ধর্মপাশা থানার উপ-পরিদর্শক (এসআই) মো. শরীফুল ইসলামের নেতৃত্বে পরিচালিত অভিযানে তাদের বাড়ি থেকে সাড়ে তিন কেজি গাঁজা এবং নগদ ১৮ হাজার ৮০৯ টাকা উদ্ধার করা হয়। পরে গ্রেফতার ব্যক্তিদের দেওয়া তথ্যের ভিত্তিতে হাওরের পানিতে প্লাস্টিকের বস্তায় ডুবিয়ে রাখা ২২০ বোতল রেকটিফাইড স্পিরিট উদ্ধার করে পুলিশ। জিজ্ঞাসাবাদে সজল মজুমদার জানান, তাদের কাছে মোট ২৫০ বোতল স্পিরিট ছিল, যার মধ্যে ৩০ বোতল ইতোমধ্যে বিক্রি করা হয়েছে।
মামলার এজাহার অনুযায়ী, জিজ্ঞাসাবাদে সজল দাবি করেন, উদ্ধার হওয়া স্পিরিটের মূল ডিলার নেত্রকোনার মোহনগঞ্জ পৌরশহরের তুলাপট্টি এলাকার বকুল চন্দ্র সরকার। তার সহযোগী হিসেবে একই উপজেলার আজমপুর এলাকার আলাল উদ্দিন সজিব (৩৫)-এর নামও উল্লেখ করা হয়েছে। মামলায় বলা হয়েছে, তারা পরস্পর যোগসাজশে দীর্ঘদিন ধরে এলাকায় মাদক কারবারের পরিচালনা করে আসছিলেন। এ ঘটনায় ধর্মপাশা থানার এসআই মো. শরীফুল ইসলাম বাদী হয়ে মাদক আইনে বকুল চন্দ্র সরকার, সজল মজুমদার, তার স্ত্রী মর্জিনাসহ আরও কয়েকজনের বিরুদ্ধে মামলা দায়ের করেন। এ মামলায় সজল ও তার স্ত্রী মর্জিনা আক্তারকে আদালতের মাধ্যমে কারাগারে পাঠানো হয়। তবে বকুল চন্দ্র সরকার ও তার সহযোগী আলাল উদ্দিন সজিবসহ অন্যরা পলাতক রয়েছেন।
এদিকে, বকুল চন্দ্র সরকার মোহনগঞ্জ শহরের তুলাপট্টি এলাকায় ‘রিপন হোমিও’ নামে একটি হোমিওপ্যাথি ওষুধের দোকান পরিচালনা করেন। এর আগে গত ২১ ফেব্রুয়ারি মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তর ও উপজেলা প্রশাসনের যৌথ অভিযানে ওই দোকান থেকে ১২৮ বোতল রেকটিফাইড স্পিরিট উদ্ধার করা হয়। সে সময় বকুল সরকারকে গ্রেফতার করা হয়েছিল। কয়েক মাস কারাগারে থাকার পর সম্প্রতি তিনি জামিনে মুক্তি পান।
স্থানীয়দের অভিযোগ, জামিনে বের হওয়ার পর তিনি আবারও একই ব্যবসায় জড়িয়ে পড়েছেন এবং এবার ধর্মপাশা, জামালগঞ্জসহ হাওরাঞ্চলে স্পিরিটের নেটওয়ার্ক সম্প্রসারণ করেছেন।
মঙ্গলবার (৪ আগস্ট) সন্ধ্যায়ও বকুল সরকারকে মোহনগঞ্জের দোকানে ব্যবসা করতে দেখা গেছে বলে স্থানীয়রা জানিয়েছেন।
বকুল চন্দ্র সরকারের পাশের হোমিও চিকিৎসক সাগর সরকার বলেন, বকুলকে প্রতিদিন দোকান খুলতে দেখি। গতকাল সন্ধ্যায় দোকানে দেখেছি তাকে। পলাতক আসামি হলে প্রকাশ্যে ব্যবসা করছে কিভাবে বুঝলাম না।
মোহনগঞ্জ শহরের বাসিন্দা হাফিজুর রহমান বলেন, বকুল চন্দ্র সরকারের প্রকৃত বাড়ি সুনামগঞ্জের জামালগঞ্জ উপজেলার বৃষ্ণপুর এলাকায়। স্থানীয় কিছু প্রভাবশালীর অর্থায়ন ও প্রশ্রয়ে তিনি দীর্ঘদিন ধরে এই ভয়ংকর মাদকের কারবার চালিয়ে যাচ্ছেন। শুধু বকুলকে নয়, এই সিন্ডিকেটের অর্থদাতাদেরও আইনের আওতায় আনতে হবে। এদের ধরলেই এই মাদক বন্ধ করা সম্ভব হবে।
তিনি আরও বলেন, বকুল সরকারকে রিমান্ডে নিয়ে জিজ্ঞাসাবাদ করলে প্রকৃত হোতাদের পরিচয় বেরিয়ে আসবে। মূল হোতাদের গ্রেফতার করা না গেলে হাওরাঞ্চলের যুবসমাজ ও শিক্ষার্থীরা আরও ভয়াবহ মাদকের ঝুঁকিতে পড়বে।
বিষয়টি অবহিত করলে ধর্মপাশা থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মোহাম্মদ সহিদ উল্যা বলেন, দুইজন মাদক কারবারিকে গাঁজা ও রেকটিফাইড স্পিরিটসহ গ্রেফতার করার পর তাদের জবানবন্দিতে বকুল চন্দ্র সরকারের নাম উঠে এসেছে। পরে মামলায় তাকেও আসামি করা হয়েছে। এখন জানতে পারলাম যে, বকুল সরকার আগে নেত্রকোনার মোহনগঞ্জেও রেকটিফাইড স্পিরিটসহ গ্রেফতার হয়েছিলেন। বকুল সম্প্রতি মাদকের কারবার হাওরাঞ্চলে সম্প্রসারণ করেছে। তাকে দ্রুত অভিযান চালিয়ে গ্রেফতার করা হবে।
প্রতিনিধি/টিবি